সিলেটের দক্ষিণ সুরমায় বস্তাবন্দি অবস্থায় অজ্ঞাত ব্যক্তির লাশ উদ্ধারের ২৮ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। সিসিটিভি ফুটেজ ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নিহতের পরিচয় শনাক্তের পাশাপাশি হত্যায় জড়িত মূল আসামিসহ তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
পুলিশ বলছে, আগের পাওনা টাকা ফেরত না দেয়াকে কেন্দ্র করে বন্ধুকে হত্যার পর লাশ বস্তাবন্দি করে বাস টার্মিনালের ডাস্টবিনে ফেলে যায় তারা।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) কমিশনার কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসএমপি কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম এসব তথ্য জানান।
পুলিশ জানায়, শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টার দিকে দক্ষিণ সুরমা থানাধীন কদমতলী বাস টার্মিনালে রাজধানী এক্সপ্রেস ও উদার পরিবহন বাস কাউন্টারের সামনে ফুটপাতের পাশে একটি সাদা প্লাস্টিকের বস্তা পড়ে থাকতে দেখেন সিলেট সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। বস্তাটি সরানোর চেষ্টা করলে এর মুখ খুলে একটি পা বেরিয়ে আসে। বিষয়টি দেখে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন। খবর পেয়ে দক্ষিণ সুরমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)-সহ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে বস্তার ভেতর থেকে এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করেন। শুরুতে লাশটির কোনো পরিচয় না থাকায় হত্যাকাণ্ডটি সূত্রহীন হিসেবে তদন্তে নামে পুলিশ। পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর সহায়তা এবং তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে নিহতের পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
নিহতের নাম মো: লায়েছ আহমদ (৩৪)। তিনি সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারাবাজার থানার পানাইল নতুনপাড়া গ্রামের মরহুম আব্দুর মিয়ার ছেলে। খবর পেয়ে স্বজনরা এসে লাশ শনাক্ত করেন।
সিসিটিভিতে মেলে হত্যার সূত্র
হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার ধারণ করা দৃশ্য পর্যালোচনা শুরু করে পুলিশ।
ওই দৃশ্যে দেখা গেছে, একটি রিকশাভ্যানে করে ভ্যানচালক ও অন্য এক ব্যক্তি এসে বস্তাটি ফেলে যায়। সিসিটিভি দৃশ্য ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত চালিয়ে কোতোয়ালি থানাধীন শামীমাবাদ এলাকা থেকে ভ্যানচালক আক্কাছকে আটক করে পুলিশ। তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত মো: শামছু মিয়া (৩৪)-কে সিলেটের গোলাপগঞ্জ থানাধীন খালপাড় এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়।
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শামছু মিয়া হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। পরে তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে মামুন মিয়া (৩২) ও মো: সাজু মিয়া (৩৩) নামে আরো দুই সহযোগীকে তাদের নিজ বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয়।
পাওনা টাকা নিয়ে বন্ধুকে হত্যা
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে জানানো হয়, নিহত লায়েছ আহমদ ও গ্রেফতার আসামিরা পরস্পর বন্ধু ছিলেন। আগের পাওনা টাকা ফেরত না দেয়াকে কেন্দ্র করে ঘটনার দিন লায়েছের সাথে শামছু মিয়ার কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে শামছু মিয়া ক্ষিপ্ত হয়ে লায়েছ আহমদের মাথায় সেলাই রেঞ্জ দিয়ে আঘাত করেন। পরে মামুন ও সাজু মিয়ার সহায়তায় লায়েছকে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের কাছে প্রাথমিকভাবে স্বীকার করেছেন শামছু মিয়া। হত্যাকাণ্ডের পর লাশ বস্তাবন্দি করে রিকশাভ্যানে করে কদমতলী বাস টার্মিনাল এলাকায় ফেলে রাখা হয়। পরে সেখান থেকেই পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা বস্তাটি দেখতে পান। পুলিশ অভিযান চালিয়ে মূল আসামি শামছু মিয়ার দোকান থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি সেলাই রেঞ্জ, একটি বড় বটি দা ও অন্যান্য আলামত জব্দ করেছে।
আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি
এ ঘটনায় নিহত লায়েছ আহমদের ভাই শায়েক আহমদ দক্ষিণ সুরমা থানায় মামলা করেছেন। ওই মামলায় গ্রেফতার তিনজনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।
এদিকে, মামলার মূল আসামি মো: শামছু মিয়া আদালতে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত কারণ উদ্ঘাটন, ঘটনার সাথে আর কেউ জড়িত ছিল কি না এবং হত্যার পুরো ঘটনাক্রম নিশ্চিত করতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
এসএমপি কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম বলেন, প্রথমে ঘটনাটি সূত্রহীন মনে হলেও সিসিটিভি ক্যামেরার ধারণ করা দৃশ্য, তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তৎপরতার সমন্বয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়েছে। তদন্তে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।