রাজস্ব আটকে রেখে ফিলিস্তিনিদের শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে ইসরাইল
রাফাহ সীমান্তে ফিলিস্তিনিদের তল্লাশিতে অংশ নিচ্ছে আবু শাবাব মিলিশিয়া
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
দখলকৃত পশ্চিম তীরের নাবলুস শহরের জেনাবিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় বহু বছর ধরে শিশুদের জন্য শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করে আসছে। কিন্তু ইসরাইল দীর্ঘ দিন ধরে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রাপ্য কর রাজস্ব আটকে রাখায় এখন পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আয়েশা আল-খাতিব বলেন, সপ্তাহের বেশিরভাগ দিন স্কুল বন্ধ থাকে, শিশুরা রাস্তায় ঘোরে বা ঘরে বসে থাকে। বইপত্রের অভাব এতটাই যে নিয়মিত পাঠ্যবই এখন কেবল ‘পাতার গুচ্ছ’ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘শিশুদের শিক্ষাকে ধ্বংস করা মানে জাতিকে ধ্বংস করা।’ ইসরাইলি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচের নির্দেশে গত দুই বছরে বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আটকে রাখা হয়েছে। এর ফলে সরকারি কর্মচারী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও পুলিশদের বেতন কমে গেছে। সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে শিক্ষা খাতে।
পশ্চিম তীরের সরকারি স্কুলগুলো সপ্তাহে সর্বোচ্চ তিন দিন খোলা থাকে। শিক্ষকরা মাসের পর মাস বেতন পান না, আর পেলেও আগের তুলনায় মাত্র ৬০ শতাংশ। এর ফলে ধর্মঘটও হচ্ছে। ক্লাসের সময় এত কমে গেছে যে শিক্ষকরা শুধু গণিত, আরবি ও ইংরেজি পড়ান। বিজ্ঞানসহ অন্যান্য বিষয় প্রায় বাদ পড়েছে। শিক্ষকেরা সতর্ক করেছেন, এতে একটি প্রজন্ম স্থায়ীভাবে শিক্ষাগত ঘাটতিতে পড়বে।
শিক্ষার্থীদের সঙ্কট
১০ বছরের ছাত্র জায়েদ হাসেনেহ ইংরেজি শেখার জন্য গুগল ট্রান্সলেট ব্যবহার করে। তার স্বপ্ন যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করে ডাক্তার হওয়া। তার মা ইমান বলেন, ‘আমি চাই আমার ছেলে শুধু মুখস্থ না করে সমৃদ্ধ হোক।’ ইমানের স্বামী আগে তেল আবিবে মেকানিক হিসেবে কাজ করতেন। কিন্তু ২০২৩ সালে গাজার যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইসরাইল তার কাজের অনুমতি বাতিল করে দেয়। পশ্চিম তীরের প্রায় এক লাখ ৫০ হাজার ফিলিস্তিনি কাজ হারান। এখন ইমানই পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী, তিনি হালাওয়া কারখানায় কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরি, কিন্তু ছেলেকে পড়াশোনায় সাহায্য করতে হয়। আমি তাকে বলি, জীবনে সবচেয়ে জরুরি হলো পড়াশোনা।’ কিন্তু তিনি স্বীকার করেন, শিক্ষকের মতো করে ব্যাখ্যা করতে পারেন না। এখন স্কুলে দেয়া বইও অসম্পূর্ণ- ১৩০ পৃষ্ঠার বই হয়ে গেছে মাত্র ৪০-৫০ পৃষ্ঠার। অভিভাবকরা বলছেন, স্কুলের অনিয়মিত সময়সূচি পুরো পরিবারের জীবনযাত্রা ব্যাহত করছে। জায়েদও অনেক সময় পড়াশোনার বদলে রাস্তায় সময় কাটাচ্ছে বা মোবাইল গেম খেলছে। সামগ্রিকভাবে, ইসরাইলের রাজস্ব আটকে রাখার নীতি ফিলিস্তিনিদের শিক্ষা অধিকারকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং একটি প্রজন্মকে অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
রাফাহ সীমান্তে ফিলিস্তিনিদের তল্লাশিতে অংশ নিচ্ছে আবু শাবাব মিলিশিয়া
ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ গাজা ও মিসরের মধ্যবর্তী রাফাহ সীমান্তে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় ফিলিস্তিনিদের তল্লাশিতে আবু শাবাব মিলিশিয়ার সদস্যদের অংশগ্রহণের অনুমতি দিয়েছে। বুধবার রাতে ইসরাইলি সরকারি সম্প্রচার মাধ্যম কান টিভি এ তথ্য জানিয়েছে। মিলিশিয়াটি স্থায়ীভাবে এ দায়িত্ব নিতে চায়। গাজার সীমান্তে তোলা এক ছবিতে দেখা গেছে, আবু শাবাব মিলিশিয়ার নেতা ঘাসান আল-দাহিনি তার কয়েকজন সদস্যের সাথে উপস্থিত ছিলেন। মিলিশিয়াটি সীমান্ত এলাকায় ইসরাইলের অনুমোদনেই কার্যক্রম চালাচ্ছে। এমনকি সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের শরীর তল্লাশি করার অনুমতিও তাদের দেয়া হতে পারে বলে জানিয়েছে মিডল ইস্ট মনিটর। ইসরাইলি সংবাদপত্র ইয়েদিওথ আহরোনোথ জানিয়েছে, ইসরাইল গোপনে গাজায় কিছু সশস্ত্র মিলিশিয়াকে অর্থ, অস্ত্র ও সুরক্ষা দিয়ে সহায়তা করছে, যাতে তারা হামাসের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যায়। এসব মিলিশিয়া ইসরাইলি সেনাদের উপস্থিত এলাকায় সীমিত অভিযান চালায়, যেমন ধাওয়া, গ্রেফতার ও হামাস যোদ্ধাদের খোঁজ।
২০২৫ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিশ্চিত করেছিলেন যে গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য মিলিশিয়াদের অস্ত্র দেয়া হয়েছে। গত ডিসেম্বর ইসরাইলি গণমাধ্যমে খবর আসে, আবু শাবাব মিলিশিয়ার সাবেক নেতা ইয়াসের আবু শাবাব গাজায় গোত্রীয় সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন। তার গোত্র তারাবিন এ মৃত্যুকে ‘লজ্জাজনক অধ্যায়ের সমাপ্তি’ হিসেবে বর্ণনা করে। ২০২৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ইসরাইল রাফাহ সীমান্তের ফিলিস্তিনি অংশ সীমিতভাবে পুনরায় খুলে দেয়। তবে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপে সীমান্ত খোলার কথা থাকলেও ইসরাইল তা বিলম্বিত করেছিল। এই পদক্ষেপে ইসরাইলের গোপন কৌশল ও গাজায় হামাসবিরোধী কার্যক্রমে মিলিশিয়াদের ব্যবহার আবারো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ফিলিস্তিনে গণহত্যা নিয়ে নীরব পশ্চিমা দেশগুলোর সমালোচনা
জাতিসঙ্ঘের ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি ফ্রান্সেসকা আলবানিজ পদত্যাগের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনকারী এবং ফিলিস্তিনে গণহত্যা নিন্দা না করা দেশগুলোর কাছ থেকে তিনি কোনো শিক্ষা নেবেন না। বুধবার ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাঁ-নোয়েল বারো গাজা বিষয়ক এক সম্মেলনে ইসরাইলকে লক্ষ্য করে দেয়া মন্তব্যের কারণে আলবানিজের পদত্যাগ দাবি করেছিলেন। খবর মিডল ইস্ট মনিটরের। সাক্ষাৎকারে আলবানিজ বলেন, পশ্চিমা সরকারগুলোর উচিত তার ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ না করে বরং ইসরাইলি অপরাধ নিয়ে জমা দেয়া তার প্রতিবেদনগুলো নিয়ে আলোচনা করা। তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে প্রচারণা ফিলিস্তিনিদের গণহত্যার তুলনায় কিছুই নয়।’ তিনি বলেন, ইসরাইলের গাজা ও পশ্চিম তীরে গণহত্যার নিন্দা করায় তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, তিনি তার দায়িত্বের সীমা অতিক্রম করেননি। বরং সমালোচনার তীব্রতা তার কাজের প্রভাবকেই প্রমাণ করে।
আলবানিজ জানান, তিনি কোনো বেতন পান না এবং ব্যক্তিগত চাপ ও নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছেন। তবে গাজার মায়েদের কষ্ট থেকে তিনি শক্তি পান এবং ন্যায়বিচারের জন্য অন্যদের অনুপ্রাণিত করতে চান। তিনি আরো বলেন, ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্য প্রমাণ করে যে ইসরাইলকে বিশেষ সুরক্ষা দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, বারো ইসরাইলি অপরাধ নিন্দা না করে বরং তাকে আক্রমণ করেছেন। এইভাবে জাতিসঙ্ঘ কর্মকর্তা স্পষ্ট করেছেন, তিনি পদত্যাগ করবেন না এবং ফিলিস্তিনে গণহত্যা নিন্দায় নীরব থাকা রাষ্ট্রগুলোকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন।
