প্রাদুর্ভাবের পর থেকে হামে মৃত্যু ১৪৩
২৪ ঘণ্টায় ৯ শিশুর মৃত্যু
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে দেশে ১৪৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামে, তবে গত চারদিনেই মারা গেছে ৩০ শিশু। এ ছাড়া ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বললেও নিশ্চিতভাবে হামেই ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত ২৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ দিকে হাম সন্দেহে শিশুদের নিয়ে অভিভাবকদের হাসপাতালে আসাও অব্যাহত আছে।
শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সর্দি-কাশি, জ্বর হলেই হাম হয় না, হাম আক্রান্ত হলে সুনির্দিষ্ট লক্ষণ প্রকাশ পাবে। সর্দি-কাশি ও জ্বর উপসর্গগুলোর সাথে খেতে না পারা, খিুঁচনি হওয়া এবং শ্বাসকষ্ট হলেই হামে আক্রান্ত হতে পারে। এ ধরনের শিশুদের অব্যশই হাসপাতালে নিয়ে আসতে হবে চিকিৎসার জন্য। সাধারণত অপুষ্টির শিকার শিশুদেরই বেশি হামে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে যেসব শিশুর ভিটামিন- ‘এ’র ঘাটতি রয়েছে সেসব শিশুই হামে বেশি আক্রান্ত হয়।
স্বাস্থ্য অধিদফতর বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় (বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) দেশে এক হাজার ১৮৭ শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে বলে সন্দেহ করা হয়েছে তবে এদের মধ্যে ৬৪২ শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত দেশে ১২ হাজার ৩২০ শিশুকে হাম আক্রান্ত সন্দেহে হাসপাতালে আনা হয়। এর মধ্যে দুই হাজার ২৪১ জন আক্রান্ত বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। অন্য দিকে ১৫ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত মোট আট হাজার ২৫১ শিশুকে হাম সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
জাতীয় হার্ট ফাউন্ডেশনের শিশু আইসিইউ বিশেষজ্ঞ সহকারী অধ্যাপক ডা: মো: আবু তালহা বলেন, হামে আক্রান্ত শিশু যদি ভিটামিন ‘এ’ ঘাটতি থাকে তবে তার মৃত্যুঝুঁকি বেশি থাকে, শিশু অন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং অন্যান্য সংক্রমণ বেড়ে যেতে পারে। নিউমোনিয়া হয়ে শিশুকে আরো ঝুঁকিপুর্ণ করে দিতে পারে। সেজন্য হাম হয়েছে নিশ্চিত হলে শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্টারি খাওয়ানো উচিত। হামে আক্রান্ত শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ দেয়া যাবে শিশুর মধ্যে এ ভিটামিনটির ঘাটতি থাকুক আর না থাকুক।
শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো: মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুর জন্য ভিটামিন ‘এ’ জীবন রক্ষাকারী হিসেবে কাজ করে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ভিটামিন এ পর পর দুইদিন দিতে হবে এবং বেশি অপুষ্টির শিকার শিশুকে ২৪ দিন পর আবারো ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ানো যাবে। এ দিকে ঢাকা শিশু হাসপাতালে প্রচুর জ্বর, কাশি ও সর্দিতে আক্রান্ত রোগীই ভিড় দেখা যাচ্ছে কিছুদিন ধরে। শুধু রাজধানী থেকে নয়, ঢাকার বাইরে থেকেও এ হাসপাতালে শিশুদের নিয়ে আসছেন অভিভাবকরা। চিকিৎসকরা শিশুদের দেখে বেশির ভাগেরই হাম হয়নি বলে সাধারণ সর্দি-জ্বর, কাশির চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দিচ্ছেন। তবে হাম সন্দেহ হলে শিশুকে আইসোলেশনে রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
গতকাল সারা দেশে যে এক হাজার ১৮৭ জনকে হাম সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বরিশাল বিভাগে ৭৫, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৫৯, ঢাকা বিভাগে ৫০৪, খুলনা বিভাগে ৮৪, ময়মনসিংহ বিভাগে ২৯, রাজশাহী বিভাগে ২২৫, রংপুর বিভাগে ৬১ এবং সিলেট বিভাগে ৫০ শিশু রয়েছে।
রাজশাহী ব্যুরো জানায়, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৪ ঘণ্টায় আরো চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত হাম উপসর্গে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রামেক হাসপাতালে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ৫০ জনে। গতকাল বেলা ১১টায় রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা: শঙ্কর কুমার বিশ্বাস এ তথ্য।
তিনি বলেন, বুধবার (৮ এপ্রিল) সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সকাল ৮টা পর্যন্ত হাম উপসর্গে রামেক হাসপাতালে নতুন করে আরো চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে আরো ২৭ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এ ছাড়া ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছে ২৪ জন রোগী। বর্তমানে হাসপাতালটিতে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছে ১৩২ জন। এখন পর্যন্ত এই উপসর্গ নিয়ে রামেক হাসপাতালে মোট ভর্তি হয়েছে ৪৭৯ জন রোগী। এর মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোট ৫০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
