বগুড়ায় ফলাফল শিটে আগাম সই, এজেন্ট বের করে দেয়ার মধ্য দিয়ে ভোটগ্রহণ

Printed Edition

বগুড়া অফিস

নানা অনিয়মের মধ্য দিয়ে গতকাল বগুড়া-৬ সদর আসনের উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে। এদিন সকাল থেকেই বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোটারদের নগণ্য উপস্থিতি ল করা গেলেও ভেতরের প্রশাসনিক কার্যক্রমে নানা অসঙ্গতি ও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন জামায়াতের প্রার্থী। বিশেষ করে শহরের মাতলি নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ফলাফল সিটে আগেভাগে সই করিয়ে নেয়ার ঘটনাটি নির্বাচনী এলাকায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রার্থী, ভোটার এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উত্তেজনা ও ােভের সঞ্চার হয়। নির্বাচনী মাঠের বাইরে পরিস্থিতি বাহ্যিকভাবে স্বাভাবিক এবং শান্ত মনে হলেও ভোটকেন্দ্রের ভেতরে প্রিজাইডিং কর্মকর্তার এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও নিরপেতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।

সেখানে এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াত প্রার্থী আবিদুর রহমান সোহেল অভিযোগ করেন যে, ওই কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিজাইডিং কর্মকর্তা পোলিং এজেন্টদের কাছ থেকে ফলাফল সিট অর্থাৎ ফরম ১৬-তে আগাম সই নেন। নির্বাচনের নিয়ম অনুযায়ী, ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর গণনার ভিত্তিতে এই ফরম পূরণ করে সই নেয়ার কথা থাকলেও তা সকালেই সম্পন্নের চেষ্টা করা হয়। অভিযুক্ত কর্মকর্তা নূর ইসলাম সরকারি আজিজুল হক কলেজের রসায়ন বিভাগের শিক। তিনি এই কাজের পেছনে অদ্ভুত এক যুক্তি দেখান। শুরুতে তিনি দাবি করেন, কাজের চাপ কমাতে এবং সময় সাশ্রয়ে আগেভাগে সই নিয়ে রেখেছিলেন। তবে বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর এবং ম্যাজিস্ট্রেট ও সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতিতে তিনি নিজের ভুল স্বীকার করেন। তিনি মেনে নেন, ফলাফল নির্ধারণের আগেই সিটে সই নেয়া দণ্ডনীয় অপরাধ এবং এটি নির্বাচনী আইন ও বিধিমালার পরিপন্থী।

পরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাসওয়ার তানজামুল হক বিতর্কিত সেই ফরম ১৬ জব্দ করেন এবং উপস্থিত সবার সামনে ছিঁড়ে ফেলেন। পরে বিষয়টি জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নজরে আনা হয় জামায়াতের প থেকে। জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান এ বিষয়ে তার অবস্থান পরিষ্কার করে জানিয়েছেন যে, প্রিজাইডিং কর্মকর্তার এই বিতর্কিত আচরণের বিস্তারিত বিবরণ ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশনে জানানো হয়েছে। কমিশন থেকে প্রাপ্ত নির্দেশনা অনুযায়ী ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এ দিকে নির্বাচনের অনিয়ম ছাপিয়ে আরেকটি বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ভোটারদের অনীহা। উপনির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল কম। প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, সকাল ১০টা পর্যন্ত গড়ে মাত্র ৬ থেকে ৭ শতাংশ ভোট কাস্ট হয়েছে।

সদরের ফাপোর, নামুজা, নুনগোলা, গোকুলসহ বিভিন্ন ভোট কেন্দ্র ঘুরে গড়ে ৩০ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি মনে হয়েছে। বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত পোষ্টাল ব্যালট ছাড়া ভোটগ্রহণ ৪২ দশমিক ৪৯ ভাগ বলে জানিয়েছে রিটার্নিং অফিসার।

বিকেলে দলীয় অফিসে এক সাংবাদিক সম্মেলনে জামায়াত প্রার্থী আবিদুর রহমান অভিযোগ করেন, বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে আমার এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে, কর্মীদের হুমকি দেয়া হয়েছে। ভোটার উপস্থিতি কম হলেও তা অতিরিক্ত দেখিয়ে ফল জালিয়াতির চেষ্টা চলছে। ডিসি-এসপি সহযোগিতা করলেও রিটার্নিং অফিসারের কারণে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে বিএনপিপ্রার্থীকে জিতিয়ে দেয়ার আশঙ্কা করছি। বিকেলে শহরের নূরানী মোড়ে একজনকে চাকু মারা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য শাহাবুদ্দিন বলেন, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হয় না আরেকটি প্রমাণ। কিন্তু এভাবে নির্বাচন না করলে বিএনপির কোনো ক্ষতি হতো না। এতে সরকারের কলঙ্ক লেগে গেল।

নিকৃষ্টতম ভোট জালিয়াতি হয়েছে : জামায়াত প্রার্থী

বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে নিকৃষ্টতম ভোট জালিয়াতি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী আবিদুর রহমান সোহেল। ভোটগ্রহণ শেষে তিনি এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেন, ‘বগুড়া-৬ সদর আসনের উপনির্বাচনে সরকারি দল বিএনপি কেন্দ্র দখল, প্রিজাইডিং অফিসার কর্তৃক আগাম রেজাল্ট শিট স্বার, মহিলা পোলিং এজেন্টদের হুমকি প্রদান, পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্র হতে বহিষ্কার, নির্বাচন কেন্দ্রের সামনে সকাল থেকে মিছিল এবং পর্যায়ক্রমে ভোট কেন্দ্র থেকে বিরোধীদল বিতাড়ন করে বেলা ২টার পর থেকে নির্বিঘেœ জাল ভোট প্রদানের মাধ্যমে ইতিহাসের নিকৃষ্টতম ভোট জালিয়াতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। প্রকৃতপে সরকারি দল বিএনপি এবং তাদের অনুগ্রহ প্রার্থী রিটার্নিং অফিসার এই উপনির্বাচনকে সর্বময় একটি প্রহসনের নির্বাচনে পরিণত করেছে।’ তিনি বলেন, ‘ফলাফল ঘোষণা একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। আমরা এ নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত থাকার একটিই কারণ তা হলো- বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রে বিশ্বাসী এবং বর্তমানের বিএনপি যে বিরোধী দলের স্বাধীন মতামতের অধিকারে বিশ্বাস করে না তা জাতির সামনে তুলে ধরা। মূলত দিনব্যাপী বিভিন্ন গণমাধ্যমে বগুড়ার উপনির্বাচনে ভোট জালিয়াতির যে দৃশ্য বগুড়াবাসী তথা দেশবাসী প্রত্য করেছে তাতে এ কথা প্রমাণ হয়েছে যে, সরকারি দলের তত্ত্বাবধানে কোনো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।’