জসিম উদ্দিন রানা, চেন্নাই থেকে
চেন্নাইয়ের আবহে তৈরি এক নতুন পরীক্ষার মঞ্চ। সম্ভাবনার আলো, বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ, স্বপ্নের হাতছানি, সব মিলিয়ে ফ্রান্সের বিপক্ষে এই ম্যাচ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের জুনিয়র হকি দলের জন্য এক প্রকার অগ্নিপরীক্ষা। ফলাফল যাই হোক, বাংলাদেশ জানে তাদের লক্ষ্য লড়াই করা, প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা, আর বিশ্বকে জানিয়ে দেয়া, লাল-সবুজ এখন আর নামমাত্র অংশগ্রহণকারী নয়; বরং সমান তালে লড়াই করতে প্রস্তুত এক নতুন শক্তি।
বাংলাদেশ জানে ফ্রান্সের শক্তি কোথায়। তারা জানে নিজেদের সীমাবদ্ধতাও। কিন্তু তারা এটাও জানে মাঠে নামার আগে কোনো ম্যাচই জিতে যায় না কেউ। ৬০ মিনিটের লড়াই, ৪০ মিনিটে বদলে যাওয়ার গল্প খুবই সাধারণ এই টুর্নামেন্টে। আর বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে তারা হাল ছাড়ে না।
জুনিয়র হকি বিশ্বকাপের চেন্নাই ভেন্যুতে অবস্থান করা ১২টি দলের প্রতিটি আলোচনায় আছে, মাঠে আছে জমজমাট প্রতিদ্বন্দ্বিতা। চেন্নাইয়ে অবস্থান করা দলগুলোও একে একে নিজেদের ক্ষমতার জানান দিচ্ছে। আর সেখানেই সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে বাংলাদেশের নামটি।
নজর না কাড়ার কোনো কারণই নেই। প্রথম ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৩-৫ গোলে হার, দ্বিতীয় ম্যাচে কোরিয়ার বিপক্ষে ৩ গোলে পিছিয়ে পড়েও ৩-৩ গোলের ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়া। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন নব্য ড্র্যাগ-ফ্লিক সেনসেশন আমিরুল ইসলাম, যিনি হ্যাটট্রিক করে দুই ম্যাচেই সেরা নির্বাচিত হন। সেই দীপ্তিতে আজ গ্রুপের শেষ ম্যাচে ফ্রান্সের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ। চেন্নাই মেয়র রাধাকৃষ্ণাণ হকি স্টেডিয়ামে ম্যাচটি শুরু হবে মঙ্গলবার বিকেল ৪টা ১৫ মিনিটে।
পরিসংখ্যান ফ্রান্সের দিকে, শক্তিমত্তা তাদের দিকে, অভিজ্ঞতা ও গতিও। প্রথম ম্যাচেই তারা দক্ষিণ কোরিয়াকে বিধ্বস্ত করেছে ১১-১ গোলে। দ্বিতীয় ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার মতো দলকেও ৮-৩ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে। পুল-এ এটি সবচেয়ে ভয়ঙ্কর, সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ এবং সবচেয়ে শক্তিশালী দল।
ফ্রান্স দল গতি, গোল করার ক্ষমতা, ডিফেন্সের শৃঙ্খলা প্রতিটি জায়গায় তারা অস্ট্রেলিয়া ও কোরিয়াকে ছাপিয়ে গেছে। তাদের পিসি ইউনিট অনবদ্য, মিডফিল্ড অসাধারণ, আর ফরোয়ার্ড লাইনের গতি নিয়ন্ত্রণে না আনলে বাংলাদেশ হিমশিম খেতে পারে। তবু ভয় নেই সামিন বাহিনীর চোখে। তাদের একটাই বিশ্বাস হারানোর কিছু নেই, জেতার আছে অনেক কিছু।
দলের ফরোয়ার্ড ইসমাইল হোসেন জানালেন তাদের পরিকল্পনার কথা, ‘ডিফেন্সিভ খেলেই কাউন্টার অ্যাটাকে যেতে চাই। কোচের নানারকম প্ল্যান আছে, আমরা সেভাবেই খেলতে চাই। কয়েকটি প্ল্যান আমরা আত্মস্থ করেছি। আমরা প্রথমে চেষ্টা করি ফিল্ড গোলের, সম্ভব না হলে প্ল্যান বি অনুযায়ি পেনাল্টি কর্ণার আদাযের দিকে নজর থাকে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার সফল রূপ দেন আমিরুল।’
