ঝালকাঠি প্রতিনিধি
নলছিটি উপজেলার তৃণমূল জনপদ হাড়িখালী গ্রামের ধার্মিক পরিবারে জন্ম নেন শরিফ ওসমান বিন হাদি। ধার্মিক পরিবারের কারণেই বাড়িটির নাম দেয়া হয়েছে মুন্সিবাড়ি। শিশুকাল থেকেই বাবার কণ্ঠে কোরআন তেলাওয়াত শুনে বেড়ে ওঠেন হাদি।
বাবা মাদরাসা শিক্ষক হওয়ায় তার পড়াশোনার হাতে খড়ি হয় মাদরাসায়। ঝালকাঠি এনএস কামিল মাদরাসা থেকে আলিম পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অনার্সে ভর্তি হন তিনি।
মাদরাসায় পড়ার সময়ই রাজনীতি, আন্দোলন ও বিকল্প রাষ্ট্রচিন্তা নিয়ে তিনি অসংখ্য দেশপ্রেমিকের কাছে অনুপ্রেরণার নাম হয়ে ওঠেন। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে ন্যায় ও ইনসাফের প্রশ্নে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সোচ্চার।
সেই ছোট্ট ছেলেটিই আজ দুর্বৃত্তদের হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন।
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতিতে আলোচিত এক তরুণ নেতৃত্ব। সেই ওসমান হাদিকে প্রকাশ্য রাজপথে গুলি করার ঘটনায় সর্বমহলে নিন্দা ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
রাত সাড়ে ১০টার দিকে সারাদেশের মতো ঝালকাঠিতেও শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে শহরের ফায়ারসার্ভিস মোড়ে অবস্থান নিতে শুরু করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলনের নেতাকর্মীরা। সেইসাথে যোগ হয় বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মীরাও।
হাদি ঝালকাঠি জেলার সন্তান হওয়ায় তীব্র শীতের রাতে ভালোবাসার টানে ছাত্রদের সাথে বিক্ষোভ করেন সাধারণ জনতাও। তারা হাদির হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে স্লোগান দিচ্ছিলেন। কলেজ মোড়ে অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন বিক্ষুব্দ ছাত্র-জনতা।
ওসমান হাদির বাবা মরহুম মাওলানা আব্দুল হাদি নলছিটি ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার সাবেক উপাধ্যক্ষ ও স্থানীয়ভাবে সুপরিচিত ও সম্মানিত একজন আলেম।
তিন ভাই ও তিন বোনের পরিবারে ওসমান হাদি সবার ছোট। তার বড় ভাই মাওলানা আবু বক্কর ছিদ্দিক বরিশাল বাঘিয়া আল আমিন কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ এবং উজিরপুর গুঠিয়া বায়তুল আমান জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব। মেজ ভাই ওমর ফারুক ঢাকায় ব্যবসার সাথে যুক্ত। বোনদের পরিবারও শিক্ষা ও ধর্মীয় পরিবেশে গড়ে উঠেছে।
শরিফ ওসমান হাদির শিক্ষাজীবনের শুরু বাবার কর্মস্থল নলছিটি ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসায়। পরে তিনি ভর্তি হন দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঐতিহ্যবাহী ঝালকাঠি এন এস কামিল মাদরাসায়। সেখানো বক্তৃতা, আবৃত্তি ও যুক্তিনির্ভর আলোচনায় তার দক্ষতা শিক্ষকদের পাশাপাশি সহপাঠিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আবৃত্তি ও উপস্থিত বক্তৃতায় তিনি ছিলেন বিশেষভাবে পারদর্শী। জেলা, বিভাগ ও জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তিনি তার প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন এবং অসংখ্য পুরস্কার অর্জন করেন।
মাদরাসা শিক্ষা শেষ করে ওসমান হাদি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে। সেখান থেকেই অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন তিনি। রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও জনগণের সম্পর্ক নিয়ে তার চিন্তাভাবনার শুরু ছাত্রজীবন থেকেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি অধিকার সচেতন ছিলেন এবং বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলনে অংশগ্রহণ ও সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ওসমান হাদি এক বিপ্লবী নেতৃত্ব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। জুলাই-আগস্টে ঢাকার রামপুরা এলাকায় বসবাসকারী হাদি আন্দোলনের সময় স্থানীয় সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলায় তিনি ছিলেন সক্রিয়। রাজপথে ছাত্র-জনতার পাশে থাকা, আন্দোলন সংগঠিত করা ও আহতদের সহায়তা সব ক্ষেত্রেই তার উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য।
৫ আগস্ট-পরবর্তী প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতাকে সাথে নিয়ে এবং বিভিন্ন দাবির ভিত্তিতে তিনি ১৩ আগস্ট ২০২৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে ইনকিলাব মঞ্চের যাত্রা শুরু করেন।
