মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) পৃথকীকরণ প্রস্তাবে শিক্ষা ক্যাডার ও মাধ্যমিকের শিক্ষকদের মধ্যে ভিন্ন মত দেখা দিয়েছে। মাধ্যমিক পর্যায়ের সরকারি স্কুলের শিক্ষকরা মাউশি পৃথকীকরণের পক্ষে নানা যুক্তি তুলে ধরা হলেও শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা পৃথকীকরণ চান না। তাদের মতে মাউশি পৃথকীকরণ হলে কাজের গতিশীলতা কমে আসবে। নানা ধরনের জটিলতাও তৈরি হতে পারে। উল্লেখ্য সম্প্রতি মাউশিকে দুই ভাগে ভাগ করে ‘মাধ্যমিক অধিদফতর’ এবং ‘কলেজ শিক্ষা অধিদফতর’ নামে দু’টি পৃথক অধিদফতর করার একটি প্রস্তাব প্রধান উপদেষ্টা বরাবরে পাঠানো হয়েছে।
অন্যদিকে মাধ্যমিক পর্যায়ের বেশিভাগ শিক্ষকদের মতে ২০০৩ সালের শিক্ষা কমিশনের পর গঠিত জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ সুস্পষ্টভাবে মাধ্যমিকের জন্য একটি স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদফতর প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বিগত ১৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রীদের কলেজ প্রীতির কারণে জাতীয় শিক্ষা কমিশন ২০০৩ অর্থাৎ অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিয়ার কমিশনের সুপারিশ ও শিক্ষানীতি ২০১০-এ সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা মাধ্যমিকের উন্নয়নে আলাদা মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদফতর বাস্তবায়নের কোন উদ্যোগই গ্রহণ করেনি।
যদিও এ সময়ে মাধ্যমিক শিক্ষক সংগঠনগুলো একাধিকবার সংবাদ সম্মেলন এবং মানববন্ধনের মাধ্যমে আলাদা অধিদপ্তরের দাবি জানালেও সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রীবর্গ শিক্ষকদের এ ন্যায্য দাবিকে আমলে নেননি। গত বছর জুলাই বিপ্লবের পর ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ সচিব কমিটির বৈঠকে মন্ত্রণালয় ও বিভাগ গুলোকে সংস্কার পরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশনা দেয়া হয়। সেই আলোকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর সংস্কার পরিকল্পনা দাখিল করে। যেখানে মাউশিকে দু’টি অধিদফতরে রূপান্তরর প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি (বাসমাশিস) কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটির সমন্বয়ক ও স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদফতর বাস্তবায়ন জাতীয় কমিটির মুখপাত্র মো: ওমর ফারুক জানান ইতোপূর্বে ২০১০ সালের শিক্ষানীতির আলোকে মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত ও কর্মমুখী করতে ২০১৫ সালে মাদরাসা শিক্ষা অধিদফতর নামে আলাদা একটি অধিদফতর করা হয়। একইসাথে কারিগরি শিক্ষার জন্য আলাদা অধিদফতর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক শিক্ষা ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ এবং তৎকালীন শিক্ষা সচিব ড. শেখ আব্দুর রশিদ (বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব) সাথে দেখা করে বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে আলাদা অধিদফতরের যৌক্তিকতা এবং গ্রাউন্ড তুলে ধরে অন্তর্বর্তী সরকারের এই সময়ে মাধ্যমিকের জন্য স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদফতর প্রতিষ্ঠার জোর দাবি জানানো হয়।
অপরদিকে, শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মতে বর্তমানে যেভাবে মাউশির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে এতে কাজের গতিশীলতা ও স্বচ্ছতা সঠিকভাবেই পরিচালিত হচ্ছে। শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের মতে মাউশির আওতাধীন বর্তমানে পরিচালিত নয়টি প্রকল্পের মাত্র দু’টি প্রকল্প কলেজ শিক্ষার উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট বাকি সাতটি প্রকল্প এবং তিনটি স্কিমই মাধ্যমিক শিক্ষা উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট। আবার মাউশির মাধ্যমিক শাখা, মনিটরিং শাখা এবং শারীরিক শিক্ষা বিভাগের শতভাগ কাজ মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সংশ্লিষ্ট এবং বাকি চারটি শাখার ৮০ ভাগ কাজও মাধ্যমিক সংশ্লিষ্ট। সেই বিবেচনায় মাউশি পৃথকীকরণের কোনো যুক্তি নেই বলে দেখছেন জানিয়েছেন শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা।