রাজধানীর অদূরে সাভার পৌর এলাকার মজিদপুরে মেয়ের হাতে বাবা মো: আব্দুস সাত্তার (৫৬) নৃশংসভাবে খুন হওয়ার সপ্তাহ পার হলেও এখনো এ হত্যাকাণ্ডের ধোঁয়াশা কাটেনি। অভিযুক্ত মেয়ে জান্নাতুল জাহান শিফা (২৩) বাবার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ তুললেও আব্দুস সাত্তারের প্রথম স্ত্রীর ছেলে বলছেন, তার বাবা ছিলেন একজন আলেম এবং খুবই ভালো মানুষ।

আর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বলছেন, ২০২৩ সালে তার বাবার বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা করা হলে আব্দুস সাত্তার ওই মামলায় জামিনে আসার পর থেকে মেয়েকে মামলা প্রত্যাহারের জন্য বিভিন্ন সময় চাপ প্রয়োগ করতো এবং খুনের ঘটনার আগে মেয়ের পক্ষ থেকে বাবার বিরুদ্ধে ধর্ষণের কোনো অভিযোগ করা হয়নি। শিফা প্যান্ট-শার্ট পরতো এবং সিগারেটও খাওয়ার অভ্যাস ছিল।

থানার অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, সাভার পৌর এলাকার মজিদপুরের জনৈক কামরুল ইসলাম সুমনের বাড়ির ভাড়াটিয়া মো: আব্দুস সাত্তার তার তৃতীয় স্ত্রী মারা গেলে বর্তমান ঠিকানায় তার তৃতীয় স্ত্রীর সন্তান মামলার এজহারভুক্ত আসামি জান্নাতুল জাহান শিফাকে নিয়ে বসবাস করে আসছেন। আব্দুস সাত্তারের প্রথম স্ত্রীর সন্তানরা গত ৮ মে পুলিশের মাধ্যমে খবর পান জান্নাতুল জাহান শিফা তাদের বাবা আব্দুস সাত্তারকে খুন করেছে। পরে সাভারের মজিদপুরের ভাড়া বাসায় এসে বাড়ির কেয়ারটেকার এবং সাবলেট ভাড়া বাসার অন্য ভাড়াটিয়া তুহিনের মাধ্যমে জানতে পারেন রাত ৪টার সময় শিফা সাবলেট ভাড়াটিয়া তুহিনের রুমের দরজায় নক করে বলতে থাকে আমি আমার বাবাকে মেরে ফেলেছি। তখন ভাড়াটিয়া তুহিন ভয়ে দরজা না খুলে জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-তে ফোন করলে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে লাশটি উদ্ধার করে।

অভিযোগে আরো উল্লেখ করা হয়, আব্দুস সাত্তারকে খাবারের সাথে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ধারালো চাকু দিয়ে হত্যা করে শিফা।

নিহতের প্রথম স্ত্রীর বড় ছেলে হাসিবুর রহমান বলেন, ‘বাবার তৃতীয় স্ত্রীর একমাত্র মেয়ে শিফাকে তারাসহ তার বাবা খুবই আদর-স্নেহ করতেন। কিন্তু এক পর্যায়ে এমন কিছু কাজ করা শুরু করেন, বাবা বাধা দিতে গেলে শিফা বাবার অবাধ্য হয়ে যায়। আমরা তাকে কাছে টানার চেষ্টা করলেও সে এগিয়ে আসতো না। শিফা নিজেকে বাঁচানোর জন্য বাবার ওপর দোষ চাপিয়ে তাকে হত্যা করে। শিফার কোনো ছেলে বন্ধু ছিল না, যারা ছিল সবই মেয়ে বন্ধু।’

তিনি অভিযোগ করেন, অনৈতিক এবং অন্য দু’টি মেয়ের সাথে সমকামী সম্পর্ক দেখে ফেলায় এবং এতে বাধা দেয়ায় পরিকল্পিতভাবে বাবাকে খুন করা হয়েছে।

শিফাকে আদালতে পাঠালে বিজ্ঞ বিচারকের কাছে বাবা হত্যার স্বীকারোক্তিমূলক জবাবন্দি দেয়। পরে বিচারক তাকে জেল হাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

নিহত আব্দুস সাত্তার নাটোর জেলার সিংড়া থানার ভোগা গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন।

হাসিবুর রহমান জানান, ‘আমার বাবা অত্যন্ত সৎ ও ধর্মভীরু মানুষ ছিলেন। মাদরাসা থেকে দাওরা ও আলিম পাস করেন। তিনি মাঝে-মধ্যে আমাদের সাথে ঢাকার মোহাম্মদপুরে বাসায় যেতেন এবং সাভারেও আলাদা ভাড়া বাসায় থাকতেন।’

তিনি আরো জানান, তার বাবা তিন বিয়ে করেছেন। তিন সংসারে তারা তিন ভাই ও দুই বোন। তিনি প্রথম স্ত্রীর সন্তান এবং অভিযুক্ত শিফা তৃতীয় স্ত্রীর এক মাত্র মেয়ে। তৃতীয় স্ত্রী মারা যাওয়ার পর শিফাকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে ফেরেন আব্দুস সাত্তার। কিন্তু শিফার উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন, অশালীন পোশাক ও দোকানে গিয়ে ধূমপান করার মতো আচরণের কারণে গ্রামের লোকজন বিরক্ত হয়ে পড়ে। আত্মীয়-স্বজন এবং গ্রামের মানুষের বিরূপ মন্তব্যের কারণে প্রতিবাদ করায় ২০২৩ সালে শিফা বাবার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ করেন।

