মোহাম্মদ বেলাল হোসাইন
আরব বসন্তের একমাত্র ‘সফল’ গণতান্ত্রিক রূপান্তর হিসেবে তিউনিসিয়া এক দশক ধরে বিশ্বের প্রশংসা কুড়িয়েছিল। সেই রূপান্তরের কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিল রাশেদ ঘানুশির নেতৃত্বাধীন ইসলামপন্থী গণতান্ত্রিক দল আন-নাহদা। অথচ ২০২১ সালের ২৫ জুলাই প্রেসিডেন্ট কাইস সাঈদ যখন সংসদ স্থগিত করে সব ক্ষমতা নিজের হাতে তুলে নিলেন, তখন রাজপথে প্রতিরোধ গড়ার মতো অবস্থা দলটির আর ছিল না। যে দল ২০১১ সালে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক শক্তি ছিল, মাত্র দশ বছরে তারা এমন অবস্থানে পৌঁছাল যেখানে তাদের বিলুপ্তিতে জনগণের বড় অংশ কার্যত স্বস্তি প্রকাশ করল। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বিশ্লেষণ আজ আর নিছক তাত্ত্বিক আলোচনা নয়। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসন পেয়ে (জোটগতভাবে ৭৭) ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দলে পরিণত হয়েছে, যা তাদের পূর্ববর্তী সর্বোচ্চ ১৮ আসনের প্রায় চারগুণ। বিএনপি ২০৯ আসনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকারে। বাংলাদেশের ইসলামী গণতান্ত্রিক রাজনীতি এখন ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে আন-নাহদা দাঁড়িয়েছিল ২০১১ সালে। সামনে রাষ্ট্র পরিচালনা, জোট রাজনীতি ও আস্থা অর্জনের এক কঠিনতম পরীক্ষা তাদের।
এই নিবন্ধে আমরা আন-নাহদার অভিজ্ঞতা ছয়টি বিশ্লেষণী কাঠামোয় ভেঙে দেখাব এবং প্রতিটি কাঠামো থেকে বাংলাদেশের ইসলামী গণতান্ত্রিক দলগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট শিক্ষা চিহ্নিত করব।
প্রথম অধ্যায় : আন-নাহদার পতন আকস্মিক নয়, এটি ছিল ধারাবাহিক ও পরিমাপযোগ্য ক্ষয়। ২০১১ সালে গণপরিষদ নির্বাচনে ২১৭ আসনের মধ্যে দলটি পায় ৮৯টি। ৩৭ শতাংশ ভোট পেয়ে হয় একক বৃহত্তম দল । ধর্মনিরপেক্ষ সিপিআর ও এত্তাকাতোলের সাথে তিন দলীয় জোট সরকার গঠন হয়।
২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনে ৬৯ আসন পেয়ে নিদা তুনিসের (৮৬ আসন) কাছে পরাজয়। প্রায় ১০ লাখ ভোট হ্রাস পায়। ২০১৯ সালে ৫২ আসন পেয়ে বৃহত্তম দল হলেও ভোটের হার নেমে আসে ২০ শতাংশের নিচে। একই নির্বাচনে ‘রাজনীতিবিরোধী’ নির্দলীয় প্রার্থী কাইস সাঈদ ৭২ শতাংশের বেশি ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এটি প্রচলিত রাজনৈতিক শ্রেণীর প্রতি জনগণের সামগ্রিক অনাস্থার সূচক।
২০২১ সালের ২৫ জুলাই কাইস সাঈদ সংসদ স্থগিত ও প্রধানমন্ত্রীকে বরখাস্ত করেন; ২০২২ সালে সংসদ বিলুপ্ত ও নতুন সংবিধানে প্রেসিডেন্টের হাতে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়। ২০২৩ সালে অশীতিপর ঘানুশি গ্রেফতার হন এবং একাধিক মামলায় দীর্ঘমেয়াদে দণ্ডিত হন। আন-নাহদার কার্যালয় বন্ধ, শীর্ষ নেতৃত্ব কারাগারে বা নির্বাসনে। মাত্র এক দশকে ৩৭ শতাংশ ভোট পাওয়া দল থেকে রাজনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ার কারণগুলোই আমাদের বিশ্লেষণের বিষয়।
