কারাগার সাধারণত কঠোর শাস্তির স্থান হিসেবে পরিচিত হলেও বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী গৌরনদী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পৌর মেয়র হারিছুর রহমান হারিছের অবস্থান ঘিরে ভিন্ন এক চিত্র উঠে এসেছে।

অভিযোগ উঠেছে, কারাবিধি লঙ্ঘন করে তিনি নানা ধরনের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। যা অনেকের দৃষ্টিতে ‘রাজকীয় বন্দিত্ব’ বলেই মনে হচ্ছে। ঘটনাটি ঘিরে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র সমালোচনা ও প্রতিক্রিয়া।

সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা জাকির হোসেন সান্টু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক স্ট্যাটাসে অভিযোগ করেন, ‘হারিছ সাধারণ বন্দিদের মতো নেই বরং তিনি ভোগ করছেন নানা বিলাসবহুল সুযোগ-সুবিধা।’

তার মতে, হারিছ কোর্ট হাজতে আরামদায়ক চেয়ারে বসেন, নিয়মিত মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন এবং প্রতিদিন বাইরে থেকে আনা খাবার গ্রহণ করেন। এছাড়া তাকে বারবার আদালতে হাজির করা হলেও তাকে যেন ‘আরামদায়ক পরিবেশে’ রাখাই মূল উদ্দেশ্য।

যদিও জাকির হোসেন পরবর্তীতে স্ট্যাটাসটি সরিয়ে ফেলেন। তবুও তিনি জানান, ‘সেখানে যা লেখা হয়েছিল তা বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে।’

গৌরনদী কোর্টের দায়িত্বপ্রাপ্ত জিআরও বেলাল হোসেন জানান, ‘তার দায়িত্বকালে হারিছুর রহমানকে তিনবার আদালতে হাজির করা হয়েছিল এবং কোনো অতিরিক্ত সুবিধা প্রদান করা হয়নি। হাজতখানার অভ্যন্তরীণ বিষয় সম্পর্কে তিনি অবগত নন বলেও জানান।’

স্থানীয়দের মতে, ‘কারাগারের ভেতর হারিছের এই ‘মিনি গেস্টহাউস’ সুলভ জীবনযাপন প্রমাণ করে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কীভাবে কেউ শাস্তির পরিবেশেও প্রিভিলেজ পেতে পারেন। এ ঘটনাটি কেবল একজন বন্দির বিশেষ সুযোগ পাওয়ার প্রশ্নই নয়, বরং এটি দেশজুড়ে রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রভাবশালীদের জন্য আইনের ভিন্ন মানদণ্ড নিয়ে বড় এক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন ভূঁইয়া এ অভিযোগগুলোকে ‘উদ্ভট’ ও ভিত্তিহীন বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি পরামর্শ দেন, সিনিয়র জেল সুপারের সাথে যোগাযোগ করতে। তবে একাধিকবার চেষ্টা করেও সিনিয়র জেল সুপার মুহাম্মদ মঞ্জুর হোসেনকে ফোনে পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে এই বিষয়ে বৃহস্পতিবার গৌরনদী উপজেলা ও পৌর বিএনপি এবং তাদের অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর উদ্যোগে এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। গৌরনদী সরকারি কলেজ গেট থেকে শুরু হয়ে মিছিলটি মহাসড়কসহ বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। শেষে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তারা হারিছুর রহমানের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন।

এ সময় বক্তারা হারিছুর রহমানকে ‘সন্ত্রাসের গডফাদার’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা জানান। তারা বলেন, হারিছ মেয়র থাকাকালে লুটপাট, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা।

বিশেষ করে বক্তারা ২৪ জুলাই অভ্যুত্থানে সংঘটিত নির্মম হত্যাকাণ্ডের পেছনে হারিছুর রহমানের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি জোরালোভাবে উল্লেখ করেন। তারা দাবি করেন, এই ঘটনার সঠিক তদন্তের জন্য একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কমিটি গঠন করা প্রয়োজন এবং গত ১৫ বছরে গৌরনদী অঞ্চলে রাজনৈতিক সন্ত্রাসের বিস্তার ঘটানো হারিছুর রহমানের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি, অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ডের দাবি জানান।

জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় হারিছুর রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের ওপর একাধিক হামলা হয়। ওই সময় অনেক নেতাকর্মী এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন। বর্তমান সরকারের পতনের পর, এসব ঘটনার বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীরা একাধিক মামলা করে। হারিছ বর্তমানে বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক রয়েছেন।