রংপুরের গঙ্গাচরার হিন্দু পল্লীতে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাদের পৃথকভাবে রিমান্ডের আবেদনও করেছে পুলিশ।
আজ বুধবার দুপুর দেড়টায় তাদেরকে আদালতের হাজতখানায় আনা হয়। এর আগে, মঙ্গলবার মধ্যরাতে রংপুর এবং নীলফামারীর জেলা পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে তাদের বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতার আসামিরা হলেন- নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার সিংগের গাড়ি মাঝাপাড়া এলাকার লাভলু মিয়ার ছেলে ইয়াসিন আলী (২৫), মাগুরা ধনিপাড়া এলাকার নুর আলমের ছেলে স্বাধীন মিয়া (২৮), দক্ষিণ চারখানা মাঝাপাড়া এলাকার গোলাম মোস্তফার ছেলে আশরাফুল ইসলাম (২৮), সিঙ্গের গাড়ি পাঠানপাড়া এলাকার মরহুম বাবলু খানের ছেলে এম এম আতিকুল ইসলাম খান আতিক এবং দক্ষিণ সিঙ্গের গাড়ি চওড়াপাড়া এলাকার মোজাম্মেল হোসেনের ছেলে সাদ্দাম হোসেন সেলিম (২২)।
রংপুর জেলা পুলিশ সুপার আবু সাইম জানান, আলদাদপুর ছয় আনি বালাপাড়া হিন্দু পল্লীতে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় ওই পল্লীর বাসিন্দা রবীন্দ্রনাথ রায় (৫০) ১২০০ জন অজ্ঞাত ও শৃঙ্খল জনতার নামে মামলা করেন। মামলার পরিপ্রেক্ষিতে রাতে নীলফামারী জেলা পুলিশের সহযোগিতায় রংপুর পুলিশ কিশোরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে যৌথ বাহিনী ওই পাঁচজনকে গ্রেফতার করে।
তিনি বলেন, হামলার সময় ফুটেজ, স্থিরচিত্র দেখে দেখে তথ্যপ্রযুক্তির সহযোগিতায় তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। কোনো নিরীহ সাধারণ মানুষ গ্রেফতারের আওতায় আসবে না। যারা হামলা চালিয়েছে তারা দুর্বৃত্ত।
আদালতের ইন্সপেক্টর আমিনুল ইসলাম জানান, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মহানবী সা. ও কোরআন শরীফ নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য এবং ইমেজ পোস্ট করার জেরে আলদাদপুর ছয় আনি বালাপাড়া হিন্দু পল্লীতে ভাঙচুরের ঘটনায় গ্রেফতার পাঁচজনকে হাজত খানায় নেয়া হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে পৃথক পৃথকভাবে রিমান্ডের আবেদনও করা হয়েছে। বিকেলে তাদের রংপুর আমলি আদালত গঙ্গাচড়ায় রিমান্ড ও জামিন শুনানি হবে।
উল্লেখ্য, রংপুর মহানগরীর আইডিয়াল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী গঙ্গাচড়ার আলদাদপুর ছয় আনি বালা পাড়া গ্রামের বাসিন্দা রঞ্জন কুমার রায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে মহানবী সা:, ইসলাম এবং কোরআন শরীফ নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য ও ইমেজ পোস্ট করলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় শনিবার (২৬ জুলাই) রাতেই গ্রেফতার করা হয় রঞ্জনকে। এ সময় পাশের উপজেলা থেকে আসা একদল দুর্বৃত্ত রঞ্জনের চাচার বাড়িতে হামলা চালায়।
পরের দিন রোববার (২৭ জুলাই) বিকেলে ঘটনাস্থলের পাশের জেলা নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার মাগুরা, ধনীপাড়া, সিংহেরগাড়ি, বাংলাবাজার, হাজীহাট, পাড়েরহাট, চাদখানা এবং একতার বাজার থেকে একদল উচ্ছৃঙ্খল জনতা মিছিল নিয়ে এসে ওই হিন্দু পল্লীটির বিভিন্ন বাড়ি ঘরে হামলা চালায় এবং ভাঙচুর করে। এ সময় সেখানে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা বাধা দিয়ে আটকাতে পারিনি। উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে থামাতে গিয়ে আহত হয় কয়েকজন পুলিশও। পরে সেনাবাহিনী গিয়ে ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনে।
এরপর থেকে হিন্দু পল্লীর লোকজন আতঙ্কিত ছিল। পরবর্তীতে ডিসিসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা স্থানীয়দের সহযোগিতায় হিন্দু পল্লীর প্রত্যেকটি মানুষের সাথে কথা বলেন। তাদের নিরাপত্তায় পাশে দাঁড়ান। গ্রেফতার যুবককে আদালতের মাধ্যমে সাইবার সুরক্ষা আইনে জামিন নামঞ্জুর করে কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে পাঠায় আদালত।
মঙ্গলবার দিনভর ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘরগুলো পুরো নির্মাণ করে দেয় উপজেলা প্রশাসন। আতঙ্ক কেটে গেছে। নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান করছেন পল্লীর সবাই। নিরাপত্তা নিশ্চিতে আলতাপুর নতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আনসার এবং পুলিশ ক্যাম্প মোতায়েন করেছে কর্তৃপক্ষ। এছাড়াও সেখানে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
রংপুরের ডিসি মোহাম্মদ রবিউল ফয়সাল জানান, হিন্দু পল্লী থেকে অন্যত্র চলে যাওয়া দু’টি পরিবারের সবাই এখন বাড়িতে একত্রে বসবাস করছেন। তাদের নিরাপত্তায় সকল ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। সেখানে আর কোনো আতঙ্ক নাই। দুর্বৃত্তদের ধরতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান অব্যাহত রেখেছে।