আন-নাহদার কৌশলগত মূলমন্ত্র ছিল ‘তাওয়াফুক’ বা ঐকমত্য। ঘানুশি মিসরের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছিলেন। ২০১৩ সালে মুরসি সরকারের বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থান দেখে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, সঙ্ঘাতের পথে না গিয়ে আপসের পথে হাঁটবেন। এই কৌশলের ফল ছিল দ্বিমুখী :
ইতিবাচক দিক : ২০১৪ সালের সংবিধানে শরিয়াহকে আইনের উৎস হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি থেকে আন-নাহদা স্বেচ্ছায় সরে আসে; ২০১৩ সালের রাজনৈতিক সঙ্কটে নির্বাচিত সরকার হয়েও স্বেচ্ছায় টেকনোক্র্যাট সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে; এমনকি ২০১৪ সালের পর নিজেদের ঐতিহাসিক প্রতিপক্ষ, বেন আলী যুগের অবশিষ্টাংশ নিদা তুনিসের সাথেও ঐক্য সরকারে যোগ দেয়। এই আপসের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতীয় সংলাপ চতুষ্টয় ২০১৫ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পায় এবং তিউনিসিয়া গৃহযুদ্ধ এড়ায়।
নেতিবাচক দিক এবং এখানেই মূলশিক্ষা : এই ক্রমাগত আপস আন-নাহদাকে এক অদ্ভুত শূন্যতায় ফেলে দেয়। তাদের আদর্শিক ভিত্তি যারা ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক রূপান্তরের প্রত্যাশায় ভোট দিয়েছিল তারা দলকে ‘আত্মসমর্পণকারী’ হিসেবে দেখতে শুরু করে এবং হতাশ হয়ে হয় নিষ্ক্রিয়, নয়তো আরো কট্টর ধারার দিকে ঝুঁকে পড়ে। অন্য দিকে ধর্মনিরপেক্ষ শিবির এত আপসের পরও আন-নাহদাকে কখনোই ‘গোপন এজেন্ডাধারী’ সন্দেহের বাইরে রাখেনি।
ফলাফল : গণভিত্তি হারানো, অথচ প্রতিপক্ষের আস্থা অর্জনে ব্যর্থতা।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা : আপস ও নমনীয়তা গণতান্ত্রিক রাজনীতির অপরিহার্য উপাদান, কিন্তু আপসের একটি সুস্পষ্ট কৌশলগত সীমারেখা ও ব্যাখ্যা-কাঠামো থাকতে হবে। কোনো নীতিগত অবস্থান আলোচনাযোগ্য আর কোনটি নয়, তা দলের কর্মী ও সমর্থকদের কাছে আগে থেকে স্পষ্ট না থাকলে প্রতিটি আপস ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে পঠিত হয়। জামায়াত ও অন্যান্য ইসলামী দলকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, উচ্চকক্ষের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বিতর্কসহ আসন্ন প্রতিটি সাংবিধানিক দর-কষাকষিতে এই ভারসাম্য রক্ষার কথা মাথায় রাখতে হবে।
‘মুসলিম ডেমোক্র্যাট’ রূপান্তরের অমীমাংসিত দ্বিধা
২০১৬ সালের হাম্মামেত কংগ্রেসে আন-নাহদা একটি ঐতিহাসিক ঘোষণা দেয় : তারা আর ‘ইসলামপন্থী’ নয়, বরং ‘মুসলিম ডেমোক্র্যাট’; দাওয়াহ (ধর্মীয়-সামাজিক কার্যক্রম) ও রাজনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পৃথক করা হবে। তুলনাটি ছিল ইউরোপের খ্রিষ্টান ডেমোক্র্যাট দলগুলোর সাথে। তাত্ত্বিকভাবে এটি ছিল সাহসী পদক্ষেপ। কিন্তু বাস্তবায়নে দু’টি মৌলিক সমস্যা দেখা দেয় :
প্রথমত, রূপান্তরটি ছিল মূলত ঘোষণামূলক, কাঠামোগত নয়। দলের সাংগঠনিক সংস্কৃতি, নেতৃত্ব-কাঠামো ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া আগের মতোই রয়ে যায়। ঘানুশি নিজে চার দশক ধরে দলের শীর্ষে, নেতৃত্বের নবায়ন ঘটেনি। ফলে বাইরের পর্যবেক্ষকদের কাছে এটি কৌশলগত ‘রিব্র্যান্ডিং’ মনে হয়েছে, আন্তরিক রূপান্তর নয়।
