লোহার বাসর ঘর রক্ষা করেনি লক্ষিন্দরকে। একইভাবে লৌহ গম্বুজ বা ‘আয়রন ডোম’সহ ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী একাধিক ‘বাসর ঘর’ বানিয়ে রাখলেও রক্ষা পেল না ইসরাইল। লক্ষিন্দরের বাসর ঘরের ছিদ্র পথে যেমন মাত্র একটি কালসাপ ঢুকে সর্বনাশ করেছিল, তেমনই ইরানের একের পর এক ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইলের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ফুটো গলে ঢুকে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে।
যুদ্ধ চলাকালে মুখ চেপে রেখেছিল তেল আবিব; দুনিয়াকে জানতে দেয়নি তার বড় ক্ষতির খবর। কিন্তু ইসরাইলি সেনা-সেন্সরের ফাঁক দিয়ে এবার বেরিয়ে এসেছে সেই লুকানো বিবরণ, কিভাবে ইসরাইলের থোতা মুখ ভোতা করে দিয়েছিল ইরান।
ইহুদিবাদী ইসরাইলের দৈনিক টাইমস অব ইসরাইল জানিয়েছে, ব্রিটিশ দৈনিক ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ প্রথমবারের মতো প্রকাশ করেছে, ওরেগন স্টেট ইউনিভার্সিটির স্যাটেলাইট তথ্যের ভিত্তিতে ইরানের ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ১২ দিনের যুদ্ধের মধ্যে ইসরাইলের পাঁচটি সেনা ঘাঁটিতে আঘাত হেনেছিল। সেনা ঘাঁটি ও অন্যান্য কৌশলগত এবং স্পর্শকাতর লক্ষ্যবস্তুতে হামলার বিস্তারিত বিবরণ ইসরাইলে প্রকাশ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
বলা হয়েছিল যে ইরান সেগুলো দেখে ভবিষ্যতে ক্ষেপণাস্ত্রের নিশানা আরো নিখুঁত করতে না পারে, এই অজুহাতে সেন্সরশিপ চাপিয়েছিল ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ।
কিন্তু ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, যে ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করা হয়েছিল তার মধ্যে ছিল ‘তেল নফ’ বিমান ঘাঁটি, ‘গ্লিলট’ গোয়েন্দা ঘাঁটি আর ‘জিপোরিত’ ট্যাংক ও অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র। ওরেগন স্টেট ইউনিভার্সিটির যুদ্ধ অঞ্চলে স্যাটেলাইট-ভিত্তিক বোমার ক্ষয়ক্ষতি পর্যবেক্ষণ প্রকল্প থেকে পাওয়া রাডার ডেটায় দেখা গেছে, যুদ্ধের সময় ছয়টি রকেট এই পাঁচ আইডিএফ ঘাঁটিতে সরাসরি আঘাত হানে।
এর বাইরে অন্তত ৩৬টি ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইলের অভ্যন্তরে আঘাত হানে। ইসরাইলি ও মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে সক্ষম ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র এসব আঘাত হানে। ফলে ২৮ ইসরাইলি নিহত, ২৪০টি ভবনের ২৩০৫টি বাসা ক্ষতিগ্রস্ত, দু’টি বিশ্ববিদ্যালয় ও একটি কথিত হাসপাতালও আক্রান্ত হয়েছে। ঘরছাড়া হয়েছে ১৩ হাজারের বেশি ইসরাইলি।
যুদ্ধ চলাকালে ইরান মোট ৫০০টির বেশি ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইলে নিক্ষেপ করেছিল এবং প্রায় এক হাজার ১০০ ড্রোন পাঠায়েছিল।
প্রতিরোধ ব্যবস্থা প্রথম দিকে ভালো কাজ করলেও যুদ্ধের প্রথম আট দিনের পর থেকে দিনে দিনে আরো বেশি বেশি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষা ভেদ করে ঢুকে পড়ে। ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এর বিশ্লেষণ বলছে, সপ্তম দিন নাগাদ প্রায় ১৬ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইলি ও মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিচ্ছিল।
ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের হার কমে যাওয়ার কারণ স্পষ্ট নয়, তবে ধারণা করা হচ্ছে ইসরাইল তার ‘অ্যারো’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে আসায় বেছে বেছে বাধা দেয়ার কৌশল নিয়েছিল। ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ও যুদ্ধের সময় জানিয়েছিল ইসরাইলের অ্যারো ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে আসছে। যদিও আইডিএফ দাবি, পর্যাপ্ত মজুত আগেই করে রাখা হয়েছিল।
আরো একটি কারণ হতে পারে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের নতুন ধরনের প্রযুক্তি, যা প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেয়ার অতিরিক্ত সক্ষমতা অর্জন। ১৯ জুন অন্তত একবার ইরান ক্লাস্টার বোমা ব্যবহার করেছিল, যা বিস্ফোরণে প্রায় ২০টি ছোট মিউনিশন ছড়িয়ে দেয় প্রায় আট কিলোমিটার জায়গায়। এই বোমার মধ্যে একটি ছোট ২.৫ কেজির বোমা আজর শহরের একটি বাড়িতে পড়ে ফেটে যায় এবং ছোট রকেটের আঘাতে যতটা ক্ষতি হতে পারে তাই করে।
টেলিগ্রাফ যখন আইডিএফকে জিজ্ঞাসা করেছিল এই হামলার বিষয়ে, তখন আইডিএফ মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে শুধু বলেছে, ‘অভিযান চলাকালে সব প্রাসঙ্গিক ইউনিট কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছিল।’
ইসরাইল বলেছে, ইরানের শীর্ষ সামরিক নেতা, পারমাণবিক বিজ্ঞানী, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির বিরুদ্ধে তেল আবিবের বড় ধরনের হামলা ছিল অপরিহার্য। এ সব আগ্রাসী হামলার মধ্য দিয়ে ইরানের ইসরাইল ধ্বংসের পরিকল্পনা ব্যর্থ করার নীল নকশা বাস্তবায়ন করা হয়েছিল, তেল আবিবের দাবি। যদিও ইরান বরাবরই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে, তবে ইউরেনিয়ামকে শান্তিপূর্ণ চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় সমৃদ্ধ করা, আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের বাধা দেয়া এবং ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বৃদ্ধি করার মতো পদক্ষেপ নিয়েছে।
ইসরাইলের দাবি, ইরান সম্প্রতি পারমাণবিক বোমা তৈরির কাজে স্পষ্টতই অগ্রগতি করেছে।
ইসরাইলের নতুন নতুন অস্ত্র ভবিষ্যতে কতটা নিরাপত্তা দিতে পারবে তা সময়ই বলবে। কিন্তু অতীতে তেল আবিব বারবার বড় গলায় দাবি করেছে যে ইসরাইল দুর্জয়, দুর্ভেদ্য।
বাস্তবে দেখা গেছে, ফুটো ছাতা দিয়ে মুষলধারে বৃষ্টি ঠেকানোর মতোই অর্থহীন প্রমাণিত হয়েছে ইসরাইলের এসব দাম্ভিকতা। এখন অনেকেই প্রশ্ন করবেন, এ দশা কি ইসরাইলের ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে?