জুলাই আন্দোলনে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) শাখা ছাত্রলীগের কার্যালয় ভাঙার পর আন্দোনকারীদের দুর্বৃত্ত বলার অভিযোগে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাংবাদিককে হেনস্তা করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৯ এপ্রিল) দিবাগত রাত ১২টার দিকে শাহ আজিজুর রহমান হলে এ ঘটনা ঘটে।
ভুক্তভোগী ওয়াসিফ আল আবরার বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিউনিকেশন অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও ডেইলি ক্যাম্পাসের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি।
জানা গেছে, ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতার কারণে গত ৭ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার্স ইউনিটি থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়।
হল সূত্রে জানা গেছে, ওয়াসিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ আজিজুর রহমান হলে অবৈধভাবে অবস্থান করছিলেন। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সময় তার বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেন প্রভোস্টের কাছে। পরে প্রভোস্ট তাকে হল ছাড়তে বললেও তিনি হল ছাড়েননি।
মঙ্গলবার রাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কিছু শিক্ষার্থী তার রুমে গিয়ে হল ছাড়তে বলেন। একপর্যায়ে তাকে টেনে হিঁচড়ে বের করতে গেলে তার টিশার্ট গলায় আটকে ব্যথা পান তিনি। এছাড়া তাকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেন। পরে বৈষম্যবিরোধী ও ছাত্রদলের আরেকটি পক্ষ ওয়াসিফের পক্ষে দাঁড়ালে উত্তেজনা তৈরি হয়। এ সময় ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের সেখানে দেখা যায়।
এ বিষয়ে ওয়াসিফ আল আবরার বলেন, ‘আমাকে সাত থেকে আটজন লোক গিয়ে বলে দু’মিনিটের মধ্যে হল থেকে বের হবি। আমি তখন জিনিসপত্র নিচ্ছিলাম। আমি বের হয়ে যাচ্ছিলাম। আমাকে তারা বলে ‘আপনি হলুদ সাংবাদিক পরে আবার ঝামেলা করবেন’ বলে আমার ফোন নেয়ার চেষ্টা করে। পরে তারা রুমের লাইট বন্ধ করে আমাকে মারধর করে।’
এদিকে এ ঘটনায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ইবি শাখা নেতাকর্মীরা ও সমন্বয়কদের একটি পক্ষ প্রতিবাদ জানিয়েছে।
বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘প্রভোস্ট হল থেকে বের হয়ে যেতে বললেও আবরার হল থেকে যাননি। কতিপয় সমন্বয়ক ও নেতা তাকে প্রশ্রয় দেয়ায় প্রভোস্টও অসহায় হয়ে গিয়েছিল। তাই আমরা তাকে বলতে গিয়েছিলাম, তিনি যেন হল ছেড়ে দেন। পরে সমন্বয়কদের একটি গ্রুপ তার পক্ষ নিলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
শিক্ষার্থীদের দাবি, ওয়াসিফ আল আবরার কলেজে থাকা অবস্থায় পাবনার বেড়া উপজেলা ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী ছিল। জুলাই আন্দোলনেও তার ভূমিকা বেশ বিতর্কিত ছিল। চারদিকে যখন আন্দোলনকারীরা একে একে শহীদ হচ্ছিল তখন সে হাসিমাখা ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভিতরে থাকা শাখা ছাত্রলীগের অফিস ভাঙচুর করলে আন্দোলনকারীদের দুর্বৃত্ত বলে আখ্যা দেন তিনি। এদিকে ৫ আগস্টের পরেও বিভিন্ন বিতর্কিত কার্যক্রমে তাকে দেখা যায়।
এ ঘটনার পর ওয়াসিফকে বিশ্ববিদ্যালয় মেডিক্যালে নিলে সেখানে তাকে চিকিৎসা দেয়া হয়। পরে তাকে কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
এ বিষয়ে দায়িত্বরত চিকিৎসক ডা: পারভেজ হাসান বলেন, তার গুরুতর কিছু হয়নি। তবে শ্বাসনালিতে আঘাত লেগেছে। প্রথমে চিকিৎসা দিলে সুস্থ হয়ে গিয়েছিল। পরে নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। নিরাপত্তার জন্য তাকে কুষ্টিয়ায় পাঠানো হয়েছে।
এদিকে এ ঘটনার বিচার দাবিতে সহ-সমন্বয়ক নাহিদের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাসভবনে গিয়ে স্লোগান দিতে থাকেন কয়েকজন। একপর্যায়ে বৈষম্যবিরোধীদের আরেকটি পক্ষ সেখানে এলে উভয়ের মাঝে বাগ্বিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
পরে রাত ৩টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. জাহাংগীর আলমের মধ্যস্থতায় প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামানের সাথে আলোচনায় বসে দু’পক্ষ। দীর্ঘ আলোচনা শেষে সকাল ৮টার দিকে সমঝোতায় আসে তারা।
সহ-সমন্বয়ক নাহিদ হাসান বলেন, ‘শাহ আজিজুর রহমান হলের ঘটনা শুনে সেখানে সমাধানের জন্য গিয়েছিলাম। পরে এ ঘটনার বিচার দাবিতে ভিসি স্যারের বাসভবনে যাই। সেখানে বৈষম্যবিরোধীদের আরেকটি পক্ষ এলে তাদের সাথে কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হয়।
এ বিষয়ে হলটির প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. এ টি এম মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমাদের হলে ছেলেটার অ্যাটাচমেন্ট নেই তাই আমরা তাকে বললাম, ‘তুমি তোমার হলে চলে যাও। গত পরশু দিন আমি ওর রুমমেটকে বলেছিলাম আবরার যাতে রুমে এসে না থাকে। যেহেতু ওর বিষয়ে অনেক অভিযোগ রয়েছে। এটা জানার পরও আমার কথা অমান্য করে সে হলে এসে থাকছে। গতরাতে যারা ওকে নামিয়ে দেয়ার জন্য গিয়েছিল তারাও আমার সাথে কথা বলে যায়নি। এটা তো হল প্রশাসনের দায়িত্ব। দু’পক্ষকেই আমি মেনে নিতে পারছি না।’
এ বিষয়ে প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান বলেন, ‘আমরা দু’পক্ষের সাথে আলোচনা করেছি। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’