গাজায় ইসরাইলি হামলায় সাংবাদিকসহ নিহত ১১
Printed Edition
আলজাজিরা
ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভূখণ্ডটিতে শনিবার ইসরাইলি হামলায় এক পরিবারের চারজন ও এক সাংবাদিকসহ অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছে। যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ইসরাইল গাজায় একের পর এক হামলা চালিয়েই যাচ্ছে। ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস জানিয়েছে, ইসরাইল প্রতিদিন যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে।
হামাসের কর্তৃত্বাধীন উদ্ধারকারী পরিষেবা সিভিল ডিফেন্স এজেন্সি জানিয়েছে, গাজা সিটির সাব্রা এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে রাতে আকাশ হামলা চালায় ইসরাইলি বাহিনী, এতে আল-সাফাদি পরিবারের চার সদস্য নিহত হয়। নিহতরা স্বামী, স্ত্রী ও তাদের দুই মেয়ে। এই হামলায় আরো ১২ জন আহত হয়। গাজা সিটির আল-শিফা হাসপাতাল সাফাদি পরিবারের দুই শিশুসহ চার সদস্যের লাশ গ্রহণের কথা নিশ্চিত করেছে।
নিহতদের স্বজন নায়েল আল-সাফাদি বলেন, ‘(শনিবার) রাত প্রায় ২টার দিকে আমার চাচাতো ভাইয়ের পরিবার যখন ঘুমিয়ে ছিল তখন একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে।’ আল-শিফা হাসপাতাল জানিয়েছে, গাজার উত্তরাংশে একটি চৌরাস্তার কাছে ইসরাইলি ড্রোন হামলায় নিহত আরেক ফিলিস্তিনির লাশ তাদের এখানে আনা হয়েছে। শনিবার পরে ইসরাইলের বেশ কয়েকটি হামলায় ঘটনায় আরো ছয়জন নিহত হয়। এদের মধ্যে তিনজন নিহত হয় গাজার মধ্যাঞ্চলীয় বুরেইজ শরণার্থীশিবিরে ইসরাইলি বিমান হামলায়, জানিয়েছে সিভিল ডিফেন্স। নিহতদের মধ্যে আলজাজিরার স্থানীয় এক ফিলিস্তিনি সাংবাদিক রয়েছেন।
নিহত আহমদ উইশাহ চ্যানেলটির ফটো সাংবাদিক ছিলেন। তাদের সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ‘এ ধরনের অপরাধের ধারাবাহিকতা চলছে’ উল্লেখ করে এ হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে গণমাধ্যমটি। অপর দিকে উইশাহকে ‘হামাস সন্ত্রাসী’ বলে দাবি করেছে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী। তবে অন্য হত্যাকাণ্ডগুলোর বিষয়ে ইসরাইলি বাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। গত বছরের ১০ অক্টোবর গাজায় হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত এক হাজার ১২ জন ফিলিস্তিনি ইসরাইলি হামলায় নিহত হয়েছে। একই সময় ফিলিস্তিনিদের পাল্টা হামলায় তাদের পাঁচ সেনা নিহত হয়েছে বলে স্বীকার করেছে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ।
এক বিবৃতিতে আলজাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্ক এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে বলেছে, গাজায় ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি যুদ্ধের পর এ পর্যন্ত তাদের ১২ জন গণমাধ্যমকর্মী নিহত হয়েছেন। এই ভয়াবহ অপরাধের সাথে জড়িত ইসরাইলি কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও আইনি প্রতিষ্ঠানগুলোকে জরুরি ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
আহমদ উইশাহর ভাই মোহাম্মদ উইশাহ গত ৮ এপ্রিল নিজ গাড়িতে ভ্রমণের সময় ইসরাইলি গোলাবর্ষণে নিহত হন বলে ফিলিস্তিনি সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল। পরদিন ইসরাইলি সেনাবাহিনী কোনো প্রমাণ ছাড়াই দাবি করে, মোহাম্মদ উইশাহ হামাসের রকেট ও অস্ত্র উৎপাদন ইউনিটের একজন ‘গুরুত্বপূর্ণ সদস্য’ ছিলেন। সে কারণেই তাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল।
তখন আলজাজিরা তার হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে বলেছিল, এটি সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করা এবং সত্যের কণ্ঠরোধের একটি পদ্ধতিগত নীতির অংশ। শনিবার বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেয়া এক বক্তব্যে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্র একই ধরনের অভিযোগ এনে কোনো প্রমাণ ছাড়াই আহমদ উইশাহকে ‘হামাসের সদস্য’ বলে দাবি করেন। তবে আলজাজিরা ওই অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের ভাষ্য, গাজায় আলজাজিরার সাংবাদিক ও ক্যামেরাকর্মীদের বিরুদ্ধে অপরাধকে ন্যায্যতা দেয়ার জন্য ইসরাইলি সেনাবাহিনী ধারাবাহিকভাবে মিথ্যা অভিযোগ ছড়িয়ে আসছে।
সাংবাদিকদের অধিকারবিষয়ক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) এর আগেও নিহত ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের অপপ্রচারের সমালোচনা করেছে। সংগঠনটি বলেছে, তারা এমন একটি ধারাবাহিক প্রবণতা লক্ষ করেছে, যেখানে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ আনা হলেও তার পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয় না।
শনিবারের বিবৃতিতে আলজাজিরা জানিয়েছে, গাজায় তাদের কর্মীদের বিরুদ্ধে সংঘটিত এসব অপরাধের জন্য দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করতে তারা সবধরনের আইনি পদক্ষেপ নেবে। এ ছাড়া ইসরাইলি বাহিনীর ‘সত্যের কণ্ঠরোধের চেষ্টা’ সত্ত্বেও গাজার ঘটনা তুলে ধরার কাজ অব্যাহত রাখবে।
সিপিজের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর এ পর্যন্ত অন্তত ২৬০ জন ফিলিস্তিনি সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ৭৩ হাজার ১৮ জন নিহত এবং এক লাখ ৭৩ হাজার ২৭৩ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া গত অক্টোবর ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পরও ইসরাইলি হামলায় আরো এক হাজার সাতজন নিহত এবং তিন হাজার ১৬৫ জন আহত হয়েছেন বলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।