হাসিবুর রহমানের দাবি, পুরোটাই মিথ্যা ও সাজানো মামলা ছিল এবং ডাক্তারী পরীক্ষাও তা প্রমাণিত হয়নি। প্রমাণ না থাকায় বাবা দ্রুত সময়ে জামিন লাভ করেন।

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা জানতাম বাবার সাথে শিফার কোনো যোগাযোগ নেই। তবে বাবা শিফার কথা ভেবে অনেক সময় দুশ্চিন্তা করতেন। কিন্তু খুনের পর জানতে পারি, শিফা বাবার সাথেই এক বাসায় থাকতেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘শিফার পড়াশোনায় কলেজ পর্যায় পর্যন্ত যাওয়া সম্ভব হয়নি। তার আগেই বাবা এবং পরিবারের অবাধ্য হয়ে যায়। তার কোনো ছেলেবন্ধু ছিল না, যারা ছিল সবই মেয়ে বন্ধু।’

সরেজমিন মজিদপুর মহল্লায় গেলে জানা যায়, বহুতল ভবনের পঞ্চম তলায় নিহত আব্দুস সাত্তার একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে দু’টি রুম সাবলেট ভাড়া দেন। আব্দুস সাত্তার ডাইনিং রুমে, তার মেয়েসহ তিনটি মেয়ে এক রুমে এবং অপর একটি রুমে তুহিন নামের এক ব্যক্তির পরিবারকে ভাড়া দেন। নিহতের মেয়েসহ অপর দু’টি মেয়ে অনৈতিক কাজ করতেন। আর নিহত আব্দুস সাত্তার তাদের সেই অনৈতিক কাজের বাধা দিতে গেলে বাবাকে হত্যা করে মেয়ে।

মজিদপুরে যে ভবনে খুনের ঘটনা ঘটে ওই বাড়ির সামনে সাভার মল নামের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক আব্দুল হাকিমের সাথে আলাপকালে তিনি নয়া দিগন্ত বলেন, ‘খুন হওয়ার আগের দিন সকালে আব্দুস সাত্তার তার দোকানে এসে দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিল, তিনি আর মেয়েটাকে নিয়ে পারছেন না। মেয়েটি তার কোনো কথা শুনে না। যাবার সময় বলেছিল তার শরীরটা খুবই দুর্বল, কিন্তু পরে আসা হয়নি। এ সময় আব্দুল হাকিম এবং তার ছেলে আকাশ বলেন, মেয়েটি খুবই উছৃঙ্খল ছিল, প্যান্ট-শার্ট পরতো, তার বাবা তাকে শাসন করতে পারতেন না। তার মেয়ের সাথে আরো দু’টি মেয়ের অনৈতিক কাজে বাধা দেয়ায় মেয়েটি তার বাবাকে খুন করেছে।’

প্রতিবেশী আরেক ব্যবসায়ী ইব্রাহীম স্টোরের মালিক আলমগীর হোসেনের নাতি আলী হায়দার নয়া দিগন্তকে জানান, ‘শিফাসহ তিনটি মেয়ে আমার দোকান থেকে নিয়মিত সিগারেট নিয়ে তারা খেতেন। তারা সব সময় ছেলেদের ন্যায় প্যান্ট-শার্ট পরতেন।’

বহুতল ভবনের কেয়ারটেকার মো: রহিজ উদ্দিন জানান, ‘নিহত আব্দুস সাত্তার ছয় মাস এবং তার মেয়ে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তাদের ভবনের পঞ্চম তলার এ ফ্ল্যাটে উঠেন। এ ফ্ল্যাটে সব সময় মেয়েরা আসতো। কোনো ছেলে আসতো না। যে কয়টি মেয়ে আসতো সবাই প্যান্ট-শার্ট পরতো। এ জন্য তাদেরকে বিভিন্ন সময় এলাকার মুরুব্বিদের বিভিন্ন কথা শুনতে হতো।’

এ ঘটনায় নিহতের পরিবার পক্ষ থেকে প্রথম স্ত্রীর ছেলে হাসিবুর রহমান সাভার মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। বর্তমানে পুলিশ মামলাটি তদন্ত করছে। নিহতের পরিবার ও স্থানীয়রা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও শাস্তির দাবি জানিয়েছে।

স্থানীয় ও পরিবারের দাবি, মেয়েটি নিজের অপকর্ম লুকানোর জন্য নিজের বাবাকে খুন করে, তার জন্মদাতা বাবার ওপর অপবাদ দিয়েছে। আর মেয়ে বলছে, তার বাবা তাকে শারীরিক নির্যাতন করেছে। তাই এই ধোঁয়াশা দূর করে এই হত্যার যথাযথ বিচার হোক দাবি করেন তারা।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (এসআই) মো: ইমরান হোসেন বলেন, ‘অভিযুক্ত জান্নাতুল জাহান শিফা বর্তমানে জেলা হাজতে রয়েছে এবং তার সাথে থাকা অপর দুই বান্ধবিকে পরিবারের কাছে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।’