সাক্ষাৎকার : ড্যান মজিনা

বাংলাদেশের রূপান্তরে গণভোট খুবই গুরুত্বপূর্ণ

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

বাংলাদেশ এখন একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে- এমন মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা। তিনি বলেন, দেশের চলমান রাজনৈতিক রূপান্তরপ্রক্রিয়ায় আসন্ন গণভোট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, কারণ এর মাধ্যমে জনগণ তাদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামো ও শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে সুস্পষ্ট মতামত জানাতে পারবে।

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশী সাংবাদিক কনক সারোয়ারের ইউটিউব চ্যানেল বাংলাদেশ নিউজ-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ড্যান মজিনা জুলাই বিপ্লবকে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, ‘স্বৈরাচারের পতন ছিল এক উত্তেজনাকর ও আশাব্যঞ্জক মুহূর্ত, যা তরুণ শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বেই সম্ভব হয়েছে।’

গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে- তারা শাসনতন্ত্র পরিবর্তন চায় কি না, কার্যকর সুশাসন ও জবাবদিহিমূলক সরকার দেখতে চায় কি না, সংসদের কাঠামোগত সংস্কার কিংবা রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা কতটা জরুরি।

‘মানুষ কী চায় আমরা অনেকটাই জানি,’ বলেন মজিনা, ‘কিন্তু সেই চাওয়া কী ধরনের সংস্কারের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে, সেটাই নির্ধারণ করবে গণভোটের ফলাফল।’

তিনি মনে করেন, গণভোটে জনগণের রায় আগামী সরকারকে সংস্কার বাস্তবায়নে নৈতিক শক্তি ও রাজনৈতিক বৈধতা দেবে। তবে পুরনো ব্যবস্থার সুবিধাভোগীরা পরিবর্তনের পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

জামায়াত প্রসঙ্গ ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান : ওয়াশিংটন পোস্টের একটি প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ টেনে কনক সারোয়ার জানতে চান, যুক্তরাষ্ট্র কি জামায়াতে ইসলামীর সাথে বিশেষ কোনো সম্পর্ক বা তাদের ক্ষমতায় আসাকে সমর্থন করে কি না। জবাবে ড্যান মজিনা বলেন, তিনি এখন সরকারি দায়িত্বে না থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক অবস্থান বলতে পারবেন না। তবে ব্যক্তিগতভাবে তিনি মনে করেন, ‘বাংলাদেশে যে দলই নির্বাচনে জয়ী হোক, তাদের সাথে স্বচ্ছতা ও গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখাই গুরুত্বপূর্ণ।’

তিনি যোগ করেন, জনসংখ্যার বিচারে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বড় দেশ এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ- তাই একে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

হাসিনা সরকার ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা : বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূত থাকাকালে আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে সমালোচনার মুখে পড়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ড্যান মজিনা বলেন, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে অনেক সময় নেতৃত্ব বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

‘ক্ষমতা মানুষকে বদলে দেয়,’ বলেন তিনি। ‘গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করার যে কাজ আমি করেছি, তা হয়তো শেখ হাসিনার পছন্দ হয়নি।’

তিনি জানান, দায়িত্ব শেষে তার সাথে হাসিনার সাক্ষাৎ হয়নি। তবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সাথে পেশাগত সম্পর্ক ছিল ইতিবাচক।

অন্তর্বর্তী সরকার ও ইউনূস : অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ‘পারফেক্ট চয়েস’ আখ্যা দিয়ে মজিনা বলেন, সঙ্কটকালে নেতৃত্ব দেয়া সহজ নয়।

‘বনের ভেতর পথ তৈরি থাকে না, পথ তৈরি করে নিতে হয়। ইউনূস সেই চেষ্টাই করছেন।’

১৮ কোটি মানুষের দেশের সংস্কারপ্রক্রিয়া, রাজনৈতিক সমঝোতা ও ঐকমত্য তৈরিতে সীমাবদ্ধতা থাকা স্বাভাবিক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তারেক রহমান ও রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি বার্তা : বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রসঙ্গে ড্যান মজিনা বলেন, অতীতের স্বৈরশাসনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়া জরুরি।

‘রাজনীতিবিদদের সবসময় মনে রাখতে হবে- তারা জনগণের জন্য কাজ করেন। জনগণের চাওয়া উপেক্ষা করলে পরিণতি ভালো হয় না।’

তিনি বলেন, দলীয় স্বার্থ বা ব্যক্তিগত লাভের চেয়ে জনগণের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে- এ নীতি সব দলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

জামায়াত ক্ষমতায় এলে পশ্চিমাদের অবস্থান : জামায়াত সরকার গঠন করলে পশ্চিমা বিশ্বের প্রতিক্রিয়া কী হবে- এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, জামায়াত ভারসাম্যপূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থান নেবে এবং উগ্রপন্থাকে প্রশ্রয় দেবে না। কোনো দলেরই তা করা উচিত নয়।’

সেনাবাহিনীর ভূমিকা : জুলাই বিপ্লবে সেনাবাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করে ড্যান মজিনা বলেন, তারা জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়নি- এটাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

‘সেনাবাহিনী বাংলাদেশের নিরাপত্তার রক্ষক। তাদের সম্মান দেয়া এবং বেসামরিক কর্তৃপক্ষের অধীনে রেখে পেশাদারিত্ব বজায় রাখা জরুরি।’

তবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার না করার পরামর্শ দেন তিনি।

ভারতীয় প্রভাব ও সার্বভৌমত্ব : বাংলাদেশের রাজনীতিতে বাইরের প্রভাব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে কেবল বাংলাদেশীরাই। বিদেশী সহায়তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সমর্থন করতে পারে, কিন্তু কোনো দলকে পক্ষপাত করা উচিত নয়।

আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ ও পুনর্মিলন : শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে মন্তব্য করতে না চাইলেও আওয়ামী লীগের জন্য পুনর্মিলন প্রক্রিয়ার ওপর জোর দেন মজিনা। দক্ষিণ আফ্রিকার ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’-এর উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, গুরুতর অপরাধে জড়িতদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার পাশাপাশি লাখো সমর্থককে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনা জরুরি।

তার ভাষায়, ‘নতুন বাংলাদেশ গড়তে কাউকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা ঠিক হবে না। সবার অংশগ্রহণেই শক্তিশালী গণতন্ত্র সম্ভব।’

ড্যান মজিনার মতে, বাংলাদেশের মানুষ অসাধারণ সাহস দেখিয়েছে। এখন প্রয়োজন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানো এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা।

‘দিন শেষে সবাইকে জনগণের কাছেই জবাবদিহি করতে হবে’- এটাই তার মূল বার্তা।