রমজানে আল-আকসায় প্রবেশে নতুন বিধিনিষেধ আনছে ইসরাইল
ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ আসন্ন রমজান মাসে মুসলমানদের আল-আকসা মসজিদে প্রবেশে সীমাবদ্ধতা আরোপের পরিকল্পনা করেছে। দখলকৃত পূর্ব জেরুসালেমের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি ও ইসলামিক কাউন্সিলের প্রধান শেখ একরিমা সাবরি এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, জানুয়ারিতে নতুন পুলিশ কমান্ডার নিয়োগের মাধ্যমে ইসরাইলি প্রশাসনের উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের পরিকল্পনা অনুযায়ী আল-আকসায় প্রবেশ আরো কঠোর করা হচ্ছে। খবর টিআরটি ওয়ার্ল্ড।
শেখ সাবরি জানান, ইতোমধ্যেই বহু তরুণকে মসজিদে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। পশ্চিম তীর থেকে আগত মুসল্লিদের জন্যও কোনো ছাড় দেয়া হবে না। ফলে এবারের রমজানে আল-আকসায় মুসল্লির সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় কম হবে। তিনি বলেন, এটি ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিপন্থী। রমজানে সাধারণত পশ্চিম তীর থেকে লাখো ফিলিস্তিনি আল-আকসায় নামাজ পড়তে আসেন। কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে চেকপোস্টে নিয়ন্ত্রণ আরো কঠোর করা হয়েছে। গত দুই বছরে খুব অল্প সংখ্যক মানুষই সেনাদের দেয়া অনুমতি পেয়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ শত শত তরুণকে রমজান মাসে আল-আকসায় প্রবেশে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। কিছু নিষেধাজ্ঞা ছয় মাস পর্যন্ত বহাল থাকবে।
গাজা নীতি নিয়ে নেতানিয়াহুর ব্যাখ্যা বিশ্বাস করে না অধিকাংশ ইসরাইলি
টাইমস অব ইসরাইলের হিব্রু সংস্করণ জমান ইসরাইল এর করা এক জরিপে দেখা গেছে, ইসরাইলের অর্ধেকের বেশি নাগরিক প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর গাজা নীতি সম্পর্কিত ব্যাখ্যা বিশ্বাস করেন না। টাইমস অফ ইসরাইলের খবরে একথা জানা যায়।
জরিপে প্রশ্ন করা হয়েছিল নেতানিয়াহুর ৫৫ পৃষ্ঠার নথি নিয়ে, যেখানে তিনি হামাসের ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার আগে সরকারের অভ্যন্তরীণ আলোচনার নির্বাচিত অংশ তুলে ধরেন। ওই নথিতে নেতানিয়াহু দাবি করেন, তিনি হামাসের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ চেয়েছিলেন, কিন্তু নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বিরোধিতা করেছিলেন। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই নথিতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ দেয়া হয়েছে। যেমন হামলার কয়েক দিন আগে নেতানিয়াহু গাজা সীমান্তে শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানান এবং পূর্ববর্তী বছরগুলোতে হামাসের আক্রমণ পরিকল্পনা সম্পর্কিত গোয়েন্দা তথ্যও তিনি পেয়েছিলেন। এ ছাড়া তার ব্যাখ্যা আগের প্রকাশ্য বক্তব্যের সাথে সাংঘর্ষিক, যেখানে তিনি গাজায় বড় ধরনের অভিযান না চালানোর সিদ্ধান্তের দায়িত্ব নিজেই নিয়েছিলেন।
জরিপে ৫১ শতাংশ ইসরাইলি বলেছেন তারা নেতানিয়াহুর ব্যাখ্যা বিশ্বাস করেন না, ৩৯ শতাংশ বলেছেন তারা বিশ্বাস করেন, আর ১০ শতাংশ বলেছেন তারা জানেন না। চ্যানেল ১২ এর আরেকটি জরিপে অংশগ্রহণকারীদের জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, বিরোধীদের দাবি অনুযায়ী নথিটি কি নির্বাচিতভাবে সম্পাদনা করা হয়েছে এবং প্রকৃত নীতি প্রতিফলিত করে না। এই জরিপগুলো নেতানিয়াহুর গাজা নীতি নিয়ে ইসরাইলি জনমনে গভীর সন্দেহ ও বিভাজনকে স্পষ্ট করেছে।