ক্রীড়া প্রতিবেদক, চেন্নাই থেকে
২৪ দেশের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ হকি টুর্নামেন্ট যদিও জুনিয়রদের, তবুও বিশ্বকাপ মানেই তো এক ভিন্ন উন্মাদনা। কিন্তু চেন্নাইয়ে নামতেই সেই আমেজের খুব একটা ছাপ মিলল না। চেন্নাই বিমানবন্দরে বিশ্বকাপকে ঘিরে মাত্র একটি ছোট্ট ফেস্টুন টাঙানো ছিল; নানারকম বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের ভিড়ে সেটিও যেন হারিয়ে গেছে। বিমানবন্দর থেকে মেয়র রাধাকৃষ্ণান হকি স্টেডিয়াম পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটারের পথে কোথাও বোঝাই যায়নি যে শহরটি একটি বিশ্বকাপ আয়োজন করছে। রাস্তাজুড়ে শূন্যতা, কোনো ব্যানার পোস্টার নেই চেন্নাইয়ের মতো ঐতিহ্যবাহী শহরের জন্য বিষয়টি বেশ অপ্রত্যাশিতই বলা যায়।
স্টেডিয়ামের সামনেও বড়সড় কোনো সাজসজ্জা দেখা যায়নি। শুধু স্টেডিয়ামের বিপরীত দিকের একটি দেয়ালে রঙের স্পর্শে কিছুটা হকির আবহ ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। উদ্বোধনের আগের রাতেও, ২৭ তারিখে, সারারাত ধরে সংস্কার কাজ চলেছে। কোথাও রাস্তায় রাত দুইটা পর্যন্ত ঢালাই করার দৃশ্য চোখে পড়েছে। স্টেডিয়ামের সামনের রাস্তার একপাশে কিছু ব্যানার লাগানো হলেও বাকিগুলো ছিল একেবারেই অগোছালো ও অসম্পূর্ণ, যা বড় মাপের আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের জন্য মানানসই নয়। মুসলমানদের নামাজের জন্য কোথাও কোন জায়গা রাখা হয়নি।
বাইরের মতো অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাতেও কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্বে ছিলেন ঠিকই, তবে অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট ছিল। প্রায় ৫০ ভলান্টিয়ার আন্তরিক প্রচেষ্টা চালালেও ভাষাগত সমস্যার কারণে অনেক সময় যোগাযোগে বাধা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তামিল ভাষা না জানা দর্শক বা সাংবাদিকদের জন্য। তবুও তারা নিজেদের সাধ্য মতো সাহায্য করার চেষ্টা করেছেন, না পারলে অন্যকে এনে সমাধান দিয়েছেন, যদিও এতে সময় বেশি লেগেছে। মজার বিষয় হলো ছেলে মেয়েরা যারা ভলন্টিয়ার হিসেবে স্টেডিয়াম এরিয়াতে কাজ করেছেন তারা সবাই হকি খেলোয়াড়।
গেটের সামনে পুলিশের কড়াকড়ি ছিল সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো। অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড সংগ্রহ করতে ভেতরে ঢুকতে হবে, এই সহজ বিষয়টি বুঝিয়েও পুলিশ অফিসারদের মন জয় করা যায়নি। তাদের একটাই কথা: কার্ড ছাড়া ভেতরে ঢোকা যাবে না। তারা আবার ফোন করে নিশ্চিত হওয়ার কথাও বলেন। কিন্তু বিদেশীদের জন্য ফোন করতে হলে আগে সিম কার্ড কিনতে হবে, আর আধার কার্ড (ভারতের জাতীয় পরিচয় পত্র) ছাড়া ভারতে সিম পাওয়া অসম্ভব। পরে এক কর্মকর্তা এসে এনআইডি, অফিস আইডি ও রিপোর্টার্স ইউনিটির আইডি রেখে দিয়ে ভেতরে ঢোকার ব্যবস্থা করেন। জানিয়ে দেন অ্যাক্রিডেটিশন কার্ড পাওয়ার পর যাতে ওগুলো নিয়ে যাই। পরে অবশ্য তিনি দুঃখ প্রকাশও করেন।
হোটেল পাওয়ার সমস্যাও কম ছিল না। টানা আটটি হোটেলে খোঁজ করেও কক্ষ পাওয়া যায়নি। প্রতিটি জায়গায় একই নিয়ম : আধার কার্ড ছাড়া কক্ষ দেয়া যাবে না বিদেশিদের। একজন তো স্পষ্ট বলেই দিলেন টিমের জন্য আলাদা তালিকা আছে, আলাদা হোটেল আছে, অনেকে অনুমতি ছাড়া বাইরে বেরোতেও পারে না। সবকিছুতেই কঠোর নিয়মকানুন।
তবে সব বাধা ও বিড়ম্বনার পরও এটা সত্যি মানুষগুলো বেশিরভাগই সহৃদয়। সুযোগ পেলেই সাহায্য করেছেন, আন্তরিকতা দেখিয়েছেন। আর ভিতরে ঢুকলে তবে বোঝা যায়, যতটা অগোছালো বাইরে, তার দ্বিগুণ সৌন্দর্য আর পরিচ্ছন্নতা ফুটে উঠেছে ভেতরে। স্টেডিয়ামের অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য সত্যিই বিশ্বমানের।
আয়োজকদের একজন মুত্তুসোয়ামি জানালেন, অনেক আগ থেকে প্রতি নেয়ার সুযোগ থাকলেও সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে চুড়ান্ত পর্যায়ে ছিলাম না। আজ হবে কাল হবে করতে করতে হঠাৎ করেই আয়োজকের ঘোষণা দেয়া হলো। এই প্রথম ২৪ দলের বিশ্বকাপ বিধায় কিছুটা অনিয়ম, অনিচ্ছাকৃত গাফিলতি থাকতে পারে। তবে সবার আন্তরিকতার অভাব ছিল না। আমরা বিদেশী দলদের চুড়ান্ত যত্ন নিয়েছি। নিরাপত্তার ব্যাবস্থা করেছি। তবে বিচ্ছিন্নভাবে কেউ এলে তাদের যথাযথ ব্যবস্থা করতে পারিনি।