টেলিযোগাযোগ খাতে করের বোঝা কমানো, মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড সেবার মান উন্নয়ন, শক্তিশালী ডিজিটাল পাবলিক অবকাঠামো গড়ে তোলা, এআই-ভিত্তিক দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং ইলেকট্রনিকস উৎপাদন সম্প্রসারণকে সরকারের পাঁচটি অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।

রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স (অ্যামচেম) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের ডিজিটাল ভবিষ্যতের পথে অগ্রযাত্রা : উদ্ভাবন, বিনিয়োগ ও আইসিটি-নির্ভর প্রবৃদ্ধির নীতিগত অগ্রাধিকার’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

উপদেষ্টা বলেন, বৈশ্বিক গড় ২২ থেকে ২৭ শতাংশের তুলনায় বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতে কার্যকর করের বোঝা ৫১ দশমিক ৫৬ শতাংশ। এ খাতে পাঁচ বছর মেয়াদি কর কাঠামোর আওতায় ধারাবাহিক ও ভবিষ্যৎমুখী নীতি প্রণয়নের প্রয়োজন রয়েছে। তিনি সিম কর প্রত্যাহারের বিষয়টিও তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, গ্রাহকসংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে সপ্তম অবস্থানে থাকলেও মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড সেবার মানের ক্ষেত্রে দেশ এখনো পিছিয়ে রয়েছে। এ অবস্থার উন্নয়নে সেবার মান ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি, ওয়ান ডিজিটাল ওয়ালেট’ উদ্যোগের আওতায় শক্তিশালী ডিজিটাল পাবলিক অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। এ ক্ষেত্রে এস্তোনিয়ার এক্স-রোড প্ল্যাটফর্ম অনুসরণ করা হবে এবং প্রতিটি নাগরিকের ডিজিটাল পরিচয় ব্যাংক হিসাব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাথে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এআই, সাইবার নিরাপত্তা ও ডেটা বিষয়ে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২৩ হাজার থেকে ৩০ হাজার প্রকৌশল ও বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক বের হন। তাদের এসব বিষয়ে দক্ষ করার পাশাপাশি স্কুল পর্যায়ের পাঠ্যক্রমেও বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

ইলেকট্রনিকস উৎপাদন খাত সম্প্রসারণে পোশাকশিল্পের মতো প্রণোদনা দেয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি ভিয়েতনামের উদাহরণ দেন। তিনি বলেন, এক দশকে দেশটির কনজিউমার ইলেকট্রনিকস রফতানি ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে ২১৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।

জাতিসঙ্ঘ ও আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) একটি গবেষণার উল্লেখ করে রেহান আসিফ আসাদ বলেন, ব্রডব্যান্ডের বিস্তার ১০ শতাংশ বাড়লে জাতীয় জিডিপিতে প্রায় ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে।

অনুষ্ঠানে অ্যামচেমের সভাপতি ও মাস্টারকার্ডের সহ-সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন অনুমোদনের জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানান। তিনি ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট নির্মাতাদের কর অব্যাহতি এবং কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস ও সেমিকন্ডাক্টর-সংশ্লিষ্ট উপকরণের ওপর শুল্ক সুবিধাকে স্বাগত জানান।

তিনি প্রযুক্তি কোম্পানি ও স্টার্টআপের বৈদেশিক অর্থপ্রবাহ ও আন্তর্জাতিক লেনদেন সহজ করা, আইএসপি খাতের টার্নওভার কর বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা এবং নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আরো সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানান।

অ্যামচেমের আইসিটি সাবকমিটির চেয়ারম্যান ও ওরাকল বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের কান্ট্রি ম্যানেজিং ডিরেক্টর রুবাবা দৌলার সঞ্চালনায় সংলাপে ডিজিটাল অর্থনীতি, ডিজিটাল অবকাঠামো, এআই, উদ্ভাবন ও দক্ষতা উন্নয়ন এবং সরকার-শিল্পখাতের অংশীদারত্ব নিয়ে আলোচনা হয়।

সভায় মেট্রো ও টোল ব্যবস্থায় ওপেন-লুপ টিকিটিং, আন্তর্জাতিক পেমেন্ট নেটওয়ার্কের জন্য বাংলা কিউআর চালু, ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান ওয়ালেট’ উদ্যোগ, স্টার্টআপ স্যান্ডবক্স, পাবলিক ক্লাউড ব্যবহারের সুযোগ, জাতীয় তথ্য ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ গঠন, ডিজিটাল স্বাক্ষর ও ইলেকট্রনিক চুক্তি এবং জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা জোরদারের প্রস্তাব উঠে আসে।

এসব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ জানান, আরএফআইডি-ভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় টোল আদায় ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালু রয়েছে। আন্তর্জাতিক অর্থপ্রবাহের জন্য বাংলা কিউআর উন্মুক্ত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্মত হয়েছে। ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি’ প্ল্যাটফর্ম দেশী ও বিদেশী উভয় পেমেন্ট নেটওয়ার্কের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। স্টার্টআপ স্যান্ডবক্সের বিধানগুলো স্টার্টআপ কমিউনিটির সাথে পরামর্শ করে পরিমার্জন করা হবে।

জাতীয় সাইবার নিরাপত্তাকে তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, চলতি বছরের চতুর্থ প্রান্তিকে সরকার, বেসরকারি খাত, শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের সমন্বয়ে একটি যৌথ দলের মাধ্যমে জাতীয় এআই নীতি প্রণয়নের কাজ শুরু হবে।

সাবমেরিন কেবল সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন উপদেষ্টা। তিনি জানান, বর্তমানে বাংলাদেশের সাবমেরিন কেবল সক্ষমতা ৬ টেরাবাইটের বিপরীতে সর্বোচ্চ জাতীয় চাহিদা ১২ টেরাবাইটে পৌঁছেছে এবং প্রতি দুই বছরে ডেটা ট্রাফিক দ্বিগুণ হচ্ছে। নতুন সাবমেরিন কেবল স্থাপনে দুই থেকে তিন বছর সময় লাগে উল্লেখ করে তিনি ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে সিটিব্যাংক এনএ, সিসকো, এইচএসবিসি, মাস্টারকার্ড, মেটলাইফ, পাঠাও, পিডব্লিউসি, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, শপআপ ও ভিসাসহ অ্যামচেমের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

অ্যামচেমের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও মেটলাইফ বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলা উদ্দিন আহমেদ, মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তারাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। সূত্র : বাসস