দ্বিতীয়ত, আদর্শিক পরিচয়ের এই পুনর্নির্মাণ দলের অভ্যন্তরে উত্তর-না-পাওয়া প্রশ্ন তৈরি করে : যদি আন-নাহদা আর দশটা রক্ষণশীল দলের মতোই হয়, তাহলে তাকে ভোট দেয়ার বিশেষ কারণ কী? একটি আদর্শিক আন্দোলন যখন তার স্বাতন্ত্র্য বিসর্জন দেয় অথচ বিকল্প কোনো সুস্পষ্ট মূল্যপ্রস্তাব (value proposition) দাঁড় করাতে পারে না, তখন সে সাধারণ ভোটের বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতাও হারায়।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা : রাজনৈতিক ডানপন্থা থেকে মধ্যপন্থার দিকে যাত্রা- (যে ভাবমূর্তি জামায়াত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নির্মাণের চেষ্টা করেছে) কেবল ভাষা ও প্রতীক বদলে টেকসই হয় না।
প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার : নেতৃত্বে প্রজন্মান্তর, সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা, নারী ও সংখ্যালঘু প্রশ্নে কেবল আশ্বাস নয় বরং যাচাইযোগ্য নীতি-অবস্থান এবং ১৯৭১ প্রশ্নে ঐতিহাসিক বোঝাপড়ার একটি সৎ ও সাহসী মীমাংসা। ঘোষণা আর কাঠামোর এই ফারাক জনগণ ঠিকই ধরে ফেলে। তিউনিসিয়ায় ধরেছিল, বাংলাদেশেও ধরবে। তিউনিসিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায়, স্বৈরতন্ত্রের তিনটি স্তম্ভ শাসকের পতনের পরও অক্ষত থাকে :
১. আমলাতন্ত্র ও নিরাপত্তা কাঠামো : স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুরনো নেটওয়ার্ক সংস্কার প্রচেষ্টাকে ধীরগতিতে অকার্যকর করে দেয়।
২. অর্থনৈতিক এলিট : বেন আলী ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দ্রুত নিজেদের পুনর্বিন্যস্ত করে এবং মিডিয়া ও অর্থায়নের মাধ্যমে প্রভাব বজায় রাখে।
৩. সংগঠিত স্বার্থগোষ্ঠী : শক্তিশালী শ্রমিক ইউনিয়ন ইউজিটিটি (UGTT) একাধারে গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ এবং যেকোনো অর্থনৈতিক সংস্কারের কার্যত ভেটোধারী শক্তি হিসেবে কাজ করে- ধর্মঘটের ক্ষমতা দিয়ে তারা প্রতিটি সরকারকে জিম্মি করতে পেরেছে। আন-নাহদা এই ত্রিমুখী প্রতিরোধের মুখে না পেরেছে প্রশাসন সংস্কার করতে, না পেরেছে অর্থনীতি গতিশীল করতে অথচ ব্যর্থতার সম্পূর্ণ রাজনৈতিক দায় তাদের ঘাড়েই পড়েছে, কারণ জনগণের চোখে ক্ষমতায় তারাই ছিল।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা : পনের বছরের আওয়ামী শাসনে গড়ে ওঠা প্রশাসনিক আনুগত্য-কাঠামো, ব্যাংকিং খাতের খেলাপি সংস্কৃতি, রাজনীতিকৃত বিচারব্যবস্থা ও ব্যবসায়ী-রাজনীতিক আঁতাত রাতারাতি বিলীন হয়নি। নতুন সরকার ও বিরোধী দল— উভয়কেই বুঝতে হবে, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এক দশকের প্রকল্প এবং যে দল ক্ষমতায় থাকবে, সংস্কারের ধীরগতির দায় জনগণ তাকেই দেবে। বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতের জন্য এটি এক দিকে সুবিধা, অন্য দিকে পরীক্ষা— গঠনমূলক জবাবদিহির রাজনীতি করবে, নাকি কেবল ব্যর্থতার ফসল তোলার অপেক্ষায় থাকবে?
