পরীক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমাতে প্রথমবারের মতো নিজস্ব ক্যাম্পাস ছাড়াও পাঁচ বিভাগীয় শহরে ভর্তি পরীক্ষা নিয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে ভর্তি পরীক্ষায় আসনবিন্যাস, প্রবেশপত্র বিড়ম্বনা, প্রশ্নপত্রে ভুল, এক ইউনিটের পরীক্ষায় অন্য ইউনিটের ওএমআর শিট প্রদানসহ নানা অসঙ্গতি ঘটেছে। এছাড়া পরীক্ষার হলে নারী শিক্ষার্থীর সাথে কুরুচিপূর্ণ আচরণ করার মতোও অভিযোগ উঠেছে রাবির এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে। তবে কিছু ভুলভ্রান্তি হলেও ভবিষ্যতে এ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আরো সুসংগঠিত ও সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা নেয়ার কথা জানিয়েছেন কর্তৃপক্ষ।

জানা যায়, শুরুতেই পরীক্ষার জন্য প্রকাশিত আসনবিন্যাসে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরে তোপের মুখে পুনরায় নতুন আসনবিন্যাস প্রকাশ করতে বাধ্য হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এতে শিক্ষার্থীদের তিনবার প্রবেশপত্র ডাউনলোড করতে হয়। পরে পরীক্ষার হলে প্রবেশের সময় সর্বশেষ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রবেশপত্র সাথে আনতে বাধ্য হওয়ায় ভোগান্তি চরমে পৌঁছে শিক্ষার্থীদের।

এদিকে ১২ এপ্রিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক প্রথম বর্ষের ‘বি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় ভুলক্রমে ‘সি’ ইউনিটের উত্তরপত্র (ওএমআর শিট) দেয়া হয়। ওই দিন বেলা ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ অ্যাকাডেমিক কলা ভবনের ২০১, ২০৩ ও ২০৪ নম্বর কক্ষে এ ঘটনা ঘটে। ভুল উত্তরপত্র দেখে হতভম্ব হয়ে পড়েন পরীক্ষার্থীরা।

এছাড়া স্যার জগদীশচন্দ্র বসু অ্যাকাডেমিক ভবনের ২১৮ নম্বর কক্ষে ৯০ জন ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীর জন্য ওএমআর শিট পাঠানো হয় ২৭টি। ফলে উত্তরপত্র বিতরণের সময় বিভ্রান্তিতে পড়েন কক্ষে থাকা পরিদর্শকরা।

এ বিষয়ে শহীদুল্লাহ ভবনে দায়িত্বে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (আইবিএ) অধ্যাপক গোলাম আরিফ বলেন, ‘শহীদুল্লাহ ভবনের ২০৪ নম্বর কক্ষে ভুলবশত ‘বি’ ইউনিটের ওএমআর শিটের পরিবর্তে ‘সি’ ইউনিটের ওএমআর সরবরাহ করা হয়েছিল। কিন্তু আমরা তা সাথে সাথেই সংশোধন করে সঠিক ওএমআর শিট সরবরাহ করেছি। ফলে পরীক্ষার্থীদের বড় কোনো অসুবিধা হয়নি।’

এদিকে ১৯ এপ্রিল ‘এ’ ইউনিটের দুই শিফটের পরীক্ষা শেষে রাবি কেন্দ্রের প্রশ্নপত্র বিশ্লেষণ করে ছয় জায়গায় ভুল ও অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, ত্রুটিপূর্ণ প্রশ্নগুলোর ক্ষেত্রে সকল পরীক্ষার্থীকে পূর্ণ নম্বর দেয়া হবে।

এছাড়া ভর্তি পরীক্ষার ১ম শিফটে প্রশ্নপত্রের তিন (৩) নম্বর সেটের বাংলা অংশের ১৩, ১৬ ও ২৩ নম্বর প্রশ্নে ভুল পাওয়া গেছে। এছাড়া ২য় শিফটের পরীক্ষার প্রশ্নে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ‘ড. ইউনূসের’ নামের বানানে ভুলসহ সাধারণ জ্ঞান অংশে একটি প্রশ্নের উত্তর অপশনে পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন ও ‘এ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার প্রধান সমন্বয়ক অধ্যাপক মোহাম্মদ বেলাল হোসেন বলেন, ‘প্রশ্নপত্রে কিছু ভুল আছে বলে শুনেছি। তবে এতে শিক্ষার্থীদের কোনো ক্ষতি হবে না। যেসব প্রশ্নে ভুল আছে সেগুলোর পূর্ণ নম্বর সুবিধা সব শিক্ষার্থী পাবেন। এটি মূলত প্রিন্টিংজনিত সমস্যার কারণে হয়েছে।’

