যুদ্ধক্ষেত্রে একসময় তাদের নাম শুনলেই শিউরে উঠত শত্রুপক্ষ। দূরে কোথাও লুকিয়ে থাকা একজন মানুষ, যার একটি মাত্র গুলি মুহূর্তেই বদলে দিতে পারত যুদ্ধের গতিপথ। কিন্তু সেই স্নাইপারদের যুগ কি শেষ হয়ে আসছে? ড্রোনের দ্রুত উত্থানে ইউক্রেন যুদ্ধের ময়দানে এমনই এক বাস্তবতা সামনে এসেছে। যে স্নাইপার একসময় প্রায় আড়াই মাইল দূর থেকে গুলি করে বিশ্বরেকর্ড গড়েছিলেন, তিনি এখন রাইফেল নয়, ড্রোন অপারেটরদের সহকারী হিসেবে কাজ করছেন।
যুদ্ধের ইতিহাসে স্নাইপারদের জায়গা সবসময়ই আলাদা। ‘স্নাইপার’ শব্দটির জন্মও যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, শিকারের জগতে। অষ্টাদশ শতকে ভারতে অবস্থানরত ব্রিটিশ সেনা কর্মকর্তারা ‘স্নাইপ’ নামে ছোট, দ্রুতগতির এক পাখি শিকার করতেন। পাখিটি এতটাই চটপটে ছিল যে দূর থেকে তাকে নিখুঁতভাবে গুলি করতে পারা ছিল বিরাট দক্ষতার পরিচয়। সেই দক্ষ শিকারীকেই বলা হতো ‘স্নাইপার’। পরে শব্দটি সামরিক অভিধানে ঢুকে যায় এবং দূরপাল্লার নিখুঁত নিশানাবাজদের পরিচয় হয়ে ওঠে।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি মার্কিন গৃহযুদ্ধের সময় প্রথমবারের মতো স্নাইপারদের সংগঠিতভাবে ব্যবহার শুরু হয়। এরপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ট্রেঞ্চ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, ভিয়েতনামের জঙ্গল কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমি- সবখানেই স্নাইপাররা হয়ে উঠেছেন যুদ্ধের বিশেষ এক অস্ত্র।
এই দীর্ঘ ইতিহাসে বহু কিংবদন্তি নাম আছে। ফিনল্যান্ডের সিমো হাইহা তাদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত। ‘হোয়াইট ডেথ’ বা ‘শ্বেত মৃত্যু’ নামে পরিচিত এই কৃষক-যোদ্ধা ১৯৩৯-৪০ সালের শীতকালীন যুদ্ধে মাত্র এক শ’ দিনের মধ্যে ৫০৫ সোভিয়েত সৈন্যকে হত্যা করেছিলেন বলে স্বীকৃত। বরফে ঢাকা বনে সাদা পোশাক পরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লুকিয়ে থাকা ছিল তার কৌশল। তিনি দূরবীনও ব্যবহার করতেন না, যাতে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে তার অবস্থান ফাঁস না হয়ে যায়। আজও স্নাইপার হিসেবে তার রেকর্ড অটুট রয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আরেক কিংবদন্তির জন্ম হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নে। তার নাম লুদমিলা পাভলিচেনকো। ইতিহাসের সবচেয়ে সফল নারী স্নাইপার হিসেবে পরিচিত এই তরুণী ৩০৯ জন নাৎসি সৈন্যকে হত্যা করেছিলেন। নাৎসিরা তাকে ডাকত ‘লেডি অব ডেথ’ বা ‘মৃত্যু মানবী’ নামে। যুদ্ধক্ষেত্রে আহত হওয়ার পর তাকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়। সেখানে তার সাথে পরিচয় হয় তৎকালীন মার্কিন ফার্স্ট লেডি এলিনর রুজভেল্টের। দুই নারীর সেই বন্ধুত্ব এতটাই গভীর হয়েছিল যে বহু বছর পর স্নায়ুযুদ্ধের উত্তেজনাপূর্ণ সময়েও তারা একে অপরের সাথে দেখা করেছিলেন। পাভলিচেনকোর জীবন নিয়ে পরে নির্মিত হয় আলোচিত চলচ্চিত্র ব্যাটল ফর সেভাস্তোপল।
একুশ শতকে এসে স্নাইপারদের ঘিরে আরেকটি রহস্যময় নাম ছড়িয়ে পড়ে ইরাকে ‘জুবা’। মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় এই নামটি আতঙ্কের প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে দেখা যেত দূর থেকে একের পর এক মার্কিন সেনা গুলিবিদ্ধ হচ্ছে। কিন্তু জুবা আসলেই একজন ব্যক্তি ছিলেন কি না, তা আজও নিশ্চিত নয়। অনেক সামরিক বিশ্লেষকের মতে, জুবা ছিল একাধিক স্নাইপারের অভিযানের জন্য ব্যবহৃত একটি প্রতীকী নাম, যা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের অংশ হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল। তারপরও ‘বাগদাদের ভূত’ নামে পরিচিত এই রহস্যময় চরিত্র যুদ্ধ ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।