পতনের প্রধান চালক
তিউনিসিয়ার বিপ্লবের মূল স্লোগান ছিল ‘রুটি, স্বাধীনতা, মর্যাদা।’ স্বাধীনতা এসেছিল, কিন্তু রুটি আসেনি। বেকারত্ব বিপ্লবের এক দশক পরও ১৫ শতাংশের ওপরে; তরুণ বেকারত্ব ৩০-৪০ শতাংশ। দিনারের ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন ও দুই অঙ্কের কাছাকাছি মূল্যস্ফীতি। সরকারি ঋণ জিডিপির ৪০% থেকে বেড়ে ৮০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়; আইএমএফ-নির্ভরতা ও কৃচ্ছ্রসাধনের চাপ। অভ্যন্তরীণ অঞ্চলগুলোর (যেখান থেকে বিপ্লবের সূচনা) বৈষম্য অপরিবর্তিত। রাজনৈতিক বিজ্ঞানের একটি মৌলিক সত্য এখানে প্রমাণিত : গণতান্ত্রিক রূপান্তরের বৈধতা শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক ডেলিভারির ওপর নির্ভরশীল। নির্বাচন, সংবিধান, সংলাপ দিয়ে পেট ভরে না।
২০১৯ সালে কাইস সাঈদের উত্থান এবং ২০২১ সালে তার ক্ষমতা দখলে জনসমর্থন উভয়ের পেছনে ছিল এই অর্থনৈতিক হতাশা। মানুষ গণতন্ত্র প্রত্যাখ্যান করেনি; তারা এমন গণতন্ত্র প্রত্যাখ্যান করেছে, যা ফল দিতে পারেনি।
বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এই মুহূর্তে তিউনিসিয়ার চেয়েও নাজুক- প্রবৃদ্ধি মন্থর, মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের কাছাকাছি, রিজার্ভ অর্ধেকে নেমে আসা, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পাহাড়।
ইসলামী দলগুলোর ঐতিহাসিক দুর্বলতা হলো অর্থনৈতিক নীতি-দক্ষতার। আগামী নির্বাচনে জনগণ যাকে বিকল্প ভাববে, তার কাছে চাইবে কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও ব্যাংক খাত সংস্কারের বিশ্বাসযোগ্য নীলনকশা- খুতবা নয়। বিরোধী দলে থাকার এই পাঁচ বছর জামায়াতের জন্য অর্থনৈতিক নীতি-সক্ষমতা (ছায়া মন্ত্রিসভা, বিশেষজ্ঞ সেল, খাতভিত্তিক গবেষণা) গড়ে তোলার সুবর্ণ সুযোগ।
ষষ্ঠ অধ্যায় : নিরাপত্তা সঙ্কট ও উগ্রবাদের দায়
২০১৩ সালে দুই বামপন্থী নেতা ফেব্রুয়ারিতে শোকরি বেলাইদ ও জুলাইয়ে মোহাম্মদ ব্রাহমি আততায়ীর হাতে নিহত হন। হত্যাকাণ্ড দু’টি ঘটিয়েছিল সালাফি-জিহাদি গোষ্ঠী, আন-নাহদা নয়। কিন্তু রাজনৈতিক দায় পড়ল আন-নাহদার ওপরই। অভিযোগ উঠল, ক্ষমতায় থেকে তারা উগ্রপন্থীদের প্রতি ‘নরম’ ছিল, আনসার আল-শরিয়ার মতো গোষ্ঠীকে সময়মতো দমন করেনি। ২০১৫ সালের বার্দো জাদুঘর ও সুস সৈকতের সন্ত্রাসী হামলা পর্যটননির্ভর অর্থনীতিকে পঙ্গু করে এবং ইসলামপন্থা নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করে এই বয়ানকে জনমনে গেঁথে দেয়। প্রতিপক্ষ সর্বদা প্রস্তুত থাকে ধর্মীয় পরিচয়ের সূত্র ধরে চরমপন্থীদের কর্মকাণ্ডের দায় তার ঘাড়ে চাপাতে। নীরবতা বা দ্ব্যর্থবোধকতা এখানে আত্মঘাতী।
