ছোট ফেনী নদীর ভয়াল ভাঙনে প্রতিদিনই হারিয়ে যাচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনা। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও মুছাপুর রেগুলেটর পুনর্নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের মুখ না দেখায় ফেনীর সোনাগাজী, নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ ও ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকা আজ ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মুখে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিশ্রুতি মিললেও প্রকল্পের অগ্রগতি না থাকায় দিন দিন নদীগর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে পুরো জনপদ।
সোনাগাজী উপজেলার চর দরবেশ ইউনিয়ন সংলগ্ন ছোট ফেনী নদীর তীরজুড়ে এখন শুধুই ভাঙনের আতঙ্ক। নদীর পাড়ে দাঁড়ালেই চোখে পড়ে ভাঙনের ক্ষতচিহ্ন। কোথাও অর্ধেক বিলীন বাড়ি, কোথাও নদীতে ঝুলে থাকা গাছ, আবার কোথাও একসময় মানুষের বসতি ছিল—এখন সেখানে শুধু নদীর উত্তাল স্রোত।
স্থানীয়দের মতে, প্রতিদিনই নদী একটু একটু করে গিলে খাচ্ছে নতুন এলাকা। ভাঙনের মুখে বসতভিটা ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন অসংখ্য পরিবার। কৃষিজমি হারিয়ে জীবিকা সঙ্কটে পড়েছেন চাষিরা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মন্দিরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও হুমকির মুখে।
স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবির মুখে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু, প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এনি এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল। সে সময় তারা মুছাপুর রেগুলেটর পুনর্নির্মাণের দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প দ্রুত একনেকে উপস্থাপনের আশ্বাস দেন। পাশাপাশি জিও ব্যাগ ফেলে সাময়িকভাবে ভাঙন ঠেকানোর উদ্যোগ নেয়া হয়।
কিন্তু চলতি বছরের ২২ জুলাই অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপিত না হওয়ায় নতুন করে হতাশ হয়ে পড়েছেন স্থানীয়রা।
তাদের অভিযোগ, আশ্বাসের বাইরে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।
সরেজমিনে জানা গেছে, ছোট ফেনী নদীতে পানি নিয়ন্ত্রণ ও ভাঙন প্রতিরোধে ২০০৫ সালে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৩ ভেন্টবিশিষ্ট মুছাপুর রেগুলেটর নির্মাণ করা হয়েছিল। এটি সোনাগাজী, কোম্পানীগঞ্জ ও দাগনভূঞাসহ বিস্তীর্ণ এলাকার পানি নিষ্কাশন এবং বঙ্গোপসাগরের লবণাক্ত পানি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিল।
কিন্তু ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় ভারতের পাহাড়ি ঢলের অতিরিক্ত পানির চাপে রেগুলেটরটি ভেঙে নদীতে ভেসে যায়। এরপর থেকেই শুরু হয় ভয়াবহ নদীভাঙন। চর দরবেশ, চর মজলিশপুর, চর চান্দিয়া ইউনিয়ন এবং কোম্পানীগঞ্জ ও দাগনভূঞার সীমান্তবর্তী এলাকায় হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমি, ঘরবাড়ি, ফসল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও মন্দির নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড কিছু এলাকায় জিও ব্যাগ ফেললেও স্থানীয়দের দাবি, এতে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। বরং বর্ষা এলেই নদীর আগ্রাসন আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত রেগুলেটর পুনর্নির্মাণ না হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আরো বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হবে এবং তিন উপজেলার ভৌগোলিক মানচিত্রও সংকুচিত হয়ে পড়বে।
মুছাপুর রেগুলেটর ছোট ফেনী নদীর পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ত পানির প্রবেশ ঠেকাতে নির্মিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। ২০২৪ সালের বন্যায় এটি ধ্বংস হওয়ার পর নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। এরপর থেকেই সোনাগাজী, কোম্পানীগঞ্জ ও দাগনভূঞার বিস্তীর্ণ এলাকা ভয়াবহ নদীভাঙনের মুখে পড়ে।
স্থানীয়দের মতে, রেগুলেটর পুনর্নির্মাণই দীর্ঘমেয়াদে এ সঙ্কটের কার্যকর সমাধান।
ভাঙনকবলিত চর দরবেশ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ বলেন, জনগণের হতাশা ও কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। ছোট ফেনী নদী গিলে খাচ্ছে তিন উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ। যত দিন যাচ্ছে, ততই আমাদের মানচিত্র ছোট হয়ে আসছে।
চর মজলিশপুর ইউনিয়নের বিএনপি নেতা ও জেলা বিএনপির সদস্য সৈয়দ রবিউল হক শিমুল বলেন, অতি দ্রুত মুছাপুর রেগুলেটর নির্মাণের মাধ্যমে সোনাগাজী, কোম্পানীগঞ্জ ও দাগনভূঞার জনপদ রক্ষা করা উচিত। তা না হলে বিস্তীর্ণ এলাকা ছোট ফেনী নদীতে বিলীন হয়ে যাবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ফেনীর নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, ভাঙনকবলিত এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে বেশ কিছু প্রকল্প চলমান রয়েছে। রেগুলেটর স্থাপনের প্রকল্প নোয়াখালী ডিভিশন প্রস্তুত করেছে।
ফেনীর জেলা প্রশাসক মনিরা হক বলেন, ভেঙে যাওয়া মুছাপুর রেগুলেটর পুনর্নির্মাণের জন্য সরকার প্রকল্প গ্রহণ করেছে। সেটি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে তিন উপজেলার মানুষ নদীভাঙনের দুর্ভোগ থেকে রক্ষা পাবে।