অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা প্রফেসর ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেছেন, অগ্নিঝরা জুলাই আন্দোলনে এ দেশের আলেম সমাজ যেভাবে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে দেশকে ফ্যাসিবাদ মুক্ত করেছে জাতি তা চিরদিন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।

তিনি বলেন, শুধু জুলাই আন্দোলনে নয়; বরং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সকল আন্দোলন-সংগ্রামে আলেম সমাজ নেতৃত্ব দিয়েছেন।

তিনি আরো বলেন, জুলাই বিপ্লব পরবর্তী গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণ করতে পারেনি। কারণ সরকারের দায়িত্ব ছিল অনেক। সরকার সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে উপদেষ্টাবৃন্দ রাত-দিন কাজ করেছেন।

নিজের অসুস্থতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, যেদিন থাইল্যান্ড থেকে অপারেশন করে দেশে এসেছি সেদিনই জুলাই সনদের পক্ষে গণভোটের প্রচারণায় সিলেট চলে যেতে হয়েছে। কিন্তু নির্বাচিত সরকার গণভোটের রায় মেনে নিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দিকে হাঁটছে না।

রোববার রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স মিলনায়তনে সম্মিলিত উলামা মাশায়েখ পরিষদ আয়োজিত ‘জুলাইয়ের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে উলামায়ে কেরামের অবদান’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন।

তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ মাওলানা যাইনুল আবেদীনের সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন তালিমুল কোরআন ফাউন্ডেশনের সেক্রেটারি মাওলানা আব্দুল হালিম এবং বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার মুফতি কাজী ইব্রাহিম।

সম্মিলিত উলামা মাশায়েখ পরিষদের মহাসচিব ড. মুহাম্মদ খলিলুর রহমান মাদানীর পরিচালনায় সভায় আরো বক্তৃতা করেন বাগেরহাট-১ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা মশিউর রহমান এমপি, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নায়েবে আমির ও সম্মিলিত উলামা মাশায়েখ ঢাকা মহানগর সভাপতি মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সেক্রেটারি ও সম্মিলিত উলামা মাশায়েখ পরিষদের যুগ্ম-সম্পাদক মুফতি ফখরুল ইসলাম, সম্মিলিত উলামা মাশায়েখ পরিষদের কেন্দ্রীয় সদস্য ড. মাওলানা সামিউল হক ফারুকী, ড. মাওলানা আবদুস সামাদ, আ ন ম রশিদ আহমদ মাদানী, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের নায়েবে আমির আবুল কাসেম কাসেমী, মুসলিম জনতা ঐক্য পরিষদের আমির মাওলানা আজিজুর রহমান আজিজ, ছারছিনা দরবার শরীফের ছোট হুজুর মাওলানা শাহ মুহাম্মদ আরিফ বিল্লাহ সিদ্দিকী, উলামা কমিটি ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সভাপতি অধ্যক্ষ মাওলানা মোশাররফ হোসাইন, উলামা কমিটি ঢাকা মহানগরী উত্তরের সভাপতি ড. মাওলানা মীম আতিকুল্লাহ প্রমুখ।

ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি বর্তমান সরকার বাতিল করে দিয়েছে! তার মধ্যে গুম কমিশন অধ্যাদেশ, দুদক অধ্যাদেশ, মানবাধিকার অধ্যাদেশসহ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদে গুলো বাতিল করা হয়েছে! এমন সব অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে যার ফলে সেই পুরোনো সংস্কৃতি বিদ্যমান থাকবে। ফলে জুলাইয়ের চেতনা বাস্তবায়ন হবে না। কিন্তু জুলাই চেতনা বিলীন হতে দেয়া হবে না। জুলাই চেতনা বাস্তবায়নে আমরা ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখবো, ইনশাআল্লাহ।

তিনি বলেন, ইনশাআল্লাহ আগামী দিনে এ দেশে কোরআনের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে।

বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় তালিমুল কোরআন ফাউন্ডেশনের সেক্রেটারি মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, শুধু অগ্নিঝরা দিনগুলোতেই নয়; বরং ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের শাসনামলের প্রতিটি রাতে ঘুমাতে যেতে উলামায়ে কেরাম চিন্তা করতেন ফজরে মসজিদে যেতে পারবেন নাকি ক্রসফায়ারে যেতে হবে! ফ্যাসিবাদী শাসনামলের সেই দিনগুলো ছিল ভয়বাহ এবং দুর্বিষহ।

হেফাজত ইসলাম গঠনের কারণ ও প্রক্রিয়া তুলে ধরে তিনি বলেন, আল্লামা বাবুনগরী নিজে আমিরে জামায়াতের সাথে সাক্ষাত করেছেন। আমিরে জামায়াতও আল্লামা বাবুনগরীর সাথে সাক্ষাত করেছেন।

কওমি আলেম ও নেতৃবৃন্দের সাথে জামায়াতে ইসলামীর গভীর সর্ম্পক ছিল এবং থাকবে উল্লেখ করে তিনি অশ্রুসিক্ত নয়নে বলেন, আজকে যারা হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বে রয়েছেন তাদের কথাবার্তায় মনে হয় তারা আল্লামা বাবুনগরীর উপর যেই জুলুম নির্যাতন হয়েছে তা ভুলে যেতে বসেছেন।

তিনি আরো বলেন, আমাদের মাঝে কোনো বিভেদ নেই, বিচ্ছেদ নেই। জামায়াতে ইসলামী মনে করে কওমি, আলিয়া সব এক কালেমায় বিশ্বাসী মুসলিম। তাই আমরা কোনো বিভেদ, বিভাজন বা বিচ্ছেদে বিশ্বাসী নয়। আমরা মনে করি আমরা সবাই ভাই-ভাই। ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে আওয়ামী লীগ পরিচালিত আলেমদের গণহত্যা মিশনে যারা শাহাদাত বরণ করেছে জামায়াতে ইসলামী সকল শহীদ পরিবারে আর্থিক সহযোগিতাসহ সার্বিক সহায়তার চেষ্টা করেছে। এ ছাড়াও যেখানেই আলেম-উলামা আক্রান্ত হয়েছে জামায়াতে ইসলামী সাধ্যমতো চেষ্টা করেছে আলেম-উলামাদের পাশে দাঁড়াতে।

তিনি বলেন, জুলাইকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে আলেমদের ঐক্যে ফাটল ধরাতে পরাজিত শক্তি চেষ্টা করছে।

এই চেষ্টা সফল হতে দেয়া যাবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, আজকে সংসদে দাড়ি-টুপিওয়ালাদের দেখা যাচ্ছে। আমাদের ঐক্য বজায় থাকলে আগামীতে রাষ্ট্র পরিচালনায় আমাদের আলেম-উলামারা নেতৃত্ব দেবেন, ইনশাআল্লাহ।

তাই তিনি আলেম সমাজকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, জুলাইয়ের চেতনা ছিল বিভাজনের বিরুদ্ধে, ঐক্যের পক্ষে।

সভাপতির বক্তব্যে অধ্যক্ষ মাওলানা যাইনুল আবেদীন বলেন, এখন থেকে আমরা সব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে দ্বীন কায়েমের জন্য ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখবো। সংসদে আলেম সমাজের যেই প্রতিনিধিবৃন্দ রয়েছেন তারা সংসদে ভূমিকা রাখবেন। আমরা মাঠে-ময়দানে ভূমিকা রাখবো, ইনশাআল্লাহ। দ্বীন কায়েমের মাধ্যমে এই জমিন থেকে সকল অন্যায়, অনাচার, শোষন, জুলুম-নির্যাতন মুক্ত করে ন্যায় ও ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।