কিন্তু এখন যুদ্ধের চেহারা বদলে যাচ্ছে। ইউক্রেনের বিশেষ বাহিনীর সদস্য ভিয়াচেস্লাভ কোভালস্কি সেই পরিবর্তনের জীবন্ত উদাহরণ। ২০২৩ সালের শেষ দিকে তিনি এমন একটি গুলি ছুড়েছিলেন, যা প্রায় আড়াই মাইল দূরে থাকা এক রুশ কর্মকর্তাকে আঘাত করে।
ইউক্রেন দাবি করেছিল, সেটি ছিল বিশ্বের দীর্ঘতম সফল স্নাইপার শটগুলোর একটি। সেই ঘটনার পর তিনি জাতীয় বীরের মর্যাদা পান। তরুণ সৈন্যরা তার সাথে সেলফি তুলতে চাইত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ছবি ছড়িয়ে পড়েছিল।
কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই বাস্তবতা বদলে যায়। এখন তিনি আর নিয়মিত স্নাইপিং করেন না। তার প্রধান কাজ ড্রোন অপারেটরদের সহায়তা করা। বিস্ফোরক লাগানো, অবস্থানে পৌঁছে দেয়া, নেভিগেশনে সাহায্য করা- এসবই তার নতুন দায়িত্ব।
কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে এখন ড্রোন অনেক বেশি কার্যকর।
একজন স্নাইপার যত দূর দেখতে পারেন, একটি ড্রোন তার চেয়ে অনেক বেশি এলাকা পর্যবেক্ষণ করতে পারে। স্নাইপারের গুলি সরলরেখায় চলে, কিন্তু ড্রোন মোড় নিতে পারে, ভবনের আড়ালে যেতে পারে, লক্ষ্যবস্তুর ওপর সরাসরি বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।
সবচেয়ে বড় বিষয়, একটি ড্রোন ধ্বংস হলে হারায় কয়েক হাজার ডলারের যন্ত্র। কাজেই নতুন ড্রোন পেতে অসুবিধা হয় না। কিন্তু একজন স্নাইপার নিহত হলে হারিয়ে যায় বহু বছরের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একজন মানুষ। তার ঘাটতি পূরণ হতে দীর্ঘ দিন অপেক্ষা করতে হয়।
ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতে একজন স্নাইপার শত্রুর অবস্থান শনাক্ত করে কামান ইউনিটকে তথ্য পাঠাতেন। সেই তথ্য কাজে লাগাতে কয়েক মিনিট সময় লাগত। এখন ড্রোন অপারেটর নিজেই লক্ষ্য দেখে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আঘাত হানতে পারেন।
ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে স্নাইপারদের কাজও বদলে গেছে। তাদের আগের মতো দীর্ঘ সময় শত্রুর পেছনে লুকিয়ে থাকার প্রয়োজন কমেছে। বরং এখন ড্রোনের থার্মাল ক্যামেরা থেকে লুকিয়ে থাকা আরো কঠিন। শরীরের তাপও অবস্থান ফাঁস করে দিতে পারে।
তবে স্নাইপাররা পুরোপুরি হারিয়ে যাচ্ছেন না। ইউক্রেন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনী এখনো স্নাইপার প্রশিক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছে। কারণ খারাপ আবহাওয়া, কুয়াশা বা মেঘলা আকাশে ড্রোনের কার্যকারিতা কমে যায়। তাছাড়া পদাতিক বাহিনীর সাথে থেকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত আঘাত হানার ক্ষেত্রে এখনো স্নাইপারদের বিকল্প নেই।
তারপরও শত বছরের ইতিহাসের দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একসময় যুদ্ধক্ষেত্রের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর নিঃশব্দ অস্ত্র ছিল স্নাইপার। সিমো হাইহার বরফঢাকা বন, লুদমিলা পাভলিচেনকোর রাইফেল, কিংবা জুবার রহস্যময় ভিডিও- সবই সেই যুগের প্রতীক।
কিন্তু আজ যুদ্ধের আকাশে ঘুরে বেড়ানো ছোট্ট ড্রোনগুলো যেন নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। আর সেই অধ্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে বিশ্বের বহু অভিজ্ঞ স্নাইপার নিজেরাই বলছেন, যুদ্ধের ময়দানে হয়তো আর তাদের সময় নেই, সময় এখন ড্রোনের।
সূত্র : ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল