মসজিদুল ফালাহ, ভিয়েনা মুসলিম সেন্টার ও এশিয়ান ইসলামিক কমিউনিটির যৌথ প্রতিনিধি দল অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় নব নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তৌফিক হাসানের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। শুক্রবার (২১ মার্চ) বাদ জুমা তারা এ সাক্ষাৎ করেন।
প্রতিনিধি দলের পক্ষ থেকে নব নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতকে শুভেচ্ছা জানানো শেষে দীর্ঘ সময় আন্তরিক পরিবেশে মতবিনিময় হয়।
আট সদস্যবিশিষ্ট প্রতিনিধি দলের পক্ষে ভিয়েনা মুসলিম সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, এশিয়ান ইসলামিক কমিউনিটির সভাপতি, ইসলামিক রিলিজিয়াস অথরিটি ইন অস্ট্রিয়ার সুপ্রিম কাউন্সিল মেম্বার, ভিয়েনাস্ত জাতিসংঘের সদর দফতরে কর্মরত প্রকৌশলী এম এ হাসিম অস্ট্রিয়ায় বাংলাদেশী কমিউনিটি প্রসঙ্গে বলেন, আশির দশকে বাংলাদেশীদের সংখ্যা অস্ট্রিয়াতে খুবই কম ছিল। নব্বইয়ের দশকের শেষার্ধে অনেকেই আসতে শুরু করেন। বিশেষ করে ৯০ পরবর্তী অনেক বাংলাদেশী অস্ট্রিয়ায় আসেন। ২০০৫-এর পর আবার অনেকেই ব্রিটেন চলে যান। বর্তমানে অস্ট্রিয়ায় বাংলাদেশী নাগরিক আনুমানিক চার হাজার (স্ট্যাটিস্টিক অস্ট্রিয়া), বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত অস্ট্রিয়ান নাগরিক আনুমানিক তিন হাজার, মোট আনুমানিক সাত হাজার।
অস্ট্রিয়ায় বাংলাদেশী নাগরিক ও বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত অস্ট্রিয়ান নাগরিকদের একটা পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেস তৈরি করে জন শক্তির সঠিক তালিকা প্রণয়ন করার জন্য রাষ্ট্রদূতকে অনুরোধ করেন হাসিম।
অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে রাষ্ট্রদূতের প্রশ্নের জবাবে হাসিম অস্ট্রিয়ায় বাংলাদেশী মুসলিমদের দাওয়াতি সংস্থা ও মসজিদ প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, ১৯৯২ সালে মহান আল্লাহর ইচ্ছায় কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে আমার বাসায় দ্বীন চর্চার কাজ শুরু করি, যে সময় ভিয়েনায় বাংলাদেশী মুসলিম কমিউনিটিতে কোনো মসজিদ বা ধর্ম চর্চার কোনো সংস্থা ছিল না। পরবর্তীতে প্রায় সব বাংলাদেশী মুসলিম ভাই-বোনেরা সম্মিলিতভাবে ১৯৯৭ সালে প্রথম মসজিদ প্রতিষ্ঠা করি। এরও কয়েক বছর পরে একটা পুরনো ভবন ক্রয় করা হয়। দুৰ্ভাগ্যজনকভাবে প্রতিষ্ঠানটি দেউলিয়া হয়ে যায় এবং বিক্রি করে দেয়া হয়। গত কয়েক বছর আগে যা বাংলাদেশী মুসলিম কমিউনিটির জন্য খুবই বেদনাদায়ক।
তিনি বলেন, ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় মাসজিদুল ফালাহ। ভিয়েনার অত্যন্ত জনবহুল মিলেনিয়াম সিটি সংলগ্ন একটা কফি হাউস ক্রয় করে ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠা করি বাংলাদেশীসহ মুসলিম বিশ্বের বহু দেশের মুসল্লিদের প্রাণ কেন্দ্র ‘ভিয়েনা মুসলিম সেন্টার’, যা বাংলাদেশী কমিউনিটি কর্তৃক পরিচালিত একমাত্র ক্রয়কৃত স্থায়ী মুসলিম সেন্টার।
এশিয়ান ইসলামিক কমিউনিটি প্রসঙ্গে হাসিম জানান, অস্ট্রিয়ায় বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ান দেশগুলোর মসজিদ সমূহের একটি সংস্থা যা ফেডারেল চ্যান্সেলারি কর্তৃক অনুমোদিত এবং অস্ট্রিয়ান পাবলিক আইনের অধীনে একটি স্বাধীন করপোরেশন।
ইসলাম ও ‘ইসলামিক রিলিজিয়াস অথরিটি ইন অস্ট্রিয়া’ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশ মধ্যে অস্ট্রিয়ায় মুসলমানদের আইনি মর্যাদা অনন্য। সমগ্র ইউরোপের মাঝে অস্ট্রিয়া একটি ইউনিক কান্ট্রি যেখানে ১৯১২ সাল থেকে ইসলাম সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। অটোমান বা উসমানীয় সাম্রাজ্য কর্তৃক ১৪৬৩ সাল থেকে ১৮৭৮ সাল পর্যন্ত শাসিত ও ১৯০৮ পর্যন্ত অটোমান অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে ১৯০৮ সালে অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্য (১৮৬৭ থেকে ১৯১৮) তাদের অধীনে সংযুক্ত করে। অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের এই অঞ্চলে ৬ লাখ মুসলমান বাস করত, যাদের ধর্মীয় অনুশীলনকে রক্ষা করা জরুরি হয়ে দাঁড়ায়। সেই সময় বসনিয়ান মুসলমানরা সম্রাটের দেহরক্ষী হিসেবে কাজ করতেন, ইমামরা সামরিক চ্যাপ্লেন হিসেবে কাজ করতেন। মুসলমানদের ধর্মীয় অনুশীলন রক্ষা সংক্রান্ত উদ্বেগটি, ১৮৭৪ সালে সম্পাদিত স্বীকৃতি আইন ১৮৭৪ (Anerkennungsgesetz 1874, RGBl. Nr. 68/1874) যা ধর্মীয় সমাজের আইনি স্বীকৃতি মোতাবেক ১৯১২ সালে অস্ট্রিয়ায় ইসলাম আইনি স্বীকৃতি পায়। ( Art. 15 Staatsgrundgesetz, RGBl. Nr. 142/1867, Art. I Islamgesetz, RGBl. Nr. 154/1912 gesetzlich anerkannt.)
