ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ডায়াগনস্টিক মেডিক্যাল ইক্যুইপমেন্ট এক্সপোর উদ্বোধন
‘‘ডায়াগনস্টিকের একই মেশিন বেসরকারি ও সরকারি ক্ষেত্রে একরকম হয় না। বাংলাদেশের সবকিছুর দাম যদি জানা যায় তাহলে কেন যন্ত্রপাতির দাম জানা যাবে না?’’
বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো বৃহৎ পরিসরে ঢাকা আগারগাঁও চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে তিন দিন ব্যাপি ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ডায়াগনস্টিক মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট এক্সপো-২০২৫ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ এপ্রিল) সকালে এ মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো: সায়েদুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো: হাফিজুর রহমান, বৈষম্যবিরোধী সংস্কার পরিষদের আহবায়ক জাকির হোসেন নয়ন, BPHCDOA এর মহাসচিব ডা. মইনুল আহসান।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি বলেন, চিকিৎসা ক্ষেত্রে মেজিস্ট্রেসি সেক্টরটি খুবই জটিল। ডায়াগনস্টিক ও চিকিৎসা সেবার জন্য প্রশাসনের সাথে মেডিক্যাল ইন্সপেক্টর থাকতে হবে। ডায়াগনস্টিকের একই মেশিন বেসরকারি ও সরকারি ক্ষেত্রে একরকম হয় না। বাংলাদেশের সবকিছুর দাম যদি জানা যায় তাহলে কেন যন্ত্রপাতির দাম জানা যাবে না?
তিনি আরো বলেন, হাসপাতালগুলোতে যেন হাসপাতাল ফার্মেসি থাকে। সেটা যেন ওষুধের দোকান হয়ে না ওঠে। লিকুইড ডিসপোজাল গাফিলতি কেন হচ্ছে সেটা দেখা উচিত।
সায়েদুর রহমান বলেন, সকল ধরনের রেইডে স্বাস্থ্য ইন্সপেক্টর থাকা উচিত। সাথে রেফারেল সিস্টেম ঠিক করা উচিৎ। একজন ডাক্তার দিনে ১০০ রোগী দেখবে, এটা যেমন ঠিক নয়, আবার রোগীরাও এতে মাইন্ড করে। এখানে ইন্টারকারেকশন ঠিক করে নিয়মের মধ্যে আনতে হবে।
তিনি আরো বলেন, অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস একটা বড় প্রশ্ন উঠেছে। এখানে যারা গাড়ি চালান তারা কতটুকু প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত? তারা ঠিকঠাক সেবা দেবার সামর্থ্য রাখেন কিনা সেটা জানতে হবে। চিকিৎসার শুরুটাই হয় অ্যাম্বুলেন্স সেবার মাধ্যমে। নয়তো এটা কেবল একটা মাইক্রোবাস হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশের চিকিৎসা সেবাকে ডিসেন্ট্রালাইজড করার বিষয় তিনি বলেন, চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলো সেন্ট্রালাইজড হয়ে গেছে। ঢাকায় বিভিন্ন হাসপাতাল রয়েছে ভালো সেবা দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নীলফামারী, ঠাকুরগাঁওয়ের কোন রোগী হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক করলো, তাকে সিপিআর দিয়ে বাঁচানো হলেও ঢাকা পর্যন্ত আসতে অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। তাই ভালো চিকিৎসার জন্য অবশ্যই জেলা শহরগুলোতেও চিকিৎসা সেবার মান ভালো করতে হবে। তাই চিকিৎসা সেবারকে সারা দেশেই ডিসেন্ট্রালিজড করতে হবে।
সরকারি বেসরকারি এবং বিশেষায়িত হাসপাতাল নিয়ে প্রধান অতিথি বলেন, আবার বিশেষায়িত হাসপাতাল যেমন ক্যান্সার হাসপাতালের সাথে অন্যান্য হাসপাতালের একটা পার্থক্য থাকবে। এগুলোতে আইনি রিফ্লেকশন থাকা দরকার এবং যখন ভিজিট করবে তখনও রিফ্লেকশন যেন দেখা যায়। উন্নত দেশসহ আশেপাশের দেশগুলোতে এমন নিয়ম আছে। এই ডিটেইল কাজগুলো যেন হয় এজন্য অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল থাকা জরুরি। মেডিক্যাল কলেজ নিয়ে অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল ইতোমধ্যে কাজ করছে। তারা ইতোমধ্যেই সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল নির্বিশেষে মেডিক্যাল কলেজ করার পক্ষে কাজ করে যাচ্ছে। আমিও পার্সোনালি মনে করি এখানে সরকারি বেসরকারি হওয়া উচিত না। এটা আমি মনে করি আইনিভাবে প্রক্রিয়ায় আনা দরকার।
এই মেলায় চীন, জাপান, পাকিস্তান, ভারত, কোরিয়া ও বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশ থেকে প্রায় দুই শতাধিক মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট প্রস্তুতকারক কোম্পানি তাদের পন্য প্রদর্শন করেন।
জানা যায়, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে মাথাপিছু খরচ দাঁড়াবে আনুমানিক ৬০ ডলার। যা ২০২০ সালের তুলনায় ১৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গত দুই দশকে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোর উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ ঘটেছে। নিবন্ধিত বেসরকারি হাসপাতালের সংখ্যা চারগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। যা ১ হাজার ১২৫ থেকে ৪ হাজার ৪৫২ এ পৌঁছেছে। ক্লিনিকগুলির সংখ্যা তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ৪১১ থেকে বেড়ে ১ হাজার ৩৯৭, ডেন্টাল ক্লিনিকগুলোতে প্রায় সাতগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ১২২ থেকে ৮৩৯টি হয়েছে। অন্যদিকে ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো ছয়গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ৭৭৮ থেকে বেড়ে ১০ হাজার ২৯১টি হয়েছে।
এছাড়াও প্রতিবছর চিকিৎসা ব্যায় আনুপাতিক হারে বাড়ছে। ২০২০ সালে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় ছিল ৫১ ডলার, যা ২০১৯ সালের তুলনায় ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ বেশি। ২০১৯ সালে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় ছিল ৪৮ ডলার, যা ২০১৮ সালের তুলনায় ৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ বেশি। ২০১৮ সালে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় ছিল ৪৫ ডলার, যা ২০১৭ সালের তুলনায় ৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ বেশি। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় ছিল ৪২ ডলার, যা ২০১৬ সালের তুলনায় ৬ দশমিক ৮৭ শতাংশ বেশি। প্রতিবছর এভাবেই স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় বাড়ছে।
এই মেলায় সেমিনার এবং নির্মাতাদের সাথে সরাসরি ব্যবসায়ী থেকে ব্যবসায়ী এবং ব্যবসায়ী থেকে কাষ্টমার যোগাযোগের ব্যবস্থা রয়েছে। যেখানে অংশগ্রহণকারীরা ডায়াগনস্টিক চিকিৎসা সরঞ্জাম খাতে আধুনিক প্রযুক্তি ও এর ব্যবহার এবং নবনির্মিত প্রযুক্তি সম্পর্কে জানতে পারবেন, সাথে বাজার সম্ভাবনাও প্রসারিত হবে।
আয়োজক ইকো এক্সপোর মতে, "ঢাকা আন্তর্জাতিক ডায়াগনস্টিক মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট এক্সপো - ২০২৫" হল সর্বশেষ আধুনিক প্রযুক্তি, সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং ডায়াগনস্টিক মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট সেক্টরের প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। স্বাস্থ্যসেবার জন্য একটি স্বাস্থ্যকর এবং প্রযুক্তিতে উন্নত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নেয়ার যাত্রায় বিশেষ ভুমিকা রাখবে।
এই মেলা আগামী ১৯ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত চলবে।