স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের (গ্রাজুয়েশন) সময়সীমা ছয় বছর বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলেছেন, আগামী বছর বাংলাদেশের এলডিসি গ্রাজুয়েশনে যাওয়া হবে ভুল সিদ্ধান্ত, ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের বেসরকারি খাত।

বৃহস্পতিবার ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশ (আইসিসিবি) আয়োজিত ‘এলডিসি গ্রাজুয়েশন: সাম অপশনস ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক সেমিনারে এ দাবি জানান ব্যবসায়ী নেতারা।

সূচনা বক্তব্যে আইসিসিবি সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ এখনো এলডিসি গ্রাজুয়েশনে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত নয়। মুক্ত বাণিজ্যে বাংলাদেশের দর কষাকষির সক্ষমতা, রফতানি বৈচিত্র্য, শিল্পখাতে দক্ষ মানবসম্পদ, বিদেশী বিনিয়োগ আনা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু সহনশীলতা সৃষ্টি না করেই এলডিসি গ্রাজুয়েশন দেশের অর্থনীতিকে বিপদের মুখে ফেলবে।

মাহবুব জানান, এলডিসি গ্রাজুয়েশনের প্রথম ঝাপটা আসবে শুল্ক বৃদ্ধির ওপর। জিএসপিসহ অন্যান্য সুবিধা হারালে দেশে রফতানি ৬ থেকে ১৪ শতাংশ কমে আসবে।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গবেষণা সংস্থা দ্য থার্ড ওয়ার্ল্ড নেটওয়ার্কের (টিডব্লিউএন) লিগ্যাল অ্যাডভাইজার ও গবেষক সানিয়া রেইড স্মিথ।

তিনি বলেন, অনেক দেশই এলডিসি গ্রাজুয়েশনের সক্ষমতা অর্জনের পরেও পিছু হটেছে। অ্যাঙ্গোলার মতো দেশ গ্রাজুয়েশনের এক সপ্তাহ আগে প্রক্রিয়া থেকে সরে এসেছে। মিয়ানমারের ২০২৪ সালে গ্রাজুয়েশন হওয়ার কথা থাকলেও তারা আগ্রহ দেখায়নি।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রিজ (বিএপিআই) সভাপতি আবদুল মুক্তাদির জানান, দেশের ওষুধ শিল্প কঠিন সময় পার করছে। শীর্ষ ১০০ কোম্পানির মধ্যে ৩০ শতাংশ কোম্পানিই বাজারে টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে। পেটেন্ট বাধ্যবাধকতা না থাকায় বর্তমানে অনেক দুর্মূল্য ওষুধ কম দামে পাওয়া গেলেও এলডিসি গ্রাজুয়েশনের পর দাম বাড়বে ১০ গুণ। কয়েক শ’ টাকার হেপাটাইটিস-বি টিকার দাম হবে এক হাজার ডলার।

অভিযোগ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এলডিসি গ্রাজুয়েশনে কোন কোন ওষুধে কী প্রভাব পড়বে, দাম কেমন হবে, পেটেন্ট পাওয়া কতটা কঠিন হবে সব তালিকা বিআইপির হাতে আছে। সরকারকে বার বার বলার পরেও তাদের সাথে বসা যাচ্ছে না, আগ্রহ দেখাচ্ছে না তারা। যে ওষুধ শিল্প এখন বছরে ৩তিনবিলিয়ন ডলার রফতানি আনে- এ শিল্পের ওপর গুরুত্ব দিলে আয় দ্বিগুণ হতো।’

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফেকচারস অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, বাংলাদেশ অবশ্যই এলডিসি গ্রাজুয়েশনে যাবে, তবে এখন নয়। দেশের প্রস্তুত হতে আরো সময় দরকার। দেশের জ্বালানি খাতের এমন করুণ দশার মধ্যে কোনো সমাধান না নিয়ে এলডিসি গ্রাজুয়েশনে গেলে পোশাক খাতে ধস নামবে।

