আলজাজিরার বিশ্লেষণে বাংলাদেশ নির্বাচন ২০২৬

বাংলাদেশের নির্বাচনে কে জিতল কে হারল, সামনে কী?

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় নির্বাচনেই বড় ধরনের রাজনৈতিক পালাবদল দেখল বাংলাদেশ। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি ঐতিহাসিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠনের পথে এগিয়েছে।

নির্বাচন কমিশন (ইসি) ঘোষিত সর্বশেষ ফল অনুযায়ী, ঘোষিত ২৯৭ আসনের মধ্যে বিএনপি পেয়েছে ২০৯টি আসন। একই সাথে দীর্ঘদিন নিষিদ্ধ থাকার পর নির্বাচনে অংশ নেয়া জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৬৮টি আসন, যা তাদের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফল। নবগঠিত ছাত্র নেতৃত্বাধীন এনসিপি পেয়েছে ছয়টি আসন।

অন্য দিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি; দলটির বিরুদ্ধে স্বৈরশাসন ও দমন-পীড়নের অভিযোগের পর তিনি ভারতে অবস্থান করছেন।

কে জিতল?

আসন বণ্টনের চিত্র : বিএনপি : ২০৯; জামায়াত : ৬৮; এনসিপি : ৬; অন্যান্য দল : ৭; স্বতন্ত্র : ৭

বিএনপি ইতোমধ্যে সরকার গঠনের দাবি জানিয়েছে। দলটি বিজয় উদযাপনে সমাবেশ না করে সারা দেশে দোয়া ও প্রার্থনার আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে। দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফেরা তারেক রহমানই সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিবেচিত।

ভোটগ্রহণ ও পরিবেশ

ইসি জানিয়েছে, ভোটার উপস্থিতি ছিল ৫৯.৮৮%, যা সাম্প্রতিক দশকগুলোর মধ্যে অন্যতম শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দেশজুড়ে সহিংসতা তুলনামূলক কম ছিল এবং পর্যবেক্ষকরা ভোটের দিনকে ‘সুশৃঙ্খল’ বলেছেন।

ফল নিয়ে প্রশ্ন আছে?

তবে বিতর্ক পুরোপুরি থামেনি। এনসিপি ও বিএনপি- উভয়েই কিছু কেন্দ্রে অনিয়ম ও ফল প্রভাবিত করার অভিযোগ তুলেছে।

জামায়াত এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘ফল ঘোষণায় অসামঞ্জস্য, প্রশাসনের পক্ষপাত ও টার্নআউট প্রকাশে বিলম্ব- এসবই প্রশ্ন তৈরি করছে।’

এখনো চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ বাকি।

কারা জিতলেন, কারা হারলেন?

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান : ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬

জামায়াত আমির ডা: শফিকুর রহমান : ঢাকা-১৫

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর : ঠাকুরগাঁও-১

এনসিপি প্রতিষ্ঠাতা নাহিদ ইসলাম : ঢাকা-১১

ঢাকার ২০টি আসনের মধ্যে বিএনপি পেয়েছে ১৩টি, জামায়াত ছয়টি, এনসিপি একটি।

বিএনপির জয় কি প্রত্যাশিত ছিল? বিশ্লেষকদের মতে, ফলাফল মোটামুটি প্রত্যাশিত।

২০২৫ সালজুড়ে দ্রব্যমূল্য, বেকারত্ব ও অন্তর্বর্তী সরকারের বিলম্বিত সংস্কার নিয়ে বিএনপি ধারাবাহিক আন্দোলন করে জনমত গড়ে তোলে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন- দেশজুড়ে সংগঠন, অভিজ্ঞ নেতৃত্ব এবং সরকার পরিচালনার অতীত অভিজ্ঞতা- এই তিন শক্তির সমন্বয় বিএনপিকে এগিয়ে দিয়েছে।

জুলাই চার্টার গণভোটে কী হলো?

নির্বাচনের পাশাপাশি ভোট হয়েছে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ নিয়ে গণভোটে।

ফলাফল : পক্ষে : ৬০.২৬% ও বিপক্ষে : ৩৯.৭৪%।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উদ্যোগে প্রণীত এই সনদে রয়েছে-

প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা; নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি; বিচার বিভাগের স্বাধীনতা; মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ; ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব; তবে উচ্চকক্ষ গঠনের পদ্ধতি নিয়ে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

সামনে কী?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে- সুশাসন নিশ্চিত করা; আইনশৃঙ্খলা পুনর্গঠন; সংস্কার বাস্তবায়ন; ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা পূরণ।

ঢাকার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আওয়ামী লীগবিহীন এই সংসদে বহুমাত্রিক রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর থাকায় সংসদীয় কার্যক্রম আরো প্রতিযোগিতামূলক ও কার্যকর হতে পারে। সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা- যেখানে ক্ষমতার পালাবদল যেমন হয়েছে, তেমনি রাষ্ট্রীয় সংস্কারের পথও এখন পরীক্ষার মুখে।