জরিপের ফল : যুদ্ধের পর ইরানকে বিজয়ী মনে করেন ৯২% ইসরাইলি
ইসরাইলকে একঘরে করতে ইরানের নতুন কৌশল
Printed Edition
টাইমস অব ইসরাইল ও আলজাজিরা
ইরানের সাথে সাম্প্রতিক যুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া সমঝোতা নিয়ে ইসরাইলিদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা গেছে। নতুন এক জরিপে দেখা গেছে, বিপুলসংখ্যক ইসরাইলি মনে করেন এই সঙ্ঘাতের পর শেষ পর্যন্ত ইরানই বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
হিব্রু ইউনিভার্সিটির সহযোগিতায় পরিচালিত এক জনমত জরিপ অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারীদের ৯২ দশমিক ১ শতাংশের বিশ্বাস, যুদ্ধ ও চুক্তির পরিণতিতে ইরানই লাভবান হয়েছে। একই সাথে ৮৬ শতাংশ উত্তরদাতা যুদ্ধের ফলাফল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। জরিপে আরো দেখা যায়, ৮২ দশমিক ৯ শতাংশ ইসরাইলির মতে, এই সামরিক অভিযান দীর্ঘমেয়াদে ইসরাইলের নিরাপত্তাকে দুর্বল করেছে। অন্য দিকে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু যে দাবি করেছেন- ইসরাইল উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে এবং দেশের অস্তিত্বের জন্য হুমকি দূর করতে সক্ষম হয়েছে, তা বিশ্বাস করেন না ৭২ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা। এ ছাড়া ৮৭ দশমিক ৮ শতাংশ অংশগ্রহণকারী মনে করেন, ইসরাইল যুদ্ধের ঘোষিত লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে অথবা কেবল আংশিকভাবে সফল হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব ও যুদ্ধ পরিচালনা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অনেকেই। জরিপে অংশ নেয়া ৫৬ দশমিক ৪ শতাংশ ইসরাইলি বলেছেন, সঙ্ঘাত মোকাবেলায় নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব দুর্বল ছিল অথবা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
তবে নিরাপত্তা ইস্যুতে কঠোর অবস্থানের পক্ষেও উল্লেখযোগ্য সমর্থন রয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ ইসরাইলি লেবাননভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। এমনকি এ ধরনের পদক্ষেপের কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে উত্তেজনা সৃষ্টি হলেও তারা তা সমর্থন করবেন বলে জানিয়েছেন।
গত ১৭ থেকে ২০ জুন পর্যন্ত এই জরিপ পরিচালনা করে আগাম ইনস্টিটিউট ও হিব্রু ইউনিভার্সিটি। এতে ১৭ বছর বা তার বেশি বয়সী তিন হাজার ৬৪৪ জন ইসরাইলি অংশ নেন। গবেষকদের দাবি, জনসংখ্যার অনুপাত অনুযায়ী নমুনা নির্বাচন করা হয়েছে এবং জরিপটির সর্বোচ্চ ত্রুটির হার ৯৯ শতাংশ আস্থার পর্যায়ে ২ দশমিক ২ শতাংশ। জরিপের ফলাফল ইঙ্গিত করছে, ইরানের সাথে সাম্প্রতিক সঙ্ঘাতের পর যুদ্ধের ফলাফল, জাতীয় নিরাপত্তা এবং সরকারের কৌশল নিয়ে ইসরাইলি জনমতের মধ্যে গভীর অসন্তোষ ও বিভাজন তৈরি হয়েছে।
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরাইলের চলমান হামলাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে তেহরান মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের মধ্যকার দীর্ঘদিনের অবিচ্ছেদ্য জোটে ফাটল ধরানোর চেষ্টা করছে।
এই দুই পরম মিত্র দেশের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করতে ইরান লেবানন পরিস্থিতিকে একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক উলফগ্যাং পুশতাই আলজাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরান বর্তমানে লেবাননকে একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে যাতে ইসরাইলের বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরকার এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যকার ফাটলকে আরো চওড়া করা যায়।
আপাতদৃষ্টিতে তেহরানের উদ্দেশ্য দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি আগ্রাসন বন্ধ করা বলে মনে হলেও, বাস্তবতা ভিন্ন। তেহরান, বৈরুত, হিজবুল্লাহ এবং খোদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও জানেন যে, ইসরাইলি আক্রমণ পুরোপুরি বন্ধ করা এই মুহূর্তে খুব একটা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ নিজেদের ওপর আঘাত এলে ইসরাইল অবশ্যই তার পাল্টা জবাব দেবে।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও যুদ্ধবিরতির উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত না করতে ইসরাইলিরা সাময়িকভাবে কিছুটা শান্ত থাকতে পারে। তবে যেকোনো উসকানি বা হামলার মুখে তারা নিজেদের সুরক্ষায় প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করবে না। এই জটিল পরিস্থিতিকে ওয়াশিংটন এবং তেলআবিবের মধ্যকার সম্পর্ককে দুর্বল করার একটি বিশাল সুযোগ হিসেবে দেখছে ইরান। এই মুহূর্তে তেহরানের প্রধান লক্ষ্য হলো এই দুই দেশের দীর্ঘদিনের সামরিক ও রাজনৈতিক জোটে চির ধরানো, এবং এই উদ্দেশ্যেই তারা তাদের বর্তমান কৌশলগুলো পরিচালনা করছে।