‘যদিও এক বছরে ব্যাংকের রিজার্ভ বেড়েছে; এলএনজি আমদানি পর্যাপ্ত ডলার আছে, কিন্তু যথেষ্ট পরিমাণ এলএনজি আমদানির সক্ষমতা বাংলাদেশের নেই। গভীর সমুদ্র বন্দর এখনো প্রস্তুত হয়নি- এলএনজি আমদানি সহজ করতে আগে গভীর সমুদ্র বন্দরের কাজ শেষ করতে হবে,’ জানান তিনি।

লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফেকচারারস অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এলএফএমইএবি) সভাপতি নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘ছয় বছরের আগে এলডিসি গ্রাজুয়েশনে যাওয়া বাংলাদেশের জন্য আত্মঘাতী হবে। ২০২৬ সালের নভেম্বরে কোনোভাবেই বাংলাদেশ এলডিসি গ্রাজুয়েশনে যাওয়া উচিত হবে না। গ্রাজুয়েশনের জন্য ২০৩২ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত।’

তিনি জানান, দিনকে দিন বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারাচ্ছে। জাহাজ ভাড়ার কারণে রফতানি খাতে প্রতিটি ব্যবসায়ী বিপদে। বাংলাদেশের মতো এত জাহাজ ভাড়া অন্য কোনো দেশকে দিতে হয় না। এ অবস্থায় এলডিসি গ্রাজুয়েশনে যাওয়ার সক্ষমতা থাকলেও ভবিষ্যতের জন্য এটি ভুল সিদ্ধান্ত।

ঢাকা চেম্বার অ্যান্ড কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, ‘দেশের রফতানির ৯০ শতাংশ ওষুধ, পোশাক ও চামড়াখাতে। এ খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন গ্রাজুয়েশনের জন্য ছয় বছর অপেক্ষা করতে হবে, সেটি সরকারের ভেবে দেখা উচিত। আর এর চেয়েও ভালো কোনো প্রস্তাব সরকারের হাতে থাকলে তাদের উচিত ব্যবসায়ীদের সাথে বসা।’

ব্যবসায়ী নেতাদের সাথে সায় দিয়ে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনোমিক মডেলিং (সানেম)- এর নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, সরকার, আমলা এবং ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে একটি সিদ্ধান্তে দ্রুত আসা উচিত। বাংলাদেশের সাথে আগামী বছর নেপালও এলডিসি গ্রাজুয়েশনে যাবে, তাদের সাথেও সমন্বয় জরুরি।

‘ব্যাংকিং খাত বাদে দেশের অন্যান্য অর্থনৈতিক খাতে উল্লেখযোগ্য সংস্কার আসেনি। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে নানান বিষয় নিয়ে আলাপ হলেও অর্থনৈতিক সংস্কারের বিষয়টি কেউ আমলে নেয়নি। শ্বেতপত্র কমিটির বেশিরভাগ সুপারিশই গ্রহণ করা হয়নি। এ অবস্থায় সংস্কার ছাড়া এলডিসিতে গেলে দেশের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ও বিনিয়োগে বিপদের মুখে পড়বে,’ শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, এলডিসির জন্য বাংলাদেশ যতটা না অর্থনৈতিক বিবেচনায় এগিয়েছে, তার থেকেও এর পেছনে রাজনৈতিক কারণ ছিল বড়। বিগত সময়ের রাজনৈতিক সাফল্য দেখাতে সক্ষমতা ও প্রস্তুতি ছাড়াই এলডিসি গ্রাজুয়েশন ভালো ফল বয়ে আনবে না।

২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের এলডিসি গ্রাজুয়েশনে যাওয়ার কথা। এলডিসি গ্রাজুয়েশনে গেলে এতদিন স্বল্পোন্নত দেশ হিসাবে বাংলাদেশ যে শুল্ক ও পেটেন্ট সুবিধা পেত তা আর বলবৎ থাকবে না।

এ অবস্থায় পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি নিয়ে এলডিসি গ্রাজুয়েশনে যাওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা।

সূত্র : ইউএনবি