দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকালে শামীম ওসমানের টাকার মেশিনখ্যাত নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও স্থানীয় পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান ও হাজার কোটি টাকার মালিক ইঞ্জিনিয়র মাসুদুর রহমান মাসুম গ্রেফতার ঘটনায় নারায়ণগঞ্জে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
নানা অপকর্মের মাধ্যমে প্রায় হাজার কোটি টাকার মালিক মাসুম গেল বছর ৫ আগস্টের পর কাদের শেল্টারে আত্মগোপনে ছিলেন কিংবা হত্যা মামলা থাকার পরও কারা তাকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সহযোগিতা করেছেন সে প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে। এছাড়া তার অপকর্ম নিয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছে ভুক্তভোগীরা।
আজ মঙ্গলবার হত্যা মামলার আসামি হিসেবে তাকে আদালতে পাঠাবে পুলিশ। এর আগে, সোমবার (১২ মে) সকালে একটি ফ্লাইটে সৌদি আরব যাওয়ার সময় শাহজালাল বিমানবন্দরে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।
মাসুমের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে তিনটি হত্যাসহ একাধিক মামলা রয়েছে।
এছাড়া ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় সামনে সারিতে থেকে আন্দোলন প্রতিহত করার নেতৃত্ব দেন মাসুম বলে অভিযোগ রয়েছে। শামীম ওসমানের অন্যতম দোসর হিসেব বিগত আওয়ামী লীগের সময় প্রায় হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যান তিনি।
আওয়ামী লীগ নেতা মাসুমকে গ্রেফতারের বিষয়ে সোনারগাঁ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মফিজুর রহমান বলেন, সোমবার সকালে তাকে গ্রেফতার করা হয়। একটি ফ্লাইটে হজ পালনের নাম করে দেশ থেকে পালানোর চেষ্টা করছেন তিনি। তার বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে কাঁচপুরে নিহতের ঘটনায় সোনারগাঁ থানায় হত্যাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। ওই মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হবে।
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (খ-সার্কেল) আসিফ ইমাম জানান, তার (মাসুম) বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের তিনটি হত্যা মামলা রয়েছে। মাসুদুর রহমান মাসুম গত ৫ আগস্টের পর থেকে পলাতক ছিলেন। সোমবার সকালে বিমানের হজ ফ্লাইটে ওঠার আগে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন পুলিশ তাকে আটক করে। পরে তাকে আশকোনা হজ ক্যাম্পে নিয়ে রাখা হয়। সেখান থেকে সোনারগাঁ থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, সোনারগাঁয়ের নানা অপরাধের হোতা উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় নদীসহ সরকারি-বেসরকারি জমি দখল করে মেঘনা গ্রুপকে হস্তান্ত করে হাজার কোটি টাকা লুটপাটের পর ওসমান পরিবারের সাথে মিলেমিশে ভাগবাটোয়ারা করতেন।
জানা গেছে, দীর্ঘ ১৫ বছর নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবার ও স্থানীয় সাবেক এমপি লিয়াকত হোসেন খোকার সাথে মিলে লুটপাটের মহোৎসব চালাতেন ইঞ্জিনিয়ার মাসুদুর রহমান। প্রতিনিয়ত মেঘনা গ্রুপসহ বিভিন্ন কলকারখানা থেকে চাঁদাবাজির বিশাল অর্থ উত্তোলন করে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবে এসে শামীম ওসমানের কাছে টাকার বান্ডিল হস্তান্তর করতেন এই মাসুম।
স্থানীয়রা জানায়, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভাগ্যের চাকা ঘুরতে থাকে মাসুম চেয়ারম্যানের। প্রথমবার সোনারগাঁয়ের পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তিনি বিএনপি চেয়ারম্যান প্রার্থী রফিকুল ইসলামের কাছে বিশাল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। পরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তিনি নৌকা প্রতীক পেয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর তাকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। মেঘনা গ্রুপ, আল মোস্তফাসহ ওই ইউনিয়নের যেকোনো কোম্পানির জমি ক্রয়-বিক্রয়, বালু ভরাট ও দখল বাণিজ্যে মেতে ওঠেন মাসুম। তার হুকুম ছাড়া এসব কোম্পানিতে কোনো কাজই হতো না। কয়েক বছরের ব্যবধানে মেঘনা এলাকায় একাধিক বহুতল ভবন, ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, নামে-বেনামে প্রচুর জমি-জমা, একাধিক গাড়িসহ প্রায় হাজার কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন তিনি।
এর আগে, অবৈধ সম্পদের হিসাব চেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাকে নোটিশ দিয়েছিল। পরে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এসব অভিযোগ থেকে তিনি মুক্তি পান।
সূত্র জানায়, অসহায় কৃষকদের জমি জাল-জালিয়াতি করে হাতিয়ে নিয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে জমি চড়া দামে বিক্রি করে রাতারাতি কোটিপতি বনে গেছেন মাসুম। মেঘনা নদীর পাশে সোনাউল্লাহ মৌজায় গোটা একটি চর এভাবে কৃষকদের কাছ থেকে নামমাত্র দামে জোর করে কিনে এখন তিনি সেটা বালু দিয়ে ভরাটের কাজ করেন। পিরোজপুর এলাকার একটি খালও তিনি ভরাট করতে শুরু করেছেন।
এছাড়া মাসুমের বিরুদ্ধে মেঘনা শিল্পাঞ্চল এলাকার একাধিক স্কুলের ছাত্রীদের সাথে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগও রয়েছে। ছাত্রীদের সাথে তার অশ্লীল কথাবার্তার একাধিক অডিও ভাইরাল হয়েছে। এসব ছাত্রীর অভিভাবকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে তিনি মামলাও করতে দেননি।