নির্বাচন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার আসলে কী ভাবছে কিংবা তাদের অবস্থান কী, সেটা স্পষ্টভাবে জানতে আগামী সপ্তাহে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের সাথে দেখা করবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।

সোমবার (৭ এপ্রিল) রাতে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এমন সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, গত কয়েক মাস ধরে বিএনপি নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপের যে দাবি জানিয়ে আসছিল, সে ব্যাপারে একটি স্পষ্ট দিক-নির্দেশিকা পেতেই ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে সাক্ষাৎ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্থায়ী কমিটি। বর্তমানে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর চিকিৎসরা জন্য সিঙ্গাপুরে রয়েছেন। আগামী সপ্তাহে তার দেশের ফেরার কথা রয়েছে। বিএনপির মহাসচিব দেশে ফেরার পর প্রধান উপদেষ্টার সাথে নির্বাচনী রোডম্যাপ ইস্যুতে সাক্ষাৎ করবে বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল। সেখানে নির্বাচন নিয়ে বিএনপির অবস্থান ও সংশয়ের বিষয় প্রধান উপদেষ্টাকে জানাবে দলটি। একইসাথে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিএনপির যে মতামতও তুলে ধরা হবে। এরপরই দলীয় পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করবে বিএনপির হাইকমান্ড। এক্ষেত্রে তারা দু’-একটি কর্মসূচির দিকেও যেতে পারে।

স্থায়ী কমিটির বৈঠক অংশ নেয়া দু’জন সিনিয়র সদস্য বলেন, ‘সরকারের উচিত নির্বাচনের সাথে সংশ্লিষ্ট সংস্কারগুলো দ্রুত সম্পন্ন করা এবং চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচন সম্পন্ন করা। নির্বাচনকেন্দ্রিক যত সংস্কার রয়েছে, সেগুলো সরকার একটা অধ্যাদেশের মাধ্যমে করতে পারে। বাকি সংস্কারগুলো একটা রাজনৈতিক ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে পরবর্তী নির্বাচিত সংসদ করবে।’

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, ‘আমরা আশা করছি, সরকার তার কথা রাখবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন দেবে। ড. ইউনূসের মন পরিচ্ছন্ন। তিনি নির্বাচন দিতে চান। কিন্তু তার আশেপাশে সুবিধাভোগী-উচ্ছিষ্টভোগী একদল লোক আছে, যারা আওয়ামী লীগের আমলেও সুবিধা ভোগ করেছে, এখনো ভোগ করছে, আগামী দিনেও ভোগ করবে। এরা প্রশাসন, সচিবালয়, বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ভেতরে-বাইরে সব জায়গাতেই আছে। এমনকি ড. ইউনূসের কিচেন ক্যাবিনেটেও আওয়ামী লীগের লোক রয়ে গেছে। তিনি যদি শক্ত না থাকেন তবে এসব সুবিধাভোগীরা তাকে সহজে ক্ষমতা ছাড়তে দেবে না।’

বৈঠকে ফিলিস্তিনের ওপর ইসরায়েলের বর্বরতা ও গণহত্যার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে বিএনপির নীতিনির্ধাকরা। তারা দ্রুত এই নৃশংসতা বন্ধের দাবিও জানিয়েছে। একইসাথে নিরীহ ফিলিস্তিনিদের ওপর এই বর্বর হামলা ও গণহত্যার বিরুদ্ধে দলীয়ভাবে দু’-এক দিনে রাজধানীতে বড় ধরনের বিক্ষোভ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে বৈঠকে। ফিলিস্তিন ইস্যুতে বিএনপির অঙ্গ সংগঠনগুলো ইতোমধ্যে নানান কর্মসূচি পালন করছে। এই ইস্যুতে এবার বিএনপিও কেন্দ্রীয়ভাবে কর্মসূচি নেবে। এর অংশ হিসেবে চলতি সপ্তাহেই রাজধানীতে বিক্ষোভ হতে পারে। যেখানে ব্যাপক অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ইসরাইল বর্বরতার প্রতিবাদ জানাবে দলটি।

এছাড়া আগামী ১২ এপ্রিল শনিবার ফিলিস্তিনের গাজায় সংঘটিত শতাব্দীর বর্বরোচিত গণহত্যার প্রতিবাদে ‘প্যালেস্টাইন সলিডারিটি মুভমেন্ট বাংলাদেশ’ এর পক্ষ থেকে রাজধানীতে ‘মার্চ ফর গাজা’ শিরোনামে এক বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ ও গণজমায়েতের ডাক দেয়া হয়েছে। শাহবাগ থেকে শুরু হয়ে মানিক মিয়া এভিনিউয়ে গিয়ে এই কর্মসূচি শেষ হবে। ওই কর্মসূচিতে সংহতি জানাবে বিএনপি এবং দলটির নেতাকর্মীরা ব্যাপক আকারে সেখানে অংশ নিতে পারেন।

ওই সূত্র আরো জানায়, আগামী ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখে দেশীয় সংস্কৃতি ফুটিয়ে তুলতে দলীয়ভাবে নানা কর্মসূচি হাতে নেবে বিএনপি। ফ্যাসিবাদমুক্ত পরিবেশে এবার পরিসরে উদযাপনের চিন্তা করছে হাইকমান্ড। সেদিন র‌্যালি থেকে শুরু করে মেলাসহ সাংস্কৃতিক বিভিন্ন অনুষ্ঠান হবে। দেশব্যাপী জেলা ও উপজেলায়ও দলীয়ভাবে এই কর্মসূচি পালিত হবে।

স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বেশ কয়েকটি অ্যাজেন্ডা নিয়ে আলোচনা হয়। এর মধ্যে নির্বাচনী রোডম্যাপ ও সংস্কারের ইস্যু ছিল অন্যতম। বিএনপি গত ২৩ মার্চ জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের কাছে পাঁচটি সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনার ওপর দলীয় মতামত জমা দিয়েছে। সেখানে সংস্কারের পক্ষেই দলটির মতামত রয়েছে। সংস্কার ইস্যুতে তারা যে সরকারকে সহযোগিতা করছে, সে বিষয়ে দলটি তাদের অবস্থান বারবার ব্যক্ত করছে। বৈঠকে একাধিক সদস্য বলেন, ‘বিএনপি যেহেতু এই সরকারকে নানানভাবে সহযোগিতা করছে এবং আগামীতেও করবে; সে কারণে নির্বাচনী রোডম্যাপ ইস্যুতে তারা বড় ধরনের কোনো কর্মসূচিতে যেতে চান না।’

বিএনপির নীতি-নির্ধারকদের প্রত্যাশা, অন্তর্বর্তী সরকার দেশের বাস্তবতা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক চাওয়া-এগুলো বিবেচনায় নিয়ে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করবেন। বিএনপি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচন চায়। দলটি মনে করে, দ্রুত নির্বাচন হলে দেশে বিদ্যমান নানা সঙ্কট ধীরে ধীরে কেটে যাবে এবং দেশে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।

বৈঠকে বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় ফ্রান্সে অবস্থানরত পিনাকী ভট্টাচার্যের যে বিষোদগার এবং নানা নেতিবাচক মন্তব্য, সেটা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে দু’জন সদস্য নেতা বলেন, ‘পিনাকী হয়তো কারো উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য কারো অ্যাজেন্ট হয়ে এ ধরনের কাজ করে থাকতে পারেন। এটাকে এতো গুরুত্ব দেয়ার কিছু নেই। এছাড়া বিএনপির নিম্ন সারির নেতাদের কেউ কেউ সাম্প্রতিক সময়ে টকশোসহ বিভিন্ন জায়গায় যে উল্টো-পাল্টা কথা বলছেন, সেটা নিয়েও আলোচনা হয়েছে বৈঠকে।’ তখন একজন নেতা বলেন, ‘এ ধরনের কথাবার্তায় এক ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে। তাই এ ব্যাপারে দলের একটা গাইডলাইন দেয়া উচিত।’

পবিত্র ঈদুল ফিতরের পর এটি ছিল দলটির নীতি-নির্ধারকদের প্রথম বৈঠক। গত সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে ভাচ্যুর্য়ালি শুরু হয়ে চলে প্রায় আড়াই ঘণ্টাব্যাপী। এতে লন্ডন থেকে ভাচ্যুর্য়ালি যুক্ত হয়ে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৈঠকে আরো উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (ভার্চুয়ালি), স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান (ভার্চুয়ালি), নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু (ভার্চুয়ালি), বেগম সেলিমা রহমান, মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম) ও ডা: এ জেড এম জাহিদ হোসেন (ভার্চুয়ালি)।