ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদন শিল্প পার্কের জন্য জায়গা দেয়া হলেও উৎপাদনে যেতে দেয়া হচ্ছে না গ্যাস। এমনকি কোনো অবকাঠামোও তৈরি করে দেয়নি সরকার। বাংলাদেশ ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল আমদানি করে ওষুধ উৎপাদন করছে। কিছুদিন পর যাদের কাছ থেকে আমদানি করা হচ্ছে কাঁচামাল তাদের সাথেই বাংলাদেশকে প্রতিযোগিতা করতে হবে। স্থানীয়ভাবে ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদন বাড়াতে নীতি সহায়তা ও প্রতিবন্ধকতা নিরসনসহ এপিআই শিল্পের উন্নয়নে একটি স্থায়ী টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাবও দিয়েছেন ওষুধ উৎপাদনকারী ও বিশেষজ্ঞরা।

বুধবার বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের অডিটোরিয়ামে ‘এপিআই শিল্পের উন্নয়নে নীতি ও বাস্তবায়ন কৌশল’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এসব মতামত তুলে ধরেন বিশেষজ্ঞরা। সভার আয়োজন করে অ্যালায়েন্স ফর হেলথ রিফর্মস, বাংলাদেশ (এএইচআরবি)। সঞ্চালনা করেন বিএমইউর ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা: সৈয়দ আকরাম হোসেন।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও এএইচআরবির আহ্বায়ক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ। তিনি বলেন, স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল উৎপাদন বাড়লে ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থা আরো স্থিতিশীল হবে, উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং দাম সাধারণ মানুষের নাগালে থাকবে।

তিনি প্রস্তাব দেন- এপিআই শিল্পে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে পুণঃঅর্থায়ন সুবিধা, স্বল্পসুদের ঋণ ও ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম চালুর উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।

ড. হামিদ বলেন, ভারত ও চীনের মতো বাংলাদেশেও এই খাতে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত প্রণোদনা দেয়া যেতে পারে। পাশাপাশি গবেষণা ও উদ্ভাবন উৎসাহিত করতে গবেষণা অনুদান এবং আন্তর্জাতিক মান রক্ষায় কমপ্লায়েন্স গ্রান্ট চালুরও সুপারিশ করেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর ওষুধ শিল্পে প্রতিযোগিতা বাড়বে। সেই পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে হলে স্থানীয়ভাবে এপিআই উৎপাদনের বিকল্প নেই। তারা বলেন, সরকারি–বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া গেলে বাংলাদেশ অল্প সময়ের মধ্যেই ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনে আত্মনির্ভর হতে পারবে।

বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির (বাপি) মহাসচিব ড. মো: জাকির হোসেন বলেন, এপিআই শিল্পকে এগিয়ে নিতে হলে বাস্তবসম্মত নীতিগত সহায়তা দিতে হবে, শুধু কমিটি গঠন করে হবে না।

তিনি বলেন, গত দেড় মাসে সরকারের যত কমিটি হয়েছে, সেখানে বাপি বা এপিআই শিল্পের কোনো প্রতিনিধিত্বই রাখা হয়নি। অথচ এই শিল্পকে এগিয়ে নিতে হলে সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের মতামত অপরিহার্য।

ড. জাকির হোসেন আরো বলেন, ‘আমাদের দেশে এপিআইয়ের কাঁচামাল এখনো চীন ও ভারত থেকে আসে। একটা সময় আসবে তারা আমাদের প্রতিযোগী হয়ে উঠবে। সরকার যদি নীতিগতভাবে সাপোর্ট না দেয়, তাহলে এ শিল্প কখনোই টেকসই হবে না।

তিনি অভিযোগ করেন, এপিআই পার্কে জমির দাম আমরা পরিশোধ করেছি, কিন্তু সেই টাকার কোনো রিটার্ন পাচ্ছি না। ২০১৮ সালে প্লট বরাদ্দ দেয়া হলেও বলা হচ্ছে- ২০২৫ সালে বিদ্যুৎ সংযোগ আসবে। সরকারের পক্ষ থেকে জমির দাম ও ইন্টারেস্ট নেয়া হলেও অবকাঠামোগত সুবিধা এখনো অনিশ্চিত।

তিনি বলেন, এপিআই শিল্প পার্কে স্টেকহোল্ডারদের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। যারা কমিটিতে আছেন, তারা কি কখনো আমাদের ব্যথা বুঝতে পারবেন না।

সভায় ওষুধের কাঁচামাল প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মোর্চা বাংলাদেশ এপিআই অ্যান্ড ইন্টারমিডিয়ারিস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন বিএআইএমএর সভাপতি সাইফুর রহমান বলেন, আমাদের ভারত ও চীনের সাথে প্রতিযোগিতা করতে হয়। ভারত তাদের এপিআই শিল্প সম্প্রসারণের স্থায়ী টাস্কফোর্স গঠন করেছে। আমাদের দেশে সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে একটি স্থায়ী টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে।

বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির কোষাধ্যক্ষ মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান বলেন, সরকারের উৎসাহে ৪৯০ কোটি টাকা লোন নিয়ে ২ বছর আগে এপিআই পার্কে কারখানা স্থাপন করেছি। এখন প্রতিদিন ২০ লাখ টাকা সুদ দিচ্ছি কিন্তু সরকার গ্যাস দিতে পারেনি। এখন সরকার থেকে বলছে, গ্যাস দিতে পারবে না। এই অবস্থায় আমার পর আর কোনো পাগলও এখানে আসবে না এপিআই পার্ক স্থাপন করতে।