ব্রিটিশ এক অভিজাত রমণী উড়োজাহাজের টয়লেটে ঢুকে দ্রুত বের হয়ে আসেন। আকাশবালার কাছে কড়া গলায় নালিশ করেন, অসভ্যতার একটা মাত্রা থাকা উচিত। টয়লেটের জানালায় পর্দা নেই কেন? দুনিয়াতে বিকৃত বা অসভ্য মানুষের অভাব নেই। কেউ যদি বিমানের গা বেয়ে জানালা দিয়ে উঁকি দেয় কী হবে? আকাশবালার বিস্মিত হলেন। সাথে সাথেই সামলে নিলেন। তারপরও শান্ত স্বরে বললেন, ম্যাম, মাটি থেকে ৩৫ বা ৪০ হাজর ফুট উপর দিয়ে উড়ছে উড়োজাহাজ। সত্যিই যদি তার গা বেয়ে কেউ উঁকি মারতে পারে তবে তার দেখার অধিকার আছে! ভাগ্যিস, নাক উঁচু ব্রিটিশ এই নারী জানতে চাননি বিমানের কোন আসন নিরাপদ?
হ্যাঁ আপনি বা আমার মতো অনেকেই উড়োজাহাজে উঠে টয়লেটে পর্দা নেই কেনো জানতে চাই না। বরং জানালার কাছে আসন পেতে আগ্রহ দেখাই বেশি। হয়ত কেউ ভাবেনও না,এই প্লেনটা যদি ভেঙে পড়ে, তাহলে কোন আসনে বসলে বাঁচার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি? একবার এক যাত্রীর মুখে শুনেছিলাম, আমি পেছনের দিকে বসতে চাই। শুনেছি প্লেন দুর্ঘটনায় পেছনের আসন বেশি নিরাপদ। সত্যি কি তাই?
চলুন আজ এই রহস্যটাই খুঁটিয়ে দেখা যাক।
তার আগে একবার খতিয়ে দেখি আকাশপথ কি আদতেই ভয়ংকর? আমরা প্রায়ই খবরের চ্যানেলে দেখি,কোনো প্লেন উল্টে যাচ্ছে, জরুরি অবতরণ করছে বা হঠাৎ ঝড়ের কবলে পড়ে থরথর করে কাঁপছে। এসব দেখে কার না গা ছমছম করে? তারপরও বাস্তবতা হলো, আকাশপথ এখনকার সবচেয়ে নিরাপদ পরিবহন মাধ্যমগুলোর একটি।
অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলস-এর অ্যাভিয়েশন স্কুলের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর চেং-লুং উ বলেন, গাড়ি চালানোর চেয়ে প্লেনে চড়ার সময় মৃত্যু ঝুঁকি অনেক অনেক কম। কথাটা শুনতে হয়ত খারাপ লাগবে, ঢাকার বা বাংলাদেশের রাস্তায় বের হওয়ার চেয়েও বিমান যাত্রা তুলনামূলকভাবে অনেক অনেক নিরাপদ। প্রতিদিনিই মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার খবর পাই। অনেক খবর পড়ে মনে হয়, সড়ক দুর্ঘটনা নয়। এ হলো সড়ক নরহত্যা।
আবার উড়োজাহাজের কথায় ফিরি। আমেরিকার এক গবেষণা বলছে, প্রতিটি ফ্লাইটে মৃত্যুর আশঙ্কা ১৩.৭ মিলিয়নে মাত্র একজন। মার্কিন ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ড-এর পরিসংখ্যান আরও আশাজাগানিয়া। ২০০১ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ৯৪ শতাংশ যাত্রীবাহী বিমান দুর্ঘটনায় কোনো প্রাণহানি হয়নি। বিমান যাত্রা এতোই নিরাপদ যে সুদূর আলাকাস্কায় দুই ইঞ্জিনের বিমান দুর্ঘটনায় পড়লে সে খবর দুনিয়া জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। দুর্ঘটনা কম ঘটে বলেই এ সংবাদকে গুরুত্ব দেয়া হয়।
তারপরও প্রশ্নটা হলো, ধরুন, আল্লাহ না করুন, সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তখন প্লেনের কোন অংশটা সবচেয়ে নিরাপদ?