সংগঠনটির মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন শরিফ ওসমান হাদি এবং সদস্য সচিব হিসেবে রয়েছেন আব্দুল্লাহ আল জাবের। সংগঠনটির লক্ষ্য হলো সব ধরনের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা।
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবি, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং পুরনো ধারার রাজনীতির কঠোর সমালোচনাসহ নানা বিষয়ে বক্তব্য দেয়ার কারণে বর্তমান বাংলাদেশে ওসমান হাদি ব্যাপক আলোচনায় রয়েছেন।
ওসমান হাদির ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনায় তার জন্মভূমি ঝালকাঠি, নলছিটিসহ সারা দেশে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। তার দ্রুত সুস্থতা কামনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঝালকাঠির নেছারাবাদ এন এস কামিল মাদরাসাসহ নিজ জেলার প্রতিটি উপজেলা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে দোয়া মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ওসমান হাদি বরিশালের রহমতপুরে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি এক পুত্রসন্তানের জনক। তিনি ঢাকার রামপুরায় স্বপরিবারে বসবাস করতেন।
হাদির পরিবারের সুপরিচিত নলছিটির আল আমিন তালুকদার বলেন, ‘ওসমান হাদির ব্যক্তিত্ব হঠাৎ তৈরি হয়নি। তার বাবার আদর্শ, শাসন ও মানবিকতা এই তিনটি বিষয়ই তাকে গড়ে তুলেছে। ছোটবেলা থেকেই আমি হাদির বাবাকে একজন সৎ ও আলেম মানুষ হিসেবে দেখেছি। তার শাসন ছিল কঠোর, তবে সেই কঠোরতার ভেতরেই ছিল ন্যায়বোধ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার শিক্ষা।’
তিনি বলেন, ‘এ কারণেই ওসমান হাদি কখনো নিজের স্বার্থকে বড় করে দেখেনি, বরং সব সময় সমাজের কথা ভেবেছে। পারিবারিক আদর্শই শরিফ ওসমান হাদিকে আজকের ওসমান হাদি বানিয়েছে। দুবৃত্তের গুলিতে গুরুতর আহত হবার সাত দিন পরে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। আল্লাহ যেন তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন।’
হাদির সহপাঠী ইসমাইল মুসাফির বলেন, ‘হাদি কখনোই সুবিধাবাদী ছিল না, এটাই তার সবচেয়ে বড় পরিচয়। আমরা যখন নিরাপদ পথে চলতে চাইতাম, তখন সে বলত, সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে গেলে ঝুঁকি নিতেই হয়। সে বিশ্বাস করত, চুপ থাকা মানেই অন্যায়ের সাথে আপস করা।’
তিনি বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে সে সামনে থাকবে এটা আমরা আগেই বুঝেছিলাম। কারণ, ছোট বয়স থেকেই সে রাজনৈতিকভাবে পরিপক্ব ছিল। দেশ, জাতি ও সমাজের পরিবর্তন নিয়ে সে সবসময় কথা বলত এবং অন্যায় দেখলে সামনে গিয়ে প্রতিবাদে নেতৃত্ব দিত। তবে তার শেষ পরিণতি এমন হবে তা কখনো ভাবিনি। আল্লাহ তাকে শহীদি মর্যাদা দান করুন, আমীন।’
তার সরাসরি শিক্ষক মাওলানা এসহাক আহমেদ বলেন, ‘আমি তাকে ছাত্র হিসেবে পড়িয়েছি, বক্তা হিসেবেও দেখেছি। কিন্তু জুলাইয়ের পর সে আর শুধু ছাত্র বা বক্তা ছিল না, সে হয়ে ওঠে এক রাজনৈতিক বিপ্লবী কণ্ঠ। ক্লাসরুমে তার প্রশ্নগুলো সবসময় আলাদা ছিল, পাঠ্যবইয়ের বাইরের সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে সে ভাবত। আন্দোলনের সময় সেই চিন্তাগুলোই তাকে মানুষের কণ্ঠস্বর বানিয়েছে। কিন্তু প্রস্ফুটিত ফুলটিকে সুঘ্রান ছড়ানোর শুরুতেই চিরবিদায় নিতে হলো।’
এমন মৃত্যু নিশ্চয়ই শহীদি মর্যাদা পাবেন সে দোয়াও করেন শিক্ষক মাওলানা এসহাক আহমেদ।
ঝালকাঠি এন এস কামিল মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা গাজী শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘ওসমান হাদি আমাদের প্রতিষ্ঠানের সাবেক শিক্ষার্থী। এই মাদরাসায় কর্মরত অবস্থায় আমি তাকে পাইনি, তবে সহকর্মীদের কাছ থেকে তার প্রতিভা ও দেশপ্রেমের কথা শুনেছি।’
তিনি বলেন, ‘ছাত্রজীবন থেকেই সে অন্যদের চেয়ে আলাদা ছিল। শুধু ভালো ফলাফল নয়, সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে তার গভীর চিন্তা আমাদের নজর কেড়েছিল। অন্যায় দেখলে সে প্রশ্ন তুলত ও যুক্তি দিত। সে যে জায়গায় দাঁড়িয়ে কথা বলছে, তাতে আমরা বিস্মিত নই, বরং মনে করি, এটাই ছিল তার স্বাভাবিক গন্তব্য।’
আল্লাহ তাকে শহীদি মর্যাদা দান করে জান্নাতের উচ্চতর আসনে অধিষ্ঠিত করবেন সেই প্রত্যাশাও করেন তিনি।