বাংলার লোকসংগীতের কিংবদন্তি দোতারা বাদক, গীতিকার ও সুরকার কানাইলাল শীলের নাম আজও দেশ-বিদেশের সংগীতাঙ্গনে শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হয়। অথচ তার জন্মভিটা, স্মৃতিচিহ্ন ও ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্রসহ নানা ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে অবহেলার শিকার।

স্থানীয়দের দাবি, লোকসংগীতের এই অমূল্য সম্পদের স্মৃতি সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ না নেয়ায় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।

ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া ইউনিয়নের লস্করপুর গ্রামে প্রায় ৯০ শতাংশ জমির ওপর গড়ে ওঠা কানাইলাল শীলের পৈতৃক বাড়িতেই এখনো তার পরিবারের সদস্যরা বসবাস করছেন।

দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে শিল্পী, গবেষক ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা নিয়মিত এখানে এলেও তাদের বসার বা কানাইলাল শীল সম্পর্কে জানার মতো কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেই। দীর্ঘদিন ধরেই এখানে একটি সংগ্রহশালা বা স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয়রা।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, কানাইলাল শীলের জন্ম ১৮৯৫ সালের ১ ডিসেম্বর ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলায় এবং মৃত্যু ১৯৭৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকায়। মৃত্যুর পর তাকে ঢাকার পোস্তখোলা শ্মশানে দাহ করা হয়। পরে ১৯৯৪ সালে তার দেহাবশেষ গ্রামের বাড়িতে এনে পুনরায় সমাধিস্থ করা হয়।

পরিবারের সদস্য মাধুরী শীল বলেন, ‘এত বড় একজন গুণী মানুষের স্মৃতি সংরক্ষণে সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর উদ্যোগ বা আশ্বাস আমরা পাইনি। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ আসেন, কিন্তু তাদের বসারও কোনো ব্যবস্থা নেই।’

স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, বাড়ির একটি তমাল গাছের নিচে বসেই দীর্ঘ সময় দোতারা সাধনা করতেন কানাইলাল শীল। একসময় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিল্পীরা সেখানে এসে সংগীতচর্চা করতেন। বর্তমানে সেই ঐতিহাসিক স্থানটিও সংরক্ষণের অপেক্ষায় রয়েছে।

পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের সাথে কানাইলাল শীলের ছিল গভীর বন্ধুত্ব। প্রতি হাটবার, অর্থাৎ শনিবার ও মঙ্গলবার কবি জসীমউদ্দীন লঞ্চযোগে নগরকান্দার চৌমুখা ঘাটে এসে সেখান থেকে হেঁটে কানাইলাল শীলের বাড়িতে যেতেন। বাড়ির সেই তমাল গাছের নিচে বসেই দুজন লোকসংগীত নিয়ে দীর্ঘ সময় চর্চা করতেন।

জসীমউদ্দীন নিয়মিত কানাইলাল শীলের কাছ থেকে লোকগানের পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করতেন। বহু দশক পেরিয়ে গেলেও সেই তমাল গাছটি আজও ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

কানাইলাল শীল তিন ছেলে ও তিন মেয়ের জনক ছিলেন। বড় ছেলে কুমুদ কান্ত শীল বাংলাদেশ বেতারের যন্ত্রশিল্পী ছিলেন। ১৯৮৬ সালে তার মৃত্যু হয়। মেজ ছেলে আষুতোষ শীল বাংলাদেশ শিল্পকলা অ্যাকাডেমির দোতারা বাদক ছিলেন। তিনি ২০২৪ সালের ৩ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন। ছোট ছেলে অবিনাশ শীল বাংলাদেশ বেতার, ঢাকা কেন্দ্রের যন্ত্রশিল্পী ছিলেন। ২০০৭ সালের ৬ ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়।

তার বড় মেয়ে বকুল রানী শীল ছিলেন গৃহিণী। মেজ মেয়ে ফুলমালা শীল গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার বহুগ্রামে বিবাহিত এবং বর্তমানে জীবিত। ছোট মেয়ে গৌরী রানী শীল যশোর সদর উপজেলার বারিন্দিপাড়া গ্রামে বিবাহিত ছিলেন। তারও মৃত্যু হয়েছে।

