ময়মন‌সিং‌হে তিন বছর আগে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হ‌য়ে‌ছে সরকারি ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি (আইএইচটি)। প্রাতিষ্ঠানিক কয়েকটি ভবন থাকলেও নেই সংশ্লিষ্ট জনবল। শিক্ষা কার্যক্রম চললেও নেই কোনো শিক্ষক। চরম অব্যবস্থাপনা, অধ্যক্ষের পদ শূন্য এবং শিক্ষক-জনবল সংকটে পাঠদান বন্ধ র‌য়ে‌ছে শিক্ষার্থী‌দের। দীর্ঘদিন ধ‌রে জনবল সংকটে খুঁড়িয়ে চলছে অভিভাবকহীন এই সরকা‌রি প্রতিষ্ঠানটি। এই প্রতিষ্ঠানটির দুইটি বিভাগে তিন ব্যাচের ১৫৬ শিক্ষার্থী ভ‌র্তি আছেন। এদিকে জনবলশূন্য প্রতিষ্ঠানটির ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা বর্তমানে চরম হতাশায় ভুগছেন।

শিক্ষার্থীরা দ্রুত এ সংকটের স্থায়ী সমাধানের দাবিতে রোববার (২৯ জুন) সকাল ১০টায় ক‌লেজ ক‌্যাম্পা‌সে মানববন্ধন কর্মসূ‌চি পালন করেছেন।

মানববন্ধ‌নে শিক্ষার্থীরা দাবি জানান, পরিস্থিতির উত্তরণে ক্যাম্পাসে অনতিবিলম্বে স্থায়ী অধ্যক্ষ নিয়োগসহ বিভাগভিত্তিক স্থায়ী শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে সব ব্যাচের জন্য পর্যাপ্ত ক্লাসের ব্যবস্থা ক‌রে বিভাগীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত কর‌তে হ‌বে। একাডেমিক ভবনের সব ক্লাসরুমে পর্যাপ্ত আসবাবসহ অন্যান্য সুবিধা দেয়া, সব সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত আসবাবপ‌ত্রের ব্যবস্থা, ক্যাম্পাসে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যসম্মত ক্যাম্পাস ‌নি‌শ্চিত করা।

খোঁজ নি‌য়ে জানা গে‌ছে, ময়মনসিংহ নগরের মাসকান্দা এলাকায় ২০২২ সা‌লে ক‌লেজ ক‌্যাস্পা‌সের নির্মাণ কাজ ‌শেষ হয়। প‌রে তা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হা‌সিনা উদ্বোধন ক‌রেন।

ক্যাম্পাসে একটি চারতলা একাডেমিক ভবন, প্রশাস‌নিক ভবন, পুরুষ ও নারী শিক্ষার্থী‌দের আবাসিক হল, অধ্যক্ষ, কর্মকর্তা-কর্মাচারীদের পৃথক আবাসন রয়েছে।

ওই ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজিতে ২০২২-২০২৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি ও পাঠ কার্যক্রম শুরু হয়। কোনো জনবল কাঠামো নিয়োগ না হলেও বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদের অধীনে ল্যাবরেটরি ও রেজিওলজি বিভাগে পাঠ কার্যক্রম চালু হয় এ প্রতিষ্ঠানে। বর্তমানে তিনটি ব্যাচে ১৫৬ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন। ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের প্রথম বর্ষের পরীক্ষা ফেব্রুয়ারিতে শেষ হলেও চার মাস পরও ফলাফল পায়নি শিক্ষার্থীরা।

প্রতিষ্ঠানের শুরু থেকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন ডা. মোহাম্মদ ছাইফুল ইসলাম খান। গত ৪ মার্চ ২০২৫ তিনি ময়মনসিংহ জেলা সিভিল সার্জন হিসেবে বদলি হন। এরপর থে‌কে প্রশাসনিক দায়িত্বে আর কাউকে নি‌য়োগ দেয়া হয়‌নি। তবে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে ময়মনসিংহ মেডিক‌্যাল কলেজের দুজন শিক্ষক সপ্তাহে দুদিন করে পাঠ কার্যক্রম পরিচালনা ক‌রেন।

এদিকে, বিভাগভিত্তিক কোনো শিক্ষক না থাকায় গত ছয় মাস ধ‌রে ২০২২-২৩ সেশনের শিক্ষার্থীদের ক্লাস বন্ধ আছে। সবমিলিয়ে তিনটি ব্যাচের ১৫৬ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। ছাত্রদের জন্য ব্যবহারিক কোনো যন্ত্রপাতি এবং ক্লাসে পর্যাপ্ত আসবাবপত্র যেমন- চেয়ার, টেবিল, বেঞ্চ ইত্যাদি দেয়া হয়নি। এছাড়াও হলে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় কোনো আসবাবপত্র বিছানা, চেয়ার, টেবিল ইত্যাদি দেয়া হয়নি। নেই নিরাপত্তাকর্মী।