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক শাহিদ ইকবাল জানান, ‘প্রশ্নপত্রের বাংলা অংশে তিনটি প্রশ্নে ভুল রয়েছে। পাশাপাশি অমোঘ-মহাপ্রাণ বলে কোনো শব্দ বাংলা ব্যাকরণে পাওয়া যায় না।’

এদিকে ওই দিন রাবি শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক সরকারের বিরুদ্ধে ভর্তি পরীক্ষার কেন্দ্রে এক ভর্তিচ্ছু নারী শিক্ষার্থীর সাথে অসদাচরণের অভিযোগ উঠেছে। প্রথম শিফটের ভর্তি পরীক্ষা শেষে প্রক্টর বরাবর অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জমা দেন ভুক্তভোগী ওই নারী শিক্ষার্থী।

লিখিত অভিযোগপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, ‘পরীক্ষায় ওড়না পরে আসায় ওই শিক্ষক আমাকে অকথ্য ভাষা ব্যবহার করেন। যা কোনো মেয়েই স্বাভাবিকভাবে নিতে পারবে না। একইসাথে তিনি আমাকে ‘চোর’ বলে সম্বোধন করে বলেন ‘একে সাইজ করা দরকার’। একপর্যায়ে আমার খাতা কেড়ে নিয়ে প্রায় ১০ মিনিট আটকে রাখেন তিনি।’

তবে অভিযুক্ত শিক্ষক ওমর ফারুক বলেন, ‘পরীক্ষা হলে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। আমি এরকম কোনো কথা বলিনি। অভিযোগটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।’

ইতোমধ্যে ঘটনা তদন্তে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রো-ভিসিকে (প্রশাসন) প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করেছে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব জানান, ‘অভিযোগটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। ঘটনা তদন্তে সত্য প্রমাণিত হলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

এছাড়া শনিবার (২৬ এপ্রিল) ‘সি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় পাঁচটি প্রশ্নে ভুল পাওয়া গেছে। এ দিন বেলা ১১টায় ১ম শিফটের ১ নম্বর সেট প্রশ্নপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে সাধারণ অংশে ৩৭ নম্বর, গণিত অংশে ৭৭ নম্বর এবং ঐচ্ছিক অংশে ৬০ নম্বর প্রশ্নে ভুল ও অসঙ্গতি রয়েছে। কোথাও সঠিক উত্তর ছিল না, আবার কোথাও সব অপশনই সঠিক ছিল।

এছাড়া ২য় শিফটের ১ নম্বর সেট প্রশ্নপত্রে গণিত অংশে ৭৪ নম্বর প্রশ্ন ও ঐচ্ছিক অংশে ৭৬ নম্বর প্রশ্নে ভুল পাওয়া গেছে যেখানে অপশনে কোনো সঠিক উত্তর ছিল না।

এ বিষয়ে জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও ‘সি’ ইউনিটের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. গোলাম মর্তুজা জানান, ‘আমার জানা মতে, ৩৭ নম্বর প্রশ্নে সঠিক উত্তর রয়েছে। তবে অন্যগুলো গণিত ও উদ্ভিদবিদ্যা (বোটানি) বিভাগের তৈরি প্রশ্ন। এ বিষয়ে আমি মন্তব্য করতে পারবো না।’

সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীন বলেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী প্রশ্নপত্রে কোনো ভুল বা অসঙ্গতি দেখা দিলে সবাইকে মার্কিং করে দেয়া হয়। আমরাও সেই নিয়ম অনুসরণ করছি। তবে এবার প্রথমবারের মতো বিভাগীয় পর্যায়ে পরীক্ষা নেয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। কিছু ভুলভ্রান্তি হয়েছে সত্যি, তবে ভবিষ্যতে এ অভিজ্ঞতা মাথায় রেখেই আরো সুসংগঠিত ও সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা নেয়ার চেষ্টা করব।’

শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা অসদাচরণের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাকে প্রধান করে ইতোমধ্যে একটি তদন্ত কমিটি করেছে। আগামীকাল থেকেই কাজ শুরু করব। অভিযুক্ত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সাথে আবারো কথা বলা হবে। আশা করছি, একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত সম্ভব হবে।’