জুলাই বিপ্লবে পুলিশের গুলিতে শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার আসামিদের গ্রেফতারের দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

বৃহস্পতিবার (১৫ মে) সন্ধ্যায় রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে এ মানববন্ধন ও বিক্ষোভ থেকে এই ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা।

এ সময় বিক্ষোভ ও মানববন্ধনে নেতৃত্ব দেন শহীদ আবু সাঈদের ভাই আবু হোসেন ও বোন সুমি। বিক্ষোভ সমাবেশে বৈষম্যবরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও পরিবারের সদস্যরা আসামি গ্রেফতার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী শামসুর রহমান সুমন বলেন, ‘এটা আমাদের জন্য লজ্জার বিষয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যার ঘটনার বিচারের জন্য আমাদের আন্দোলন করতে হচ্ছে। এর থেকে লজ্জার আর কিছু হতে পারে না। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম প্রায়োরোটি থাকা উচিত ছিল আবু সাঈদ হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও বিচার। জুলাই বিপ্লবের হত্যাকারীদের বিচার। কিন্তু সেটা দৃশ্যমান হয়নি। মাত্র চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এটা আমরা কোনোভাবেই মানতে পারি না। অবিলম্বে আসামিদের গ্রেফতার এবং তাদের বিচার প্রক্রিয়া দৃশ্যমানভাবে শুরু না করতে পারলে আইন উপদেষ্টা ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে পদত্যাগ করার দাবি জানাচ্ছি।’

বিক্ষোভে অংশ নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রংপুর মহানগর সদস্য সচিব রহমত আলী বলেন, ‘আমরা দেখেছি যেসব খুনি ‍পুলিশ সদস্যদের নির্দেশে আমার ভাই আবু সাঈদের বুকে গুলি চালানো হয়েছিল তারা এখনো পুলিশের ইউনিফর্ম পরিধান করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এটা আবু সাঈদের রক্তের সাথে সুস্পষ্ট বেঈমানি। ইন্টিরিম সরকার আমাদের আশ্বস্ত করেছিল আবু সাঈদের মামলার বিষয়ে তারা যত্নশীল। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এতে ছাত্র-জনতা আমরা ক্ষুব্ধ। ট্রাইবুনালে বসে তদন্ত নয়, ঘটনাস্থলে এসে তদন্ত করুন। খুনিদের গ্রেফতার করুন। এটা করা না হলে হাজার হাজার আবু সাঈদ আবারো রক্ত দেয়ার জন্য রাজপথে নামবে।’

বিক্ষোভে অংশ নেয়া আবু সাঈদকে প্রথম উদ্ধারকারী রংপুর আরসিসি পাবলিক স্কুলের এইচএসসি পরীক্ষার্থী আয়ান বলেন, ‘প্রতিটা বিপ্লবের একটা সিম্বল থাকে। বাংলাদেশে ২৪-এর বিপ্লবের সিম্বল শহীদ আবু সাঈদ। তার খুনি ‍পুলিশরা এখনো পোশাকে ডিউটি করছে। অনেক পুলিশকে মামলায় আসামি করা হয়নি। মাত্র চারজন আসামি গ্রেফতার হয়েছে। এটা আমাদের এই সরকারের জন্য একটা কলঙ্কজনক অধ্যায়। আমরা বলতে চাই, আইন উপদেষ্টা যদি বিচার করতে না পারেন, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা যদি গ্রেফতার করতে না পারেন তাহলে আপনারা পদ থেকে সরে দাঁড়ান। আমরা আবু সাঈদের খুনিদের ইউনিফর্ম পরে দেখতে চাই না। খুনিদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আস্ফালন দেখতে চাই না। অবিলম্বে খুনিদের গ্রেফতার করতে হবে, যাদের আসামি করা হয়নি, তাদের আসামি করতে হবে। নইলে আবারো জুলাই শুরু হবে রংপুর থেকে।’

বিক্ষোভ মানববন্ধনে শহীদ আবু সাঈদের ছোট বোন সুমি আখতার বলেন, ‘আবু সাঈদ ভাইয়ের ছবিতে দেখা যাচ্ছে, পুলিশ কীভাবে তাকে গুলি করে হত্যা করেছে। সব কিছুর ভিডিও আছে। কিন্তু আসামিদের ধরা হচ্ছে না। বিচার শুরু হচ্ছে না। তাহলে কি আমরা বিচার পাবো না? আসামিরা পুলিশ আওয়ামী লীগ হওয়ার কারণে কী তারা পার পাবে। তাহলে আমার ভাইয়ের জীবন দেয়ার অর্থ কী হলো? আমি চাই আসামিদের গ্রেফতার করে বিচার শুরু করা হোক।’

শহীদ আবু সাঈদের বড় ভাই আবু হোসেন বলেন, ‘যার জীবন দানের মাধ্যমে দেশ ফ্যাসিস্ট মুক্ত হয়েছে। তার হত্যাকারীদের বিচার ও গ্রেফতারের দাবিতে আমাদের রাস্তায় আন্দোলন করতে হচ্ছে। এটা অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য লজ্জার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার ভাইয়ের জীবনের বিনিময়ে যারা এই সরকার গঠন করলো তারা আজও বিচারের কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। এতে আমরা ক্ষুব্ধ লজ্জিত ও আতঙ্কিত। তাহলে কি আামার ভাই হত্যার বিচার পাবো না? তাহলে কি আবারো দেশ ফ্যাসিবাদিদের নিয়ন্ত্রণে যাবে? আমরা দৃশ্যমান বিচার ও আসামিদের গ্রেফতার দেখতে চাই। আমাদের একদফা দাবি।’

গেলো বছর ১৬ জুলাই রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর গেটের সামনে আন্দোলন চলাকালে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। দু’হাত উঁচিয়ে পুলিশের গুলি বরণ করার দুঃসাহসের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। এরপর ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে পাশের দেশে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর ড. ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে দেশ পরিচালিত হচ্ছে।

আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় বড় ভাই রমজান আলী বাদি হয়ে প্রথমে ১৭ জন আসামির নাম উল্লেখ করে একটি মামলা করেন। পরে আরো সাতজনের নাম উল্লেখ করে সম্পূরক এজাহার দায়ের করা হয়। এই মামলায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীসহ অনেক পুলিশ কর্মকর্তা ও আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীর নাম নেই। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন সংগ্রাম করে আসছে পরিবার ও রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

আবু সাঈদ হত্যা মামলায় শুধু মাত্র রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সময়কার প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, পুলিশের এএসআই আমীর আলী, কনস্টেবল সুজন চন্দ্র এবং শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইমরান চৌধুরী আকাশকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদেরকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালেও হাজির করা হয়েছে।

অন্যদিকে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আবু সাঈদ হত্যাসহ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা নিপীড়নের বিষয়ে মামলা করলেও সেই মামলায় ওই সময়কার ভিসি, প্রক্টর, ছাত্র উপদেষ্টা, বহিরাঙ্গন পরিচালক, জড়িত শিক্ষক-কর্মকর্তা, ছাত্রলীগসহ বহিরাগতদের নাম নেই।