৯ লাখ ১১ হাজার টাকা বিদ‌্যুৎ বিল ব‌কেয়া থাকায় গত ২৫ জুন বেলা ১১টার দিকে ক্যাম্পাসের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় বিদ্যুৎ বিভাগ। আবাসিক হল ও ক্যাম্পাসে বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষার্থীরা মারাত্মক দুর্ভোগে পড়েন। প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক কোনো লোক না থাকায় শিক্ষার্থীরাই বিদ্যুৎ বিভাগ, স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রশাসনের কাছে দৌড়ঝাঁপ করার পর রাত ১২টার দিকে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়।

ল্যাবরেটরি বিভাগের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী তাজরিন আক্তার পলি জানান, ‘এত সুন্দর একটি কলেজে ভর্তি হয়ে নিজেদেরকে ভাগ্যবান মনে করেছিলাম। পরে দেখি কলেজটি নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত। পুরো ক্যাম্পাস ঘন জঙ্গলে প‌রিণত হয়েছে। রাত-বিরাতে বহিরাগত ছেলেরা ক্যাম্পাসে এসে আনাগোনা করে।’

আরেক শিক্ষার্থী আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, ‘আইএইচটি-তে কোনো স্থায়ী বিভাগভিত্তিক শিক্ষক নেই। মাত্র দুইজন অতিথি শিক্ষক দ্বারা সপ্তাহে দু’দিন দ্বিতীয় ও তৃতীয় ব্যাচের একটি করে ক্লাস নেয়া হয়। কিন্তু প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের কোনো ক্লাসই হয় না। এর ফলে ২০২২-২৩ সেশনের শিক্ষার্থীদের প্রায় ছয় মাস ধরে ক্লাস বন্ধ রয়েছে, যা তাদের শিক্ষাজীবনকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।’

রোববার সকা‌লে স‌রেজ‌মি‌নে গি‌য়ে দেখা যায়, কলেজ চত্বরের চারপাশে আগাছা, ঝোঁপ-ঝাড়ে ভরে গেছে। সাপ আর পোকামাকড়ের ভয় তো আছেই। জমে থাকা আবর্জনার গন্ধে পু‌রো ক‌লেজ ক‌্যাম্পা‌সে অস্বাস্থ্যকর প‌রি‌বেশ বিরাজ কর‌ছে। আবাসিক হলগুলোতে শতাধিক ছাত্রছাত্রী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

জানা গে‌ছে, নিরাপত্তাকর্মী না থাকায় ক্যাম্পাসে দুইবার চুরি ঘটনাও ঘ‌টে‌ছে। ক‌্যাম্পাস চত্বরে রা‌তের বেলায় মাদক‌সেবীর আড্ডা চ‌লে নিয়‌মিত। নিরাপত্তা ব‌্যবস্থা না থাকায় বহিরাগত ও চোরের উৎপাতে অতিষ্ঠ শিক্ষার্থীরা। নারী শিক্ষার্থীরা অনেকেই নিরাপত্তাহীনতায় আত‌ঙ্কে ভুগ‌ছেন। ভ‌য়ে অনেকেই ক্যাম্পাসে না থেকে বাইরে ভাড়া বাসায় অবস্থান করছেন।

ময়মনসিংহ মেডিক‌্যাল কলেজের দুজন শিক্ষক বর্তমানে এখানে অতি‌থি শিক্ষক হিসেবে ক্লাস নিচ্ছেন। তারা হলেন এনাটমি বিভাগের ডা: আতিকুর রহমান ও কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের ডা: জান্নাতুল ফেরদৌস।

শিক্ষক সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক ডা: আতিকুর রহমান ও ডা: জান্নাতুল ফেরদৌস নয়া দিগন্ত‌কে জানান, নিজ দায়িত্বের পাশাপাশি তারা অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজিতে পাঠদান করছেন।

ডা: আতিকুর রহমান বলেন, ‘সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী আমি সপ্তাহে দুদিন সেখানে ক্লাস নেই। এর বাইরে আমার কোনো দায়িত্ব নেই।’

ময়মনসিংহের সিভিল সার্জন ও প্রতিষ্ঠানটির সাবেক অধ্যক্ষ ড. মোহাম্মদ ছাইফুল ইসলাম খান জানান, ‘কলেজটিতে কোনো পদ সৃষ্টি না করে, কোনো নিয়োগ না দিয়ে কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে উদ্বোধন করানো হয়েছে। আমি যতদিন কলেজ অধ্যক্ষের দায়িত্বে ছিলাম ততদিন ঢাকায় বিভিন্ন দফতরে দৌড়াদৌড়ি করে শিক্ষাকার্যক্রম চালিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘কলেজে কোনো শিক্ষক নেই। অধ্যক্ষ পদে কাউকে নিয়োগ দিতে পারছে না। আমি এখন কলেজের দায়িত্বে নেই, তবুও ছাত্রদের দিকে তাকিয়ে এখনো চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের পরিচালক অধ্যাপক ডা: মহিউদ্দিন মাতুব্বরের মতে, ‘জনবল নিয়োগের ব্যাপারটি স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের পরিচালকের নয়। এ বিষয়ে বলতে পারবেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকের দফতরের পরিচালক (প্রশাসন)।’