বর্তমানে কানাইলাল শীলের বড় ছেলে কুমুদ কান্ত শীল এর বড় ছেলে বাদল চন্দ্র শীল পৈতৃক বাড়িতে বসবাস করছেন। তিনি বাংলাদেশ পুলিশে কনস্টেবল হিসেবে চাকরি শেষে অবসর নিয়েছেন। এছাড়া অবিনাশ শীলের ছেলে অরূপ শীল এবং ভাগিনা বিকাশ শীল বর্তমানে যথাক্রমে বাংলাদেশ বেতার, ঢাকা ও খুলনা কেন্দ্রে দোতারা বাদক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

কানাইলাল শীল ছিলেন বাংলার লোকসংগীতের এক অনন্য সাধক। শৈশবে বেহালা শেখার মাধ্যমে তার সংগীতজীবনের সূচনা হলেও পরবর্তীতে দোতারাকেই জীবনের প্রধান সঙ্গী করে তোলেন।

পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের সান্নিধ্যে তিনি কলকাতায় যান, সেখানে আব্বাসউদ্দীন আহমদের সাথে কাজ করেন এবং কাজী নজরুল ইসলামের গানের আসরেও দোতারা বাজানোর সুযোগ পান।

দেশভাগের পর তিনি রেডিও পাকিস্তান, বর্তমান বাংলাদেশ বেতারের ঢাকা কেন্দ্রে নিয়মিত শিল্পী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

‘বহু দিনের পিরিত গো বন্ধু’, ‘মাঝি বাইয়া যাও রে’, ‘শোন গো রূপসী কন্যা গো’ এবং ‘প্রাণ সখিরে ওই শোন কদম্ব তলায়’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় লোকগানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার নাম। লোকসংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ১৯৮৭ সালে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, কানাইলাল শীলের কাছে সংগীত শিক্ষা নিয়েছেন বহু শিল্পী। তাদের মধ্যে সাবেক পুলিশ সুপার, গীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী এম এ খালেক অন্যতম। তিনি ২০২৫ সালে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।

নগরকান্দার দোতারা ও বাঁশিবাদক নূহ আমিনুর রহমান (মিন্টু) বলেন, ‘কানাইলাল শীল ছিলেন এশিয়া মহাদেশের শ্রেষ্ঠ দোতারা বাদক। তাকে ‘দোতারার মুকুটহীন সম্রাট’ বলা হতো। অনেকেই তাকে ‘দোতারা জাদুকর’ নামেও চিনতেন। আমি তার মেজ ছেলে আষুতোষ শীল ও ছোট ছেলে অবিনাশ শীলের কাছে দোতারা বাজানো শিখেছি। আষুতোষ শীল প্রায়ই আমাদের বাড়িতে এসে সংগীতচর্চা করতেন। আর অবিনাশ শীল ছিলেন আন্তর্জাতিক মানের দোতারা বাদক, যিনি অনেকের মতে তার বাবা কানাইলাল শীলকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন।’

নগরকান্দা প্রেসক্লাবের সভাপতি শওকত আলী শরীফ বলেন, ‘কানাইলাল শীল শুধু নগরকান্দার নন, সমগ্র বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অমূল্য সম্পদ। তাঁর স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি সংরক্ষণে উপজেলা প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের দাবী জানাই।’

ফরিদপুর নাগরিক মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কান্তি বালা বলেন, ‘কানাইলাল শীলের ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষা করতে হলে তার পরিবার, স্থানীয় জনগণ এবং প্রশাসনকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। শুধু স্মরণসভা করলেই হবে না, তার স্মৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে স্থায়ী উদ্যোগ প্রয়োজন।’

নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন বলেন, ‘কানাইলাল শীলকে ঘিরে একটি সংগ্রহশালা গড়ে তোলার বিষয়ে আমরা কাজ করছি। তার স্মৃতি সংরক্ষণে কী করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়ার চেষ্টা চলছে।’

এদিকে ফরিদপুর জেলা প্রশাসক (ডিসি) মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘আমি খুব শিগগিরই কানাইলাল শীলের বাড়ি পরিদর্শনে যাব। বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’