তার আগে হয়ত খতিয়ে দেখতে হবে প্লেন ভাঙে কেমন করে? উত্তরটা সোজা নয়। এমন প্রশ্নের উত্তরে ড্যাকোটার ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ডাকোটা-র অ্যাভিয়েশন সেফটি গবেষক ড্যানিয়েল কাওয়াসি অ্যাডজেকুম বলেন, সবকিছু নির্ভর করে প্লেন ভাঙার ধরন, বাসক্র্যাশ ডায়নামিক্স-এর উপর। একটা প্লেন যদি মাঝ আকাশে ফেটে যায় বা পুরোপুরি ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তাহলে আপনি কোথায় বসেছেন, তাতে আর কিছু আসেইযায় না। কিন্তু ধরুন, প্লেনটা ল্যান্ড করার সময় রানওয়ে থেকে ছিটকে গেল, খুব বেশি গতি নয়, মাঝারি ধাক্কা খেলেন। তখন কিন্তু ব্যাপারটা বদলে যায়। এ রকম ক্ষেত্রে, প্লেনটি ভেঙে সাধারণত দু'ভাগে ভাগ হয় যায়। সামনের অংশটা পুরো শক্তি নিয়ে এগিয়ে যায়, আর পেছনের অংশটা অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০১৫ সালে টাইম ম্যাগাজিনের এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফেডারেল অ্যাভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা এফএএ-এর (FAA) তথ্য অনুযায়ী, প্লেনের পেছনের এক-তৃতীয়াংশে মৃত্যুহার সবচেয়ে কম।
এবারের প্রশ্ন, প্লেনের ডানার পাশে বসা কি নিরাপদ? প্রফেসর উ আরেকটা জায়গার কথা বলেন, যা অনেকে ভুলে যান, প্লেনের ডানার আশপাশ। এই অংশটা গঠনতান্ত্রিকভাবে সবচেয়ে শক্ত। এই জায়গা খুব শক্তভাবে গড়া হয়, কারণ এখানে স্ট্রাকচারাল রিইনফোর্সমেন্ট বা বাড়তি সুরক্ষা থাকে। এখানকার সিটগুলো আবার সাধারণত *ইমার্জেন্সি এক্সিট* বা জরুরি নিগর্মনের কাছাকাছি, তাই দুর্ঘটনার পর দ্রুত বেরিয়ে পড়া যায়। তবে বিপদ একটাই, ডানার নিচে থাকে ফুয়েল ট্যাঙ্ক। যদিও নিয়ম অনুযায়ী, ল্যান্ড করার আগে জ্বালানি ফাঁকা করে দেয়ার কথা, কিন্তু তাতেও কিছু ঝুঁকি থেকেই যায়। ধোঁয়া উঠতে পারে, এমনকি আগুনও লাগতে পারে। তাই অ্যাডজেকুমের পরামর্শ, জরুরি অবস্থায় ৯০ সেকেন্ডের মধ্যে উড়োজাহাজ ছাড়তে না পারলে ঝুঁকি বাড়ে। তার মানে, লাগেজ নিয়ে ব্যস্ত হবেন না, ভিডিও করতে যাবেন না। দ্রুত পায়ে তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে পড়ুন।
তাহলে আমার বা আপনাকে কী করতে হবে? সবচেয়ে আগে মনে রাখবেন, প্লেনে ওঠার পর সেফটি ভিডিও মন দিয়ে দেখুন। সিটবেল্ট বেধে রাখুন। কেবিন ক্রুর নির্দেশ শুনুন। আর একটা সহজ কৌশল জানিয়ে দিচ্ছেন প্রফেসর উ, আপনার সিট থেকে সবচেয়ে কাছের ইমার্জেন্সি এক্সিট-টা কতটা দূরে, সেটা জেনে নিন। ধোঁয়ার ভেতর দেখার সুযোগ না-ও থাকতে পারে, তখন হাতে গুনে এক-দুই-তিন করে আপনি বেরিয়ে যেতে পারবেন।
শেষ কথা কথাটি হলো, সুতরাং, আপনি যখন পরের বার বিমানে উঠবেন, তখন শুধু খাবার মেনু আর সিনেমার তালিকা নয়—দৃষ্টি রাখুন আশেপাশে। কোথায় দরজা, কোথায় সিটবেল্ট, কেমন সিটে আপনি বসে আছেন—এসব খেয়াল রাখুন। বিমান ভ্রমণ নিশ্চিন্ত হওয়ার কথা। তবে একটু সচেতনতা জীবন বাঁচাতে পারে।
আর যদি কেউ জিজ্ঞেস করে—"বিমানের সবচেয়ে নিরাপদ সিট কোনটা?"
আপনি হেসে বলবেন, পেছনের দিকে জানালার পাশে, ডানার একটু পেছনে... আর হ্যাঁ, মন দিয়ে সেফটি ব্রিফিং শুনলে, যেকোনো বিমানের যেকোনো আসনই হতে পারে সবচেয়ে নিরাপদ!
উড়োজাহাজসহ যে কোনো যানবাহনে ওঠার আগে অনেকেই দোয়া পড়েন। এটাও একটা ভালো অভ্যাস।