বরিশালের গৌরনদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে গিয়ে রোগী ও তাদের স্বজন ভয়াবহ ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো: মনিরুজ্জামান সরকারি দায়িত্ব পালনের আড়ালে একটি নির্দিষ্ট বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সাথে যুক্ত হয়ে দীর্ঘদিন ধরে টেস্ট বাণিজ্যে লিপ্ত রয়েছেন।
তাদের অভিযোগ, ডা. মনিরুজ্জামানের নির্ধারিত ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বাইরে ভিন্ন কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে টেস্ট করালে রোগীরা চিকিৎসাসেবা ঠিকভাবে পান না। বরং তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করা হয় এবং প্রকাশ্যে হুমকির শিকার হতে হয়।
উপজেলার পিঙ্গলাকাঠী গ্রামের বাসিন্দা শাহাদাৎ মৃধা জানান, সম্প্রতি টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত তার মামিকে নিয়ে তিনি চিকিৎসার জন্য গৌরনদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান। সেখানে দায়িত্বে থাকা ডা. মনিরুজ্জামান প্রেসক্রিপশনে সরকারি ল্যাবের কোনো উল্লেখ না করে শুধু ৭ নম্বর লিখে এই নম্বর অনুযায়ী টেস্ট করিয়ে রিপোর্ট নিয়ে আসতে বলেন। পরে বাইরে অপেক্ষমাণ একজন ব্যক্তি যাকে দেখে দালাল বলে মনে হয়েছিল তিনি প্রেসক্রিপশনটি হাতে নিয়ে একটি নির্দিষ্ট বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যান। এরপর শাহাদাৎ মৃধা বুঝতে পারেন ওই ৭ নম্বর আসলে স্থানীয় মেমোরিয়াল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সাংকেতিক নম্বর।
শাহাদাৎ মৃধা বলেন, ‘ডাক্তারের কথামতোই আমরা ওই ৭ নম্বর সেন্টার থেকে টেস্ট করিয়ে রিপোর্টসহ ক্যাশ মেমো হাতে নিয়ে গেলে দেখি, তিনি রিপোর্টের চেয়ে মেমোতেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। এবং মেমোটা নিজেই রেখে দিলেন। মনে হলো, রোগীর অবস্থা নয়, বরং কমিশন নিশ্চিত করতেই তার আগ্রহ বেশি।’
ভিন্ন এক বিব্রতকর ঘটনারও কথা উল্লেখ করেন শাহাদাৎ মৃধা। তিনি বলেন, ‘আমরা যখন রিপোর্ট দেখাতে গিয়েছি তখন একই কক্ষে এক নারী রোগী রিপোর্ট দেখাতে গেলে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন ডা. মনিরুজ্জামান। কারণ ওই নারী তার নির্দেশিত ডায়াগনস্টিক সেন্টার বাদ দিয়ে বাইরে অন্য একটি সেন্টার থেকে টেস্ট করিয়েছিলেন। নারী রোগী তখন ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে স্যার, আপনার কথা মতো ৭ নম্বরে গেছিলাম। কিন্তু রিসেপশনের মেয়েটা বুঝতেই পারছিল না আপনি কোন টেস্ট লিখেছেন। তাই বাধ্য হয়ে বাইরে করিয়েছি।’
শাহাদাৎ মৃধা জানান, ‘এই ব্যাখ্যার পর ডা. মনিরুজ্জামান আরো উত্তেজিত হয়ে রোগী ও স্বজনদের সামনেই ফোনে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিককে বলেন, তুই রিসেপশনে কেমন মূর্খ বসাইছিস? টেস্টের নাম পড়তে পারে না! ওরে লাথি মেরে বের করে দে। না হলে আমি এসে লাথি মেরে বের করব। রোগী কেন অন্য জায়গা থেকে টেস্ট করাবে ‘
শাহাদাৎ মৃধার অভিযোগ, এই কথোপকথন এবং আচরণ তার সামনেই ঘটে। তিনি বলেন, ‘একজন সরকারি চিকিৎসকের মুখে এমন ভাষা ও হুমকি হতবাক করার মতো। এতে পরিষ্কার বোঝা যায়, রোগীর চিকিৎসা নয় বরং নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারের স্বার্থ রক্ষা করাই তার মূল লক্ষ্য। খোদ হাসপাতাল প্রধানই যদি রোগীর জায়গায় কমিশনকে অগ্রাধিকার দেন, তাহলে আমরা সাধারণ মানুষ কোথায় যাব?’
শাহাদাৎ মৃধা আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমার রোগীর শরীরে তখন ