গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ

যুদ্ধে কারো জয় নেই, পরাজিত নেতানিয়াহু

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সঙ্ঘাতে যদি একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে থাকে, তা হলো- এটি এমন এক যুদ্ধ, যেখানে প্রকৃতপে কোনো বিজয়ী নেই। তবে এই অচলাবস্থার ভেতরেও সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও কৌশলগত তিগ্রস্ত হিসেবে উঠে আসছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর যুদ্ধের ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের কৌশল ও প্রচারণা কার্যত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।

বহু বছর ধরে নেতানিয়াহু ইরানকে ঘিরে সামরিক হুমকি, আন্তর্জাতিক মঞ্চে নাটকীয় উপস্থাপন এবং বিভিন্ন মার্কিন প্রশাসনের ওপর চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে একটি সরাসরি সঙ্ঘাতের পরিবেশ তৈরি করে আসছিলেন। কিন্তু বাস্তব যুদ্ধের ফলাফল তার প্রত্যাশার সাথে মেলেনি। ইসরাইলি গোয়েন্দা বিশ্লেষণে যে দ্রুত বিজয়ের পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল, তা বাস্তবে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা মহলও শুরু থেকেই এই যুদ্ধ-পরিকল্পনাকে অবাস্তব বলে আখ্যা দিয়েছিল।

যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এসে আরো স্পষ্ট হয় যে, নেতানিয়াহু যুদ্ধবিরতি ঠেকাতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজস্ব কৌশলগত বিবেচনায় ইসরাইলকে কার্যত পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নেন। এতে শুধু কূটনৈতিকভাবেই নয়, ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তা প্রশ্নেও একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা সামনে আসে- দেশটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এর প্রতিক্রিয়া তীব্র। বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার ল্যাপিড সরাসরি এ পরিস্থিতিকে দেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় রাজনৈতিক বিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষায়, সেনাবাহিনী দায়িত্ব পালন করলেও নেতানিয়াহু রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে ব্যর্থ হয়েছেন এবং তার ঘোষিত কোনো ল্যই অর্জিত হয়নি। একই সুরে বামঘেঁষা রাজনীতিক ইয়ার গোলান এটিকে ‘ঐতিহাসিক কৌশলগত ব্যর্থতা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

বাস্তবতা হলো, এই যুদ্ধে নেতানিয়াহু সব কিছু বাজি ধরেছিলেন। কিন্তু তিনি ইরানের শাসনব্যবস্থা পতন, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দখল বা রাষ্ট্রীয় সামরিক সমতা ভেঙে ফেলার মতো কোনো ল্যই অর্জন করতে পারেননি; বরং উল্টোভাবে আইআরজিসির প্রভাব ও অবস্থান আরো শক্তিশালী হয়েছে। ইরান তার প্রধান ল্য- রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকা- অর্জন করতে পেরেছে, যা এই সঙ্ঘাতে একটি বড় কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

একই সাথে দণি লেবাননে ইসরাইলের সামরিক তৎপরতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। সেখানে হিজবুল্লাহর সাথে সম্ভাব্য সরাসরি সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়ছে, যা অতীতে ইসরাইলের জন্য কঠিন অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছে। এই প্রোপটে লেবাননে ইসরাইলের বিমান হামলাকে অনেক বিশ্লেষক প্রতিশোধমূলক বা হতাশাজনিত পদপে হিসেবে দেখছেন।

আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এর প্রতিক্রিয়া গভীর। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে, ১৯৬০-এর দশক থেকে চলে আসা ইসরাইলপন্থী রাজনৈতিক ঐকমত্যে দৃশ্যমান ফাটল ধরেছে। ট্রাম্প এর প্রশাসনের ওপর ইসরাইলের প্রভাব এবং এই যুদ্ধে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি এখন ডান ও বাম- উভয় রাজনৈতিক শিবির থেকেই সমালোচিত হচ্ছে। এমনকি মার্কিন ইহুদি ভোটারদের মধ্যেও ইসরাইলের প্রতি সমর্থন ঐতিহাসিকভাবে নিম্নমুখী।

অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দিক থেকেও নেতানিয়াহুর সামনে কঠিন সময় অপো করছে। নির্বাচনের বছরে তিনি এমন একটি যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসছেন, যেখানে তার প্রতিশ্রুত ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ বা ‘চিরস্থায়ী নিরাপত্তা’- কোনোটিই অর্জিত হয়নি। বরং তিনি যে ‘অস্তিত্বগত হুমকি’ দূর করার কথা বলতেন, সেই বাস্তবতা প্রায় অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।

অন্য দিকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ হওয়ার বদলে বরং নতুন আলোচনায় তা স্বীকৃতি পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা অনেকাংশে বারাক ওবামার সময়কার পারমাণবিক চুক্তির কাঠামোর সাথে মিল খুঁজে দেয়- যে চুক্তি নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে বিরোধিতা করে আসছিলেন এবং যেখান থেকে ট্রাম্প সরে দাঁড়িয়েছিলেন।

সব মিলিয়ে এই যুদ্ধ শুধু সামরিক নয়; কৌশলগত ও রাজনৈতিক ব্যর্থতারও প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি এমন এক ‘এককালীন সুযোগ’ ছিল, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সমর্থন নিয়ে ইসরাইল বৃহৎ পরিসরের অভিযান চালাতে পেরেছিল। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হওয়ায় ভবিষ্যতে এমন সমর্থন আবার পাওয়া যাবে- এমন সম্ভাবনা খুবই কম।

এ প্রোপটে প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে- দীর্ঘদিন ধরে যে যুদ্ধ-রাজনীতিকে নিজের প্রধান শক্তি হিসেবে ব্যবহার করেছেন নেতানিয়াহু, সেটি যখন কার্যত ভেঙে পড়েছে, তখন তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোথায় দাঁড়াবে?