জিতেও ঝুলে আছে ফলাফল
চট্টগ্রামের দুই বিএনপি নেতা এখন কী করবেন
Printed Edition
চট্টগ্রাম ব্যুরো
ভোটে জিতেও স্বস্তিতে নেই চট্টগ্রামের দুই হেভিওয়েট বিএনপি নেতা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হলেও চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) ও চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ডু ও নগরীর একাংশ) আসনের ফলাফল নিয়ে তৈরি হয়েছে আইনি জটিলতা। ঋণখেলাপির কারণে প্রার্থিতা চ্যালেঞ্জ হওয়ায় এই দুই আসনের বিজয়ী প্রার্থী সারোয়ার আলমগীর ও আসলাম চৌধুরীর সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেয়া এখন নির্ভর করছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের চূড়ান্ত রায়ের ওপর।
গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দুই আসনেই বিএনপির প্রার্থীরা বড় ব্যবধানে জয়লাভ করেন। কিন্তু আদালতের আদেশের কারণে নির্বাচন কমিশন এখনই তাদের নাম গেজেট আকারে প্রকাশ করতে পারবে না। ফলে নির্বাচনী মাঠে বিজয়ী হলেও আইনি লড়াইয়ে জিতেই সংসদে যেতে হবে তাদের।
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভোটাররা আইনি জটিলতা উপেক্ষা করেই ধানের শীষের প্রার্থীদের বেছে নিয়েছেন। চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আসলাম চৌধুরী পেয়েছেন এক লাখ ৪২ হাজার ৬৭৪ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর আনোয়ার সিদ্দিক চৌধুরী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন ৮৯ হাজার ২৬৮ ভোট। প্রায় ৫৩ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন আসলাম চৌধুরী।
চট্টগ্রাম-৪ আসনের জন্য জারি করা চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘আপিল বিভাগে দায়ের করা গত ৩ ফেব্রুয়ারির আদেশের আলোকে নির্বাচনী এলাকা ২৮১ চট্টগ্রাম-৪ আসনের প্রার্থী মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে যথারীতি অংশগ্রহণ করতে পারবেন। তবে আপিল বিভাগে দায়ের করা সিপিএলএ নং ৪৪১/২০২৬ চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী এর নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশ স্থগিত রাখার আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকায় মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরীর ফলাফল স্থগিত রাখার জন্য নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন।’
একই চিত্র চট্টগ্রাম-২ আসনেও। এখানে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সারোয়ার আলমগীর ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন এক লাখ ৩৮ হাজার ৫৪৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর নুরুল আমিন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন ৬২ হাজার ১৬০ ভোট। ভোটের ব্যবধান এখানেও প্রায় ৭৬ হাজার।
চট্টগ্রাম-২ আসনের জন্য জারি করা চিঠিতে ইসি বলছে, ‘আপিল বিভাগে দায়ের করা সিপিএলএ নং-৪৪০/২০২৬ এর ৩ ফেব্রুয়ারির আদেশের আলোকে নির্বাচনী এলাকা ২৭৯ চট্টগ্রাম-২ আসনের প্রার্থী সরোয়ার আলমগীর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে যথারীতি অংশগ্রহণ করতে পারবেন।
তবে আপিল বিভাগে দায়েরকৃত সিপিএলএ নং-৪৪০/২০২৬ চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সরোয়ার আলমগীরের নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশ স্থগিত রাখার আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকায় সরোয়ার আলমগীরের ফলাফল স্থগিত রাখার জন্য নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।’
ভোটের লড়াই শেষ হলেও এখন মূল লড়াই হবে আদালতে। ঋণখেলাপির অভিযোগ এনে এই দুই প্রার্থীর প্রার্থিতার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেছিলেন সংশ্লিষ্ট আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা। হাইকোর্ট তাদের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করলেও সেই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যান জামায়াতের প্রার্থীরা ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক।
জানা গেছে, গত ৩ ফেব্রুয়ারি প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের আপিল বিভাগ লিভ টু আপিল মঞ্জুর করেন। আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেন, আসলাম চৌধুরী ও সারোয়ার আলমগীর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন। তবে আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাদের ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করা যাবে না এবং ফলাফল স্থগিত থাকবে। আইনজীবীরা জানিয়েছেন, আপিল শুনানিতে যদি প্রমাণ হয় যে তারা ঋণখেলাপি নন এবং তাদের প্রার্থিতা বৈধ ছিল, কেবল তখনই নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করবে।
আর যদি রায় বিপক্ষে যায়, তবে আইনি প্রক্রিয়ায় পরবর্তী সিদ্ধান্ত আসবে। চট্টগ্রাম-৪ আসনের ক্ষেত্রে আসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে যমুনা ব্যাংকও পৃথকভাবে লিভ টু আপিল করেছে, যা বিষয়টিকে আরো জটিল করে তুলেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আইনি প্রক্রিয়ার কারণে এই দুই আসনের সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। বিপুল ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা কবে নাগাদ দায়িত্ব নিতে পারবেন বা আদৌ পারবেন কি না, তা নিয়ে চলছে নানা গুঞ্জন। তবে চূড়ান্ত ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত এই দুই আসন কার্যত প্রতিনিধিত্বহীন থাকার শঙ্কাই দেখছেন তারা।