স্পষ্ট বাংলাদেশ মঙ্গলবার নামবে প্রেসিং কমিয়ে, রক্ষণ গুছিয়ে, দ্রুত পাল্টা আক্রমণের ছক সাজিয়ে। কারণ ফ্রান্সের মতো দলের বিরুদ্ধে ওপরে উঠে ঝাঁপিয়ে পড়া মানে নিজেদের অর্ধকে ফাঁকা রাখা। তেমন ভুল করলে অস্ট্রেলিয়া বা কোরিয়ার চেয়েও ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই প্রতিটি বল নিয়ে বাড়তি সতর্কতা, পেনাল্টি কর্নার ডিফেন্সে বাড়তি মনোযোগ আর গোলরক্ষকের নৈপুণ্য হবে ম্যাচের প্রধান চাবিকাঠি।
তবে এখানে বাংলাদেশের ইতিবাচক দিকও কম নয়। তাদের সাম্প্রতিক ছন্দ দুর্দান্ত। চিলি ও সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে আসা দলটি বিশ্বকাপেও দেখিয়েছে লড়াই করার অদম্য মানসিকতা। সবচেয়ে বড় কথা, অস্ট্রেলিয়া বা কোরিয়ার বিপক্ষে ৬ গোল করার পর এখন প্রতিপক্ষ জানে, বাংলাদেশকে অবহেলা করা যাবে না।
সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে উঠেছেন আমিরুল ইসলাম। বিশ্বকাপের প্রথম দুই ম্যাচেই হ্যাটট্রিক করার পর এখন পৃথিবীর প্রায় সব হকি স্কাউটের চোখ তার ওপর। কিন্তু হকি একক লড়াই নয়, এটি দলের খেলা। সেখানেই সামিনের নেতৃত্ব, ইসমাইল, রাকিব, জয়দের গতি এবং গোলরক্ষকের দৃঢ়তা এই ম্যাচে নির্ধারণ করবে লড়াই কতটা জমবে।
বাংলাদেশের ইতিবাচক দিক হলো তারা এখন আত্মবিশ্বাসী। গোলরক্ষকও চাপ সামলাতে শিখেছেন দ্রুত। তারা শিখেছেন এই খেলাটায় শেষ বাঁশি পর্যন্ত লড়াই করাই আসল অস্ত্র। তারা দেখেছেন ০-৩ পিছিয়েও ম্যাচ সমতায় আনা যায়। তারা বুঝেছেন দর্শক শুধু জয় নয়, লড়াই দেখতেও ভালোবাসে। নিজেদের সম্ভাবনার বিপক্ষে, নিজেদের সীমাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে নামতে হবে। বাংলাদেশ জানে এই দলটির বিপক্ষে ভালো খেললে বিশ্ব হকির কাছে এক নতুন পরিচয় তৈরি হবে। শুধুই ৬০ মিনিটের লড়াই নয়, এটি লাল-সবুজ স্বপ্নের ঝড় তোলার এক অগ্নিপরীক্ষা।
বাংলাদেশের প্রধান ডাচ কোচ সেইগফ্রেড আইকম্যান কোনভাবেই জয় কিংবা ড্র’র কথা বললেন না। শুধু বললেন, ‘ভালো খেলতে চাই। তাদের আক্রমণের বিপক্ষে টিকে থাকতে চাই। প্রয়োজনে কাউন্টার অ্যাটাকে কিছু একটা ঘটাতে হবে। তাদের তুলনায় আমরা সবদিক থেকে পিছিয়ে। আমিরুল যে কাজটি করেছেন তা সর্বজনবিদিত। তাই বলে সতীর্থদের কোনোভাবেই খাটো করা যাবে না। এটি দলীয় খেলা। সবার অবদানকে ভালো কিছুতে রুপ দিচ্ছে আমিরুল। ডি বক্সে তাদের আক্রমণগুলো সত্যিই প্রশংসনীয়। তারা দেশকে ভালো কিছু উপহার দিতে যাচ্ছেন।’
চেন্নাইয়ে গতকাল সারাদিন মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছে। হোটেল থেকে বের হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। ম্যানেজার এবং কোচের নির্দেশনা ছিল পুরোপুরি বিশ্রাম। পরপর দুই কঠিন ম্যাচ খেলার পর ছিল না কোনো জিম কিংবা স্ট্রেচিং। সোমবার সন্ধ্যার পর ম্যাচটি অর্ধেক খেলার পর জোরে বৃষ্টি নামলে খেলা বন্ধ হয়ে যায়। অনেকেই বলছেন, মঙ্গলবার যদি ফ্রান্স-বাংলাদেশ ম্যাচে অমন বৃষ্টি থাকে তাহলে বিশ্বমঞ্চে এক পয়েন্ট যোগ হবে। তবে বাংলাদেশ চাইছে খেলাটা হোক, অভিজ্ঞতা এক পয়েন্টের চেয়েও বেশি।