পয়লা বৈশাখের শোভাযাত্রার মোটিফ নির্মানকারী মানিকগঞ্জে চিত্রশিল্পী মানবেন্দ্র ঘোষের বাড়িতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেফতার ৮ জনকে আদালতে প্রেরণ করে ৭ দিনের রিমান্ড চেয়েছে পুলিশ। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সদর থানার ওসি এসএম আমানুল্লাহ।

অপরদিকে জেলা প্রশাসক যুগ্ন সচিব ড. মানোয়ার হোসেন মোল্লা, অতিরিক্ত ডিআইজি মোস্তাফিজুর রহমান, পুলিশ সুপার ইয়াসমিন খাতুনসহ জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তার ক্ষতিগ্রস্থ মানবেন্দ্র ঘোষের বাড়ি পরির্দশন করেন ও সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় করেন।

জেলা প্রশাসক ড. মানোয়ার হোসেন মোল্লা বলেন, সরকারের পক্ষ হতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা করা হয়েছে এবং তদন্ত শেষে মানবেন্দ্র ঘোষের পরামর্শে তার ঘরটি পূন:নির্মাণ করে দেয়া হবে। প্রধান উপদেষ্ঠার দপ্তর হতেও সব সময় বিষয়টি নিয়ে খোজ-খবর নেয়া হচ্ছে। আমরা এই পরিবারের যে কোনো প্রয়োজনে পাশে আছি। এ সময় সরকার কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নাজমুল হাসান খান, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মেজবাউস সাবেরীন উপস্থিত ছিলেন।

অতিরিক্ত ডিআইজি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, পুলিশের উচ্চ পর্যায়ে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। আর এরই অংশ হিসাবে আমি এখানে এসেছি এই পরিবার তথা মানিকগঞ্জে মানুষকে একটি বার্তা দিতে যে, বাংলাদেশ পুলিশ আপনাদের সাথেই আছে। কোনো অপরাধীই ছাড় পাবে না।

পুলিশ সুপার ইয়াসমিন খাতুন বলেন, আমাদের জানানো মাত্র আমরা মানবেন্দ্র ঘোষের নিরাপত্তা বিধান করেছি। এর সাথে জড়িত যারাই থাকুন তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

মানবেন্দ্র ঘোষ বলেন, আমাদের এই বিষয়টিকে নিয়ে কেউ যেন ধর্মীয় কিংবা রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে না পারে তা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। আমরা নিরাপত্তা চাই এবং এটা কোনো ধর্মীয় সহিংসতা নয়।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন, সদর উপজেলা ছাত্রলীগের অর্থ বিষয়ক সম্পাদক চান্দইর গ্রামের আমজাদ খানের ছেলে আল আমিন খানতমাল (২২),সদর উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক পাঞ্জনখাড়া গ্রামের জামাল উদ্দিন আহমেদ তানিসের ছেলে মঈন উদ্দিন আহমেদ পিয়াস (২২), গড়পাড়া ৩নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বড় ষাট্টার মৃত হায়াত আলীর ছেলে বাবুল হোসেন (৬০) এবং আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী দক্ষিণ উথলীর মৃত মীর নাসির উদ্দিনের ছেলে মীর মারুফ (২১), সদর উপজেলার পাঞ্জনখাড়া গ্রামের মৃত শাহীন খান সৃজনের ছেলে খান রাফি সৃজন (১৮), দক্ষিণ উথলীর সাইদুর রহমানের ছেলে মীর আমিনুর (২৬), শিবালয়ের অন্বয় পুরের রায়হান মল্লিকের ছেলে মোশারফ হোসেন (৪৮) এবং পূর্ব দাশড়ার সুনীল ঘোষের ছেলে সঞ্জিব ঘোষ (৪০)।

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পর থেকেই পুলিশ অভিযান চালিয়ে আজ দুপুর পর্যন্ত ৮ জনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে। গ্রেফতার আসামিদের ৭ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতরা সবাইই আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগি সংগঠনের নেতাকর্মী।

প্রসঙ্গত, পহেলা বৈশাখের আনন্দ শোভাযাত্রার মোটিফ নির্মাণের জেরে হুমকির শিকার চিত্রশিল্পী মানবেন্দ্র ঘোষের বাড়িতে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। মঙ্গলবার রাত আড়াইটার দিকে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার গড়পাড়া ইউনিয়নের চান্দইর ঘোষের বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

মানবেন্দ্র ঘোষের বাড়িতে জামায়াত নেতারা

আজ বৃহস্পতিবার সকালে জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা উত্তর টিম সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা দেলওয়ার হোসাইন মানবেন্দ্র ঘোষর বাড়ি পরিদর্শন করে বলেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। যারা চিত্রশিল্পী মানবেন্দ্র ঘোষের বাড়ি ও মূর্তি পুড়িয়ে দিয়েছে তাদেরকে আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে।

এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন জেলা জামায়াতের আমির হাফেজ মাওলানা কামরুল ইসলাম, নায়েবে আমির এডভোকেট আনোয়ার হোসেন, পৌরসভার আমির হুমায়ূন কবির, এডভোকেট ফেরদৌস আহমেদ, শিল্পী সালেহীন প্রমুখ।

জেলা আমির হাফেজ কামরুল ইসলাম বলেন,নিষিদ্ধ ছাত্রলীগসহ ফ্যাসিবাদীদের চক্রান্ত সম্মিলিতভাবে আমাদের মোকাবেলা করতে হবে। আর যেন তারা কোনো যড়যন্ত্র করতে না পারে তা প্রশাসনকে নিশ্চিত করতে হবে।

অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের প্রধান পালিয়ে গেলেও এখনো তাদের অনেক দোসর রয়েছে। তারা বিভিন্ন সময় বাংলাদেশের সম্প্রীতি বিনষ্ট করার জন্য অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে চিত্রশিল্পী মানবেন্দ্র ঘোষের বাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। আমরা এ ঘটনার সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই। সরকারের কাছে ক্ষতিগ্রস্ত এই পরিবারকে পূণর্বাসনের জন্য সহযোগিতা করার দাবি জানাই।

জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ও মানিকগঞ্জ বারের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আজাদ হোসেন খানের নেতৃত্বে জেলা বিএনপির একটি টিমও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দায়ীদের শাস্তি দাবি করেছেন। তারা বলেন, এ এলাকার সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বপনের সন্ত্রাসী বাহিনী ও পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের অনুসারীরা এখনও এলাকায় ঘাপটি মেরে বসে আছে। তারা নানান যড়যন্ত্রে ছক আটছে। তাদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

এলাকাবাসীর দাবি, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বপনের প্রধান সেনাপতি গড়পাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও সদর উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আফজার উদ্দিন সরকার, পৌর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক জাহিদ হোসেন, ছাত্রলীগ সভাপতি ইফাদ কোরাইশী সুমন তার ভাই ছাত্রলীগ নেতা সিফাত কোরাইশী ইমন, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ইসরাফিল হোসেনসহ তাদের বাহিনীর লোকজন এখনও সক্রিয়। আপাতত তারা ঘাপটি মেরে থাকলেও যেকোনো সময় যেকোনো ঘটনা ঘটিয়ে দিতে পারে।