পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দিল্লি সফর সম্পর্কোন্নয়নে ভালো শুরু
অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন অগ্রাধিকার পায়নি
Printed Edition
কূটনৈতিক প্রতিবেদক
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের দিল্লি সফরে বাংলাদেশীদের জন্য ভারতীয় ভিসা, বিশেষ করে চিকিৎসা ও ব্যবসায়িক ভিসার প্রক্রিয়া সহজ করার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। ডিজেল ও সারের সরবরাহের পরিমাণ বাড়ানো ক্ষেত্রে ইতিবাচক সাড়া মিলেছে। এ ছাড়া ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শহীদ ওসমান হাদি হত্যা মামলার দুই আসামিকে প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে, যারা ইতঃপূর্বে ভারতে গ্রেফতার হয়েছিল।
তবে এই সফরে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু, গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়ন ও তিস্তা চুক্তি সইয়ের ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া ভারতের বিমানবন্দরগুলো ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে বাংলাদেশের পণ্য রফতানি বন্ধসহ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আরোপিত কয়েকটি বাণিজ্যবাধা দূর করার ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়নি। এমনকি বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েলের সাথে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক হওয়ার কথা শোনা গেলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি।
তবে সার্বিকভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের ১৮ মাসের টানাপড়েনকে পেছনে ফেলে ভারতের সাথে একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দিল্লি সফরকে ‘একটি ভালো শুরু’ হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, প্রতিবেশী দেশের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেশীর সাথে বৈরী সম্পর্ক নিয়ে বেশি দূর আগানো যাবে না। উচ্চপর্যায়ের সফর বিনিময়ের মধ্য দিয়ে দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা ও স্বার্থের ভিত্তিতে দ্বিপীয় সম্পর্কের ধারাবাহিক উন্নয়ন সম্ভব।
গত ৭ ও ৮ এপ্রিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দিল্লি সফরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসমন্ত্রী হরদীপ পুরীর সাথে বৈঠক করেছেন। এ ছাড়া ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সাথে নৈশভোজে যোগ দিয়েছেন। ৯ এপ্রিল ভারত মহাসাগর সম্মেলনে যোগ দিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিল্লি থেকে মরিশাসে রওনা হয়েছেন। মরিশাসের ফাইটে তার সাথে রয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ১০ থেকে ১২ এপ্রিল পোর্ট লুইসে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আগামী ২৩ থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশ লাগোয়া ভারতের এই রাজ্যের নির্বাচনকে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি এবং রাজ্যে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস খুবই গুরুত্বের সাথে নিয়েছে। বাংলাদেশের সাথে অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন চুক্তিতে রাজ্যের মতামত নেয়ার বাধ্যবাধকতা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের রয়েছে। এ কারণে ইস্যুটি হয়তো পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের পর গুরুত্বের সাথে আলোচনায় আসবে।
এ ব্যাপারে ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক একজন হাইকমিশনার নাম প্রকাশ না করার শর্তে গতকাল নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক নানাবিধ টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে। নির্বাচনের পর বাংলাদেশের নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ভারতের লোকসভার স্পিকার ও পররাষ্ট্র সচিব ঢাকা এসেছিলেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সপরিবারে ভারত সফরের জন্য দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির লেখা একটি চিঠি তুলে দেয়া হয়েছিল। এখন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দিল্লি সফরের মধ্য দিয়ে এই সম্পর্ককে একটি ইতিবাচক দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এটা একটা ভালো শুরু। দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বিনিময় হতে হবে। তবেই অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের ১৮ মাসের টানাপড়েনকে পেছনে ফেলে ভারতের সাথে একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব হবে। প্রতিবেশী দেশের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেশীর সাথে বৈরী সম্পর্ক নিয়ে বেশি দূর আগানো যাবে না।
অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনকে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার ইস্যু হিসেবে সামনে রাখা উচিত মন্তব্য করে তিনি বলেন, এখন থেকেই যৌথ নদী কমিশনের নিয়মিত বৈঠক শুরু করা প্রয়োজন। এরপর রাজনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা করতে হবে। গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হবে। এটা নবায়ন করতে হলে বেশকিছু কাজ করতে হবে। এই কাজগুলো শুরু করার এখনই সবচেয়ে ভালো সময়।
যৌথ নদীর পানিবণ্টন ইস্যুটি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এবারের সফরে অগ্রাধিকারে না আনার কারণ সম্পর্কে সাবেক এই হাইকমিশনার বলেন, বাংলাদেশ হয়তো সব ইস্যু একসাথে আনতে চায়নি। গাছের যে ফলগুলো আগে পেকেছে তা সংগ্রহ করে পরবর্তী সময়ে অন্যগুলোতে হাত দিতে চাচ্ছে।
বাংলাদেশ থেকে প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের সফরের সম্ভাবনা সম্পর্কে তিনি বলেন, শীর্ষপর্যায়ের সফর থেকে মানুষ সুনির্দিষ্ট ফলাফল আশা করে। গঙ্গাচুক্তি নিয়ে আলোচনা চূড়ান্ত হলে বা অন্যান্য ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি হলে প্রধানমন্ত্রীর সফর হতে পারে।