রেমিট্যান্সে স্বস্তি তবুও বাণিজ্য ঘাটতির চাপ
চলতি হিসাব ঘাটতি কমলেও আমদানি ব্যয় ও সেবা খাতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সতর্ক সঙ্কেত
Printed Edition
বিশেষ প্রতিবেদন
বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে দীর্ঘ অস্থিরতার পর অবশেষে কিছুটা স্বস্তির ইঙ্গিত মিলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ মাসিক ব্যালান্স অব পেমেন্টস (বিওপি) তথ্য বলছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে দেশের সামগ্রিক বহিঃখাত ভারসাম্যে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। শক্তিশালী রেমিট্যান্স-প্রবাহ, আর্থিক হিসাবের উদ্বৃত্ত এবং রিজার্ভ বৃদ্ধির ফলে ডলারের বাজারে চাপ আগের তুলনায় কমেছে। তবে একই সাথে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বাণিজ্য ঘাটতির প্রসার এবং সেবা খাতে ক্রমবর্ধমান ডলার বহিঃপ্রবাহ অর্থনীতির জন্য নতুন উদ্বেগও তৈরি করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের ১৩ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় তিন বিলিয়ন ডলারের চেয়েও বেশি। অর্থাৎ রফতানি আয় বাড়লেও আমদানির চাপ আরো দ্রুতগতিতে বেড়েছে। এই সময়ে রফতানি আয় হয়েছে ২৯ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার, বিপরীতে আমদানি ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪৬ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার। ফলে বাণিজ্য ভারসাম্যে নেতিবাচক চাপ অব্যাহত রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আমদানিতে বিশেষ করে শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি, ভোগ্যপণ্য এবং মূলধনী যন্ত্রপাতির ব্যয় বাড়ার প্রভাব এতে স্পষ্ট। একই সাথে তৈরি পোশাক খাতে রফতানি প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত গতিতে না হওয়ায় ঘাটতি কমেনি। তৈরি পোশাক থেকে আয় হয়েছে ২৬ দশমিক শূন্য ৯ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রফতানির বেশির ভাগ হলেও প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক স্থির রয়েছে। তবে বহিঃখাতের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো রেমিট্যান্স-প্রবাহের শক্তিশালী উল্লম্ফন। জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে প্রবাসী আয় এসেছে ২২ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২১ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। এই রেমিট্যান্স বৃদ্ধিই মূলত চলতি হিসাবের ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে প্রধান ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেকেন্ডারি ইনকাম বা স্থানান্তর আয় দাঁড়িয়েছে ২২.৮৪ বিলিয়ন ডলার, যার প্রায় পুরোটা এসেছে প্রবাসী কর্মীদের পাঠানো অর্থ থেকে। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, রেমিট্যান্স এখন দেশের বহিঃখাতের ‘শক অ্যাবজর্বার’ হিসেবে কাজ করছে। অনানুষ্ঠানিক হুন্ডি চ্যানেল কিছুটা কমে ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ আসা বেড়েছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে চলতি হিসাবের ঘাটতি কমে ১ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল প্রায় ১ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার। যদিও এটি এখনো ঘাটতি, তবে আগের তুলনায় পরিস্থিতির উন্নতি স্পষ্ট।
অন্য দিকে ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টে ৪ দশমিক শূন্য ৮ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত দেশের বহিঃখাতে বড় সহায়তা দিয়েছে। সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) এসেছে ৮৭১ মিলিয়ন ডলার, যা এখনো কাক্সিত মাত্রার নিচে। তবে বাণিজ্যিক ঋণ, স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ এবং ব্যাংকিং দায় বৃদ্ধি আর্থিক হিসাবকে ইতিবাচক রেখেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, সামগ্রিক হিসাবের উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার। এটি দেশের বহিঃখাত স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কারণ এই উদ্বৃত্তের ফলেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনে রিজার্ভ বাড়াতে সম হয়েছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মোট বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ বেড়ে ৩৫ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব অনুযায়ী রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার। আমদানি ব্যয়ের হিসাবে এই রিজার্ভ দিয়ে প্রায় ৫.৮ মাসের পণ্য আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। এটি গত দুই বছরের তুলনায় অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক অবস্থান। বিশেষ করে যখন কয়েক বছর ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে রিজার্ভ থেকে বিপুল পরিমাণ ডলার বিক্রি করতে হয়েছিল, তখন বর্তমান প্রবণতা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। তবে সব সূচক যে ইতিবাচক, তা নয়। সেবা খাতে ৩.৮৪ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি এবং প্রাইমারি ইনকামে ৩.০৯ বিলিয়ন ডলারের নেতিবাচক প্রবাহ উদ্বেগের কারণ। বিদেশী ঋণের সুদ পরিশোধ, মুনাফা প্রত্যাবাসন এবং পরিবহন-ইনস্যুরেন্স ব্যয় বাড়ায় এই খাতে ডলার বেরিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে সরকারি সুদ পরিশোধ ১.৪৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া ভবিষ্যতে বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়াতে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, আগামী বছরগুলোতে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ আরো বাড়বে, যা বহিঃখাতে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান উন্নতির পেছনে তিনটি বড় কারণ কাজ করছে- প্রথমত, রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহ; দ্বিতীয়ত, আমদানি নিয়ন্ত্রণে পূর্ববর্তী নীতিগত কড়াকড়ির প্রভাব; তৃতীয়ত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার বাজার ব্যবস্থাপনা। তবে তারা সতর্ক করছেন, শুধু রেমিট্যান্স-নির্ভর স্বস্তি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। রফতানি বহুমুখীকরণ, বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ঋণনির্ভর আমদানি কমাতে না পারলে বহিঃখাতের চাপ আবারো বাড়তে পারে। সবমিলিয়ে বাংলাদেশের বহিঃখাত এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় থাকলেও ভেতরে ভেতরে বাণিজ্য ঘাটতি ও বৈদেশিক দায়ের চাপ রয়ে গেছে। তাই সাময়িক স্বস্তির মধ্যেও নীতিনির্ধারকদের জন্য সতর্ক থাকার বার্তা স্পষ্ট।