বিয়ের আট বছর পর ভূমিষ্ট হওয়া সন্তানের মুখ দেখে যেতে পারেননি শহীদ মিনারুল। দীর্ঘ প্রচেষ্টা ও চিকিৎসার পর তার স্ত্রী শম্পা বেগম গর্ভবতী হন। গর্ভে সন্তানের বয়স যখন সাত মাস তখনই রাজপথে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশের নির্বিচার গুলিতে শহীদ হন মিনারুল।

জীবিকার তাগিদে নিজ শহর রাজশাহী ছেড়ে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে বসবাস করতেন মিনারুল। সেখানে বেঙ্গল কোম্পানিতে চাকরি করতেন তিনি।

মিনারুলের স্ত্রী শম্পা বেগম বাসসকে জানান, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই দেশব্যাপী আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশের নির্বিচারে গুলিবর্ষণের সময় নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে গুলিবিদ্ধ হন মিনারুল।

তিনি বলেন, মেসের বাজার করতে বের হয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় কয়েক ঘণ্টা পড়েছিলেন মিনারুল। কেউ তাকে উদ্ধারে এগিয়ে আসেনি। দীর্ঘক্ষণ পরে কিছু মানুষ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে পথেই মরা যান তিনি।

রাজশাহী মহানগরীর কাশিয়াডাঙ্গা থানার গোলজারবাগ এলাকার মো: এনামুল হক (মৃত) ও মোসাম্মৎ ডলি বেগমের চার সন্তান। তিন ভাই এক বোনের মধ্যে মিনারুল ছিলেন সবার ছোট।

মিনারুলের মা ডলি বেগম ছেলের কথা ভুলতে পারেন না। ভাবেন হয়তো তার ছেলে কখনো এসে তাকে মা বলে ডাকবে। কিন্তু না, কখনো ছেলে যে ফিরবে না তা তার মন বোঝে না, বুঝতে চায় না। কারো সাথেই সেভাবে খুব বেশি কথা বলেন না তিনি। ছেলেকে হারিয়ে তিনি এখন শোকে পাগলপ্রায়।

বিয়ের পর সাত বছর পর পেরিয়ে গেলেও তাদের ঘরে কোনো সন্তান হয়নি। দীর্ঘ প্রচেষ্টা ও চিকিৎসার পর বিয়ের আট বছরের মাথায় মিনারুলের স্ত্রী শম্পা বেগম গর্ভবতী হন। সন্তান আসার খবরে খুশিতে উচ্ছ্বসিত ছিলেন মিনারুল। তখন স্বামীর সাথেই সিদ্ধিরগঞ্জে একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন মিনারুলের স্ত্রী শম্পা।

সন্তান-সম্ভবা হওয়ার পর শম্পা দুশ্চিন্তায় পড়েন। কারণ সেখানে তাকে দেখাশোনা করার কেউ ছিল না। তাই তিনি গর্ভে সন্তানের বয়স যখন তিন মাস তখন তিনি স্বামীর ভাড়া বাসা থেকে নিজ শহর রাজশাহীর কাশিয়াডাঙ্গা থানার গোলজারবাগে ফিরে আসেন।

কান্নাড়িত কণ্ঠে মিনারুলের স্ত্রী শম্পা বেগম বাসসকে বলেন, সে আমাদের ছেড়ে এভাবে চলে যাবে কখনো কল্পনাও করিনি। গর্ভে সাত মাস বয়সেই আমার ছেলে সাইফান তার বাবকে হারাল। ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাজশাহী মহানগরীর একটি বেসরকাারি হাসপাতালে সিজারিয়ানের মাধ্যমে আমার ছেলের জন্ম হয়েছে।

শম্পা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, এতিম হয়েই জন্ম হলো আমার নিষ্পাপ বাচ্চাটির। আমার ছেলে বাবার আদর থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বাবার আদর কোনাদিনও পাবে না। সন্তানকে নিয়ে ভবিষ্যতে কী করব তা ভেবে পাচ্ছি না। এখন রমজানের রোজা চলছে। এর পরে ঈদে সবাই আনন্দ করবে। কিন্তু আমরা কী করব? আমাদের দিনগুলো কেমন করে কাটছে, তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, আমার নিরাপরাধ স্বামীকে যারা অকারণে হত্যা করেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তির দাবি করছি। যাতে কাউকে স্বামীহারা, বাবাহারা ও সন্তানহারা হতে না হয়। আমার স্বামীর খুনিদের বিচার হলে তার আত্মা শান্তি পাবে।

শম্পা আরো জানান, তার সন্তানের দায়িত্ব ও চিকিৎসার যাবতীয় খরচ বহন করছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। সন্তান জন্মের আগে ৫ আগস্টের পরপরই জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান আমাদের বাড়িতে এসে আমাদের দায়িত্ব নেয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন।

তিনি বাসসের মাধ্যমে সরকারের কাছে তার ছেলে মিনারুলের খুনিদের গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানান। তারা ছেলেকে ফিরে না পেলেও ছেলের হত্যাকারীদের বিচার হলে কিছুটা সান্ত্বনা পাবেন। ছেলের আত্মাও শান্তি পাবে।

সূত্র : বাসস