রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

সনদ জালিয়াতির হোতা ৩ কর্মকর্তা এখনো বহাল

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের হয়ে কাজ করা ওই তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি

আব্দুল আউয়াল, রাজশাহী ব্যুরো

স্থান

রাজশাহী

Printed Edition
RMU

রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (রামেবি) জালসনদে চাকরি নেয়া, একাধিকবার পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্টে জালিয়াতি, আদালতের আদেশ উপেক্ষা করে বিধিবহির্ভূতভাবে নিয়োগ এবং নথি জালিয়াতিসহ ভয়ঙ্কর সব দুর্নীতিতে অভিযুক্ত তিন কর্মকর্তা এখনো বহাল তবিয়তে কাজ করে যাচ্ছেন। পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের হয়ে কাজ করা ওই তিন কর্মকর্তা দীর্ঘ দিন ধরে রামেবিতে কর্মরত থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

জানা গেছে, রামেবিতে জাল সনদে কর্মরত লিয়াজোঁ ও প্রটোকল অফিসার ইসমাইল হোসেন, আদালতের আদেশ উপেক্ষা করে বিধিবহির্ভূতভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত জামাল উদ্দিন মণ্ডল এবং নথি জালিয়াতির দায়ে অভিযুক্ত সহকারী রেজিস্ট্রার রাসেদুল ইসলামের অপসারণের দাবিতে রামেবির ভিসির কাছে লিখিত অভিযোগ দেন জুলাই বিপ্লবের নেতারা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন রাজশাহী মহানগর শাখার পক্ষ থেকে ভিসি বরাবর দেয়া ওই অভিযোগপত্রে স্বাক্ষর করেছেন নাজমুস সাকিব। এর অনুলিপি দুদক চেয়ারম্যান, ইউজিসি চেয়ারম্যান, ডিজিএফআই ও এনএসআইর ডিজি, পুলিশ কমিশনারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দফতরের প্রধানের নিকট পাঠানো হয়েছে।

নথিপত্র যাচাই করে দেখা গেছে, রামেবির তৎকালীন ভিসির সময় ইসমাইল হোসেন চাকরি নিয়েছিলেন স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির জাল সনদে। তার এই জালিয়াতির খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচার ও প্রকাশ পেলে তাকে বাঁচাতে তৎপর হন রামেবির তৎকালীন ভিসিসহ কিছু অসাধু কর্মকর্তা। এরই ধারাবাহিকতায় তার ব্যক্তিগত নথি থেকে স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির সনদ বদলে টাইমস ইউনিভার্সিটির জাল সনদ ঢুকিয়ে দেয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে- তৎকালীন ভিসি মোস্তাক হোসেনের ইন্ধনে ও সহকারী রেজিস্ট্রার রাসেদুল ইসলামের সহায়তায় জাল সনদ নথিতে সংযোজন করা হয়। এ ছাড়া ইসমাইল তার শিক্ষাগত যোগ্যতার একই স্মারকে পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্ট তৎকালীন সহকারী রেজিস্ট্রার রাসেদুল ইসলামের সহায়তায় একবার স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির তথ্য এবং আরেকবার টাইমস ইউনিভার্সিটির তথ্য দিয়ে দু’বার জাল করেন।

সূত্র মতে, এ ঘটনায় পরবর্তীতে রামেবির সিন্ডিকেট কর্তৃক বিএসএমএমইউর সাবেক ভিসি অধ্যাপক ডা: কনক কান্তি বড়–য়া, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের যুগ্ম সচিব মল্লিকা খাতুন এবং রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা: নওশাদ আলীর সমন্বয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি ইসমাইলকে অভিযুক্ত করে বিধি মোতাবেক সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদানের সুপারিশ করেন। এর পরই ইসমাইলের চাকরি টিকিয়ে রাখতে রামেবির সিন্ডিকেটে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়।

রামেবি সূত্র আরো জানায়, জামাল উদ্দীন মণ্ডল দুই বছর মেয়াদি একটি বিএ পাস কোর্স করে দারুল এহসান ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্সের সনদ নেন। এই ইউনিভার্সিটির বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের কোনো অনুমোদনই নেই। অনুমোদনহীন একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স পাসের সনদ নিয়ে রাজশাহী চারুকলা মহাবিদ্যালয় নামে একটি বেসরকারি কলেজে শারীরিক শিক্ষা বিষয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন তিনি। সেখান থেকে রামেবির প্রথম ভিসির সাথে সখ্যতার সুবাদে ২০১৮ সালে ৩৯ বছর বয়সে সেকশন অফিসার (৯ম গ্রেড) পদে অ্যাডহক ভিত্তিতে (অস্থায়ী) নিয়োগ পান তিনি। পরে মামলা তুলে নেয়ার শর্তে রামেবির তৎকালীন ভিসি সহযোগিতায় তিনি সেকশন অফিসার (স্থায়ী) পদে নিয়োগ পান। অথচ জামাল উদ্দীন মণ্ডল নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী সেকশন অফিসার (স্থায়ী) পদে আবেদনই করেননি।

এ দিকে গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তীকালে সময়ে রামেবির ভিসি অধ্যাপক ডা: এ জেড এম মোস্তাক হোসেন পদত্যাগ করেন। এরপর অধ্যাপক ডা: জাওয়াদুল হক ভিসি হিসেবে নিয়োগ পান। তিনি রামেবিতে যোগদানের প্রায় পাঁচ মাস হলো। কিন্তু অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় রামেবিতে ক্ষোভ ও সন্তোষ বিরাজ করছে।

নতুন ভিসি অধ্যাপক ডা: জাওয়াদুল হক বলেন, এখন পর্যন্ত তার কাছে কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। তবে প্রাথমিকভাবে তাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ নেয়া হবে।

তৎকালীন ভিসি ডা: এ জেড এম মোস্তাক হোসেনের সাথে মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে এর আগে তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, আমি ভিসি হিসেবে যোগদানের আগে ইসমাইল হোসেন নিয়োগ পান। এ ছাড়া তার সার্টিফিকেট তদন্তের বিষয়টিও আমার যোগদানের আগের ঘটনা। এ ঘটনার সাথে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।

ইসমাইল হোসেনের সাথে মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সেটটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তার বক্তব্যও নেয়া সম্ভব হয়নি। রামেবির সেকশন অফিসার জামাল উদ্দিন মণ্ডল বলেন, সংশ্লিষ্ট পদের বিপরীতে যথাযথ নিয়ম মেনেই তিনি আবেদন করেছিলেন। পরবর্তীতে কর্তৃপক্ষ তাকে যোগ্য বিবেচনা করেই নিয়োগ দিয়েছেন।