১৯৭১ সালে মুসলমানদের একটি সংস্থা ‘ইসলামী আইন ১৯১২’-এর ধারা মোতাবেক একটি ইসলামিক কমিউনিটি প্রতিষ্ঠা করার জন্য আবেদন করলে, ফলস্বরূপ ১৯৭৯ সালে ‘ইসলামিক রিলিজিয়াস অথরিটি ইন অস্ট্রিয়া’ পাবলিক আইনের অধীনে একটি করপোরেশন হিসেবে গঠিত হয়। অস্ট্রিয়ায় বসবাসকারী টার্কিশ, বসনিয়ান, অ্যারাবিয়ান, আলবেনিয়ান, আফ্রিকান ও এশিয়ানদের নেতৃত্বাধীন প্রায় চার শ’ মসজিদ ও ইসলামিক সংস্থার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা প্রধানত ১০টি বৃহৎ ইসলামিক কমিউনিটির (Kultusgemeinde) কেন্দ্রীয় সংস্থা ‘ইসলামিক রিলিজিয়াস অথরিটি ইন অস্ট্রিয়া’।
সংস্থাটি পাবলিক আইনের অধীনে একটি করপোরেশন হিসেবে অস্ট্রিয়ায় বসবাসকারী সমস্ত মুসলমানদের ধর্মীয় বিষয়ের সরকারী প্রশাসনের প্রতিনিধিত্ব করে, অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসনও উপভোগ করে। এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায় এবং অস্ট্রিয়ার নাগরিক প্রতিষ্ঠানের ইন্টারফেস। অস্ট্রিয়ান সকল স্কুলে সংস্থাটি কর্তৃক নিয়োগকৃত ও অস্ট্রিয়ান সরকারের বেতনভুক্ত ইসলামী ধর্মীয় শিক্ষকদের মাধ্যমে ইসলামী ধর্মীয় শিক্ষার ব্যবস্তা করা, ইসলামী ধর্মীয় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং তাদের চলমান প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা করাসহ মুসলমানদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বহুবিধ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।
ভিয়েনাভিত্তিক একটি এন জি ওর সভাপতি ও ভিয়েনা মুসলিম সেন্টারের সহ সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ কর্তৃক বাংলাদেশ থেকে অস্ট্রিয়ার ভিসা প্রাপ্তির জন্য নয়াদিল্লীর আসা যাওয়ার জটিলতা এড়িয়ে বাংলাদেশে কোনো সংস্থা বা দূতাবাসের মাধ্যমে ভিসা প্রসেস করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করার প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রদূত জানান, এ বিষয়ে অস্ট্রিয়ার যথাযথ কর্তৃপক্ষের সাথে তার ইতোমধ্যে কথা হয়েছে এবং জনদুর্ভোগ নিরসনে তিনটি বিকল্প প্রস্তাবও দিয়েছেন।
দূতাবাসটি যেন অতীতের মতো দলীয় কার্যালয় না হয় এই প্রসঙ্গে মাসজিদুল ফালাহর সভাপতি হাবিবুর রহমানের এমন কথার জবাবে রাষ্ট্রদূত বলেন, দূতাবাস দলমত নির্বিশেষে সবার জন্য নিরপেক্ষভাবে কাজ করে যাবে। ভিয়েনায় বাংলাদেশী দূতাবাসের প্রায় এক যুগ হতে চলেছে। অথচ বাংলাদেশী কমিউনিটি কর্তৃক পরিচালিত একমাত্র ক্রয়কৃত স্থায়ী প্রপার্টি ‘ভিয়েনা মুসলিম সেন্টার’টিতে আজ পর্যন্তও কোনো বাংলাদেশী রাষ্ট্রদূত নামাজ পড়তে বা ভিজিট করতে যাননি।
তখন রাষ্ট্রদূত বলেন, রোজার পরপরই তিনি কোনো এক শুক্রবার নামাজ পড়তে যাবেন। বিজ্ঞপ্তি