বাংলা ভাই, জেএমবি অধ্যায় থেকে হোলি আর্টিজান পর্যন্ত বাংলাদেশে উগ্রবাদের দায় ইসলামী রাজনীতির ঘাড়ে চাপানোর বয়ান-কাঠামো প্রস্তুত হয়েই আছে এবং দেশী-বিদেশী উভয় মহলই প্রয়োজনে তা সক্রিয় করবে। মূলধারার ইসলামী দলগুলোকে তাই উগ্রবাদ প্রশ্নে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি কেবল ঘোষণা নয়, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রদর্শন করতে হবে। সন্দেহভাজন উপাদান থেকে সাংগঠনিক দূরত্ব, সহিংসতার প্রতিটি ঘটনায় দ্রুত ও দ্ব্যর্থহীন নিন্দা এবং তরুণ কর্মীদের জন্য আদর্শিক প্রশিক্ষণে গণতান্ত্রিক অঙ্গীকারের স্পষ্ট অন্তর্ভুক্তি জরুরি।
সপ্তম অধ্যায় : জনতুষ্টিবাদী প্রতিক্রিয়া পতনের চূড়ান্ত অঙ্ক : আন-নাহদার গল্পের শেষ অধ্যায়টি প্রায়ই উপেক্ষিত অথচ সবচেয়ে শিক্ষণীয়। কাইস সাঈদ সামরিক জেনারেল ছিলেন না, ছিলেন না পুরনো শাসকগোষ্ঠীর প্রতিনিধিও। তিনি ছিলেন অধ্যাপক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, যিনি ‘সব রাজনীতিকই চোর’ এই সরল বার্তা নিয়ে এসেছিলেন। এক দশকের জোট, দর-কষাকষি, সংসদীয় অচলাবস্থা ও অর্থনৈতিক ব্যর্থতায় ক্লান্ত জনগণ তাকে ত্রাতা ভেবেছিল। ২০২১ সালে তিনি যখন সংসদ ভেঙে দিলেন, জরিপে দেখা যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ তিউনিসীয় তা সমর্থন করে। অর্থাৎ গণতন্ত্রের কবর খুঁড়লেন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত এক জনতুষ্টিবাদী এবং সেটি জনগণের করতালির মধ্যে। রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত ব্যর্থতা এমন এক শূন্যতা তৈরি করেছিল, যেখানে ‘রাজনীতিবিরোধী’ যেকোনো শক্তিই আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা : বিএনপি-জামায়াত-এনসিপিসহ সব দলের সামনে এখন একটি সম্মিলিত পরীক্ষা সংসদীয় গণতন্ত্রকে কার্যকর প্রমাণ করা। যদি নতুন সংসদ দলীয় কোন্দল, প্রতিহিংসার রাজনীতি ও সুফল দিতে ব্যর্থতার প্রদর্শনী হয়, তাহলে বাংলাদেশেও ‘সব রাজনীতিকই সমান’ বয়ান শক্তিশালী হবে এবং ইতিহাস সাক্ষী, সেই শূন্যতা পূরণ করে হয় জনতুষ্টিবাদ, নয়তো অগণতান্ত্রিক শক্তি। জুলাই অভ্যুত্থানের অর্জন রক্ষার দায় তাই সরকার ও বিরোধী দল উভয়ের।
আন-নাহদার ত্রয়িকা জোট : জোটের ছোট শরিক সিপিআর ও এত্তাকাতোল কার্যত রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। বড় আদর্শিক দলের সাথে জোট ছোট দলের স্বকীয়তা গ্রাস করে; তার সমর্থকরা হয় বড় শরিকে বিলীন হয়, নয় ‘আদর্শচ্যুতির’ অভিযোগে দল ছাড়ে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে জামায়াত-এনসিপি জোটে এই গতিশীলতার প্রতিধ্বনি স্পষ্ট। জোট ঘোষণার পরপরই এনসিপির একাধিক শীর্ষ নেতার পদত্যাগ, প্রগতিশীল অংশের বিচ্ছিন্নতা এবং শেষ পর্যন্ত ৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মাত্র ৬টিতে জয়। জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী শক্তিটি নির্বাচনী পাটিগণিতে জামায়াতের জুনিয়র পার্টনারে পরিণত হয়েছে, যা তার প্রতিষ্ঠাকালীন স্বতন্ত্র পরিচয়ের জন্য অস্তিত্বগত প্রশ্ন তৈরি করেছে।
উভয় পক্ষের জন্য শিক্ষা : জোট কেবল আসন ভাগাভাগির হিসাব নয়, এটি পরিচয়, বয়ান ও ভবিষ্যৎ ভোটব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। বড় শরিককে বুঝতে হবে, ছোট শরিককে গিলে ফেলা ক্ষণস্থায়ী লাভ, কারণ তাতে ভবিষ্যতের জোট-সম্ভাবনা ও মধ্যপন্থী ভোটারের আস্থা দুই-ই নষ্ট হয়। ছোট শরিককে বুঝতে হবে, আদর্শিক স্বকীয়তা বিসর্জন দিয়ে পাওয়া আসন আসলে ধারে পাওয়া।
বিরোধী বেঞ্চই এখন আসল পরীক্ষাগার
আন-নাহদা ক্ষমতা অর্জনের রাজনীতিতে যতটা দক্ষ ছিল, আস্থা অর্জনের রাজনীতিতে ততটাই ব্যর্থ। ভোটের পাটিগণিত তারা মিলিয়েছিল, কিন্তু একটি বিভক্ত সমাজে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক চুক্তি নির্মাণ করতে পারেনি; ঘোষণায় মধ্যপন্থী হয়েছিল, কাঠামোয় নয়; প্রক্রিয়া রক্ষা করেছিল, ডেলিভারি দিতে পারেনি।
বাংলাদেশের ইসলামী গণতান্ত্রিক শক্তির জন্য ইতিহাস এই মুহূর্তে একটি বিরল সুযোগ রেখেছে- এমন সুযোগ, যা আন-নাহদা পায়নি। আন-নাহদাকে বিপ্লবের পরদিনই রাষ্ট্র চালাতে হয়েছিল, প্রস্তুতির সময় ছাড়াই; ব্যর্থতার দায় তাই সরাসরি তার ঘাড়ে পড়েছে। জামায়াত পেয়েছে বিরোধী বেঞ্চ- অর্থাৎ দায়মুক্ত থেকে সক্ষমতা নির্মাণের পাঁচটি বছর। এই সময়ে যদি তারা গঠনমূলক জবাবদিহির সংসদীয় সংস্কৃতি প্রদর্শন করতে পারে, অর্থনৈতিক নীতি-দক্ষতা গড়ে তুলতে পারে, নেতৃত্ব ও কাঠামোয় প্রকৃত সংস্কার আনতে পারে, উগ্রবাদ প্রশ্নে দ্ব্যর্থহীন অবস্থান প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে এবং ১৯৭১-সহ ঐতিহাসিক প্রশ্নগুলোর সৎ মীমাংসায় পৌঁছাতে পারে তবেই তারা আন-নাহদার পরিণতি এড়াতে পারবে।
আর যদি তারা এই সময়টুকু কেবল পরবর্তী নির্বাচনের কৌশলী প্রস্তুতিতে ব্যয় করে- আস্থা নির্মাণ ছাড়াই ক্ষমতার পথ খোঁজে- তাহলে তিউনিসিয়ার ইতিহাসই তাদের ভবিষ্যতের আয়না, ক্ষমতায় যাওয়া সহজ, টিকে থাকা কঠিন এবং আস্থাহীন ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত পতনেরই আরেক নাম। স্বৈরাচারের পতন গণতন্ত্রের সূচনা মাত্র। তাকে টিকিয়ে রাখতে লাগে দূরদর্শিতা, সহনশীলতা, অর্থনৈতিক বাস্তববাদ, প্রাতিষ্ঠানিক ধৈর্য এবং সর্বোপরি- দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে জাতীয় ঐক্যকে স্থান দেয়ার সাহস।
লেখক : ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক