শেষ পর্যন্ত ভাংছে খামারবাড়ির শক্তিশালী কর্মচারী সিন্ডিকেট! দীর্ঘদিন ধরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (ডিএই) প্রধান কার্যালয়ে ঘেঁড়ে বসা এই সিন্ডিকেটের হোতা বাজেট অফিসার তাইজুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বদলি করা হয়েছে আরেকজনকে। বদলিসহ শাস্তির তালিকায় রয়েছেন আরো ১১ কর্মচারি। যাদের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তদন্তেও বিষয়গুলো উঠে এসেছে। তদন্ত রিপোর্টের আলোকে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে ডিএই।

বিগত শেখ হাসিনা সরকারের সময় খামারবাড়িতে গড়ে ওঠে শক্তিশালী কর্মচারি সিন্ডিকেট। নিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়নসহ খামারবাড়ির নানা অনিয়মের সাথে জড়িয়ে পড়েন বঙ্গবন্ধু কর্মচারি পরিষদের নেতারা। দৈনিক নয়া দিগন্তসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসব নিয়ে খবর প্রকাশিত হয়। তাদের কেউ কেউ অবসরে গেছেন। ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার আন্দোলনে দেশ স্বৈরাচারমুক্ত হয়। খামারবাড়ির প্রভাবশালী বিসিএস কৃষি কর্মকর্তাদের ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছে কয়েক মাসে। অনেকের বিরুদ্ধে মামলাও রুজু হয়েছে।

কিন্তু, খামারবাড়িতে সরাসরি আওয়ামী রাজনীতি করা কর্মচারী সিন্ডিকেট বহাল তবিয়তে রয়েছেন। তাদের অনেকেই জয় বাংলার পরিবর্তে জিন্দাবাদ শ্লোগান তুলে রঙ পাল্টানোর চেষ্টায় রয়েছেন। তাদের কারো কারো আবার প্রকল্পসহ ভাল জায়গায় পোস্টিংও হয়েছে। ফলে সিন্ডিকেটের রাহু থেকেই যায় খামারবাড়িতে। দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে কোটি কোটি টাকা অর্জনসহ নানা অভিযোগে বঙ্গবন্ধু কর্মচারি পরিষদের নেতা তাউজুল ইসলামসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে কৃষি মন্ত্রণালয় তদন্ত করে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত এপ্রিল মাসে প্রতিবেদন জমা দেন কমিটির প্রধান অতিরিক্ত সচিব ড. মাহমুদুর রহমান।

গত মে মাসের শেষের দিকে সেই প্রতিবেদনের আলোকে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে কৃষি সচিবের অনুমোদিত চিঠি দেয়া হয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরকে। জানা যায়, ২৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও তদন্তে ১৩ জনের অনিয়ম-দুর্নীতির নানা অভিযোগ প্রমাণ পায় কৃষি মন্ত্রণালয়। এদের মধ্যে ডিএই’র সাবেক ভারপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক (অর্থ) তাইজুল ইসলামকে বরখাস্ত করা হয়েছে। খামারবাড়ি থেকে হবিগঞ্জ জেলায় বদলি করা হয়েছে তাইজুল ইসলামের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে পরিচিত দিদারুল আলমকে (রাসেল)। জানা যায়, চাকরিতে যোগদানের শুরু থেকেই তিনি প্রায় ২০ বছর ধরে ডিজি বা প্রশাসন উইংয়ে কর্মরত ছিলেন। ডিএই মহাপরিচালকের ব্যক্তিগত সহকারী হওয়ার সুবাধে বদলি ও কর্মচারী নিয়োগ বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। ব্যক্তিগত সহকারীর পাশাপাশি দ্বিতীয় শ্রেণির প্রটোকল অফিসারের পদটিও বাগিয়ে নেন রাসেল।