বরিশাল ব্যুরো জানায়, বরিশালের শেরেবাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৪ ঘণ্টায় আরো দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে বরিশাল বিভাগে হাম রোগের উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ জনে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ মৃত দুই শিশুর মধ্যে বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার চরামদ্দি ইউনিয়নের পান্না খানের পাঁচ মাস বয়সী ছেলে ইমাম গত ৬ এপ্রিল হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। অপর দিকে, বরগুনার আমতলী উপজেলার বাসিন্দা আবু বক্করের ৯ মাস বয়সী ছেলে আবু সালেহ ৭ এপ্রিল একই উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়। এ নিয়ে শেবাচিম হাসপাতালে মোট তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালটিতে ৯১ জন হামে আক্রান্ত রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৩০ জন ভর্তি হয়েছেন এবং একই সময়ে ২৭ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
হাসপাতাল কর্তৃপ জানায়, এ পর্যন্ত শেবাচিম হাসপাতালে মোট ৩১০ জন হামের উপসর্গযুক্ত ও আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছেন।
ময়মনসিংহ অফিস জানায়, হামের উপসর্গ নিয়ে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে আরো দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে এ হাসপাতালে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯ জনে।
এ ছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরো ২৬ শিশু ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে মোট ৭৬ শিশু। গতকাল সকালে মমেক হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা: মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, গত ১৭ মার্চ নেত্রকোনা সদর থেকে আনা ৩ মাস বয়সী আদিবা নামে এক শিশুকে হামের লণ নিয়ে ভর্তি করা হয়। বুধবার সকাল ৮টার দিকে হামের উপসর্গের পাশাপাশি নিউমোনিয়া, তীব্র অপুষ্টি ও হৃদযন্ত্রের অকার্যকারিতায় শিশুটির মৃত্যু হয়।
অন্য দিকে গত ১৮ মার্চ ময়মনসিংহের ত্রিশাল থেকে ৮ মাস বয়সী আরেক শিশুকে ভর্তি করা হয়। বুধবার সে শিশুটিও সন্দেহভাজন হাম, জন্মগত হৃদরোগ, বৃদ্ধি ব্যর্থতা ও হৃদযন্ত্রের অকার্যকারিতায় মারা যায়। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত ১৭ মার্চ থেকে ৯ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৩২৪ শিশু ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ২৩৯ শিশু এবং ৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছে আরো ২৬ শিশু।
সিলেট ব্যুরো জানায়, সারা দেশের মতো সিলেটেও বাড়ছে হাম আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। সিলেট হামে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরো এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া শিশু আরিশার বয়স পাঁচ মাস ২১ দিন। সে সুনামগঞ্জের ছাতকের গোবিন্দগঞ্জের বাসিন্দা।
সিলেট বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ডা: মোহাম্মদ নূরে আলম শামীম জানান, শিশু আরিশা নিউমোনিয়া ও জ্বর নিয়ে ৬ এপ্রিল নগরীর শহীদ শামসুদ্দীন হাসপাতালে ভর্তি হয়। বুধবার তার অবস্থার অবনতি হওয়ায় ওসমানীর আইসিইউতে নেয়া হয়। সেখানেই রাতে তার মৃত্যু হয়। এ নিয়ে সিলেটে হামে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল দুইজনে।
বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদফতর সিলেট বিভাগীয় পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২ জনের শরীরে ল্যাব পরীায় হাম বা রুবেলা রোগ শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত সিলেট বিভাগে মোট ৩৯ জনের শরীরে হাম ও রুবেলা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে হবিগঞ্জে ৬ জন (২ জন রুবেলা), মৌলভীবাজারে ১২ জন, সুনামগঞ্জে ১১ জন এবং সিলেটে ১০ জন। এ দিকে গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগে নতুন করে আরো ৩৬ জন সন্দেহজনক রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ১৪ জন, মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ১০ জন, নর্থ ইস্ট হাসপাতালে ২ জন, জগন্নাথপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২ জন, জামালগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন, শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন, সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ২ জন ও হবিগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ৪ জন ভর্তি রয়েছেন। বর্তমানে বিভাগজুড়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ১০১ জন সন্দেহজনক রোগী চিকিৎসাধীন আছেন।
কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় কুমেক হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে ২৪ শিশু। হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান ডা: মিয়া মনজুর আহমেদ জানান বুধবার সকাল পর্যন্ত হামের নতুন রোগী ছিল ২৪ জন। গত ১৮ মার্চ থেকে হামে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে আসা ৭ জন শিশু চিকিৎসার জন্য ভর্তি হয়। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সকাল পর্যন্ত মোট হামে আক্রান্ত হয়ে ১৪৯ জন শিশু রোগী ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ৮০ জন শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। বর্তমানে ৬৬ জন শিশু রোগী আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত বা উপসর্গ নিয়ে কোনো শিশুর মৃত্যু হয়নি।