খামারবাড়ি সূত্র জানায়, বিগত আওয়ামী সরকারের শুরুর দিকে খামারবাড়ির সবচেয়ে প্রভাবশালী কর্মচারী ছিলেন শরীফুল ইসলাম। ডিএই’র গুরুত্বপূর্ণ সহকারী পরিচালকের (অর্থ) দায়িত্ব পেয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে নিয়োগ,পদোন্নতি, সারাদেশে অর্থ বরাদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। শেষ পর্যন্ত দুদকের মামলায় বরখাস্ত হন শরীফুল। তার জায়গা পূরণ করেন বাজেট অফিসার তাইজুল ইসলাম। তিনিও শরীফুলের পথ অবলম্বন করেন। বঙ্গবন্ধু কর্মচারী পরিষদের সহসভাপতিসহ খামারবাড়ি নন গেজেটেড কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। বিগত স্বেরশাসকের সময় খামারবাড়িতে তার কথাই যেন ছিল শেষ কথা ছিল। খামারবাড়িতে তিনি কর্মচারী সিন্ডিকেটের মূল হোতা হিসেবে পরিচিতি। গত ১৯ জুন তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর (ডিএই)।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তদন্তের আলোকে আরো যে ১১ জন কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। তারা হলেন- কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের সহকারী হিসাবরক্ষক আরমান মিয়া, ডিএই’র ঊর্ধ্বতন হিসাব রক্ষক নাফিসা সরকার, অডিটর কামরুল ইসলাম, কম্পিউটার অপারেটর খন্দকার রফিকুল ইসলাম, উচ্চমান সহকারী কাম হিসাব রক্ষক ফারুক হোসেন, উচ্চমান সহকারী শেখ ফরিদ, অলিউল্লাহ প্রধান, ষাটলিপিকার মর্জিনা বেগম হ্যাপি, গাড়িচালক হুমায়ন কবীর লিটন, আবুল কালাম ও আলমগীর হোসেন। তাদের বিভিন্ন অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয় বলে জানা যায়। তাদের বেশিরভাগের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে তদন্ত এবং ঢাকার বাইরে বদলির সুপারিশ করা হয়েছে।

অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ আরো অনেকের বিরুদ্ধে

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কন্দাল ফসল উন্নয়ন প্রকল্পের হিসাবরক্ষক মাহিন ইসলাম। চলতি জুনে প্রকল্পটি শেষ হচ্ছে। তবে, তার আগেই কৃষির সবচেয়ে বড় পার্টনার প্রকল্পে হিসাব রক্ষক হিসেবে পদায়ন নিতে সক্ষম হয়েছেন খামারবাড়ি বঙ্গবন্ধু কর্মচারী পরিষদের পদধারী নেতা মাহিন। প্রকল্প সমাপ্তির পর কমপক্ষে ৬মাস প্রকল্পে সংয্ক্তু থেকে অডিট কার্যক্রম ও অনুসাংগিক সমাপ্তি কার্যক্রম পরিচালনা করার বিধান থাকলেও তাইজুল ইসলামের আরেক সহযোগী মাহিন ইসলাম সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে ঠিকই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে পদায়ন নিয়েছেন। যার বিরুদ্ধে আবার আর্থিক অনিয়মের নানা অভিযোগ রয়েছে।

তাইজুল ইসলামের আরেক ঘনিষ্ঠ প্রধান সহকারী মোফাজ্জাল আমিন। ১৩ গ্রেডের একজন কর্মচারী হয়েও ২০২৩ সালে সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে লিয়েন ছুটি নিয়ে উচ্চ বেতনে ময়মনসিংহে একটি ফার্মে কনসাসটেন্ট হিসেবে দেড় বছর চাকরি করেছে। প্রায় দেড় যুগ একই উইংয়ে কর্মরত থাকা মোফাজ্জাল আমিন লিয়েনে গেলেও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সকল চলমান প্রকল্পের বাজেট নিয়ন্ত্রণের অনলাইন আইবাস আইডি তার নামেই বহাল থেকেছে বলে অভিযোগ। ময়মনসিংহে চাকরি করলেও যথারীতি চলমান প্রকল্পের বাজেট নিয়ন্ত্রণের অনলাইন আইবাস আইডি পরিচালনা করতেন বলে অভিযোগ। তাকে এখন আবার টেকনিক্যাল অ্যাসিসট্যান্ট ফর রিপারপাসিং অব এগ্রিকালচারাল পাবলিক সাপোর্ট টুয়ার্ডস সাসটেনেইবল ফুট সিস্টেম ট্রান্সফরমেশন ইন বাংলাদেশ (ট্রাপস) প্রকল্পের কনসালট্যান্ট পদে নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা যায়। এছাড়া, প্রধান সহকারী মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ খামারবাড়ির মুখে মুখে।

জানা যায়, খামারবাড়ি সিন্ডিকেট সদস্য কর্মচারিদের অনেকের কোটি কোটি টাকা অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। এদের একজন ছিলেন প্রধান সহকারী নাজমুল হোসেন। অবৈধভাবে ঢাকায় ফ্ল্যাট,গাড়িসহ কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়ার পর তা বিক্রি করে তিনি লিয়েন নিয়ে কানাডায় চলে গেছেন স্বপরিবারে। তার মতো একটি প্রকল্পের হিসাব রক্ষকসহ একাধিক কর্মচারী একই পথে রয়েছে বলে জানা যায়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) হাবিবউল্লাহ নয়া দিগন্তকে বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের তদন্তে ১৩ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। তাদের সবার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। আরো যাদের বিরুদ্ধেই অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য, খামারবাড়িতে শুদ্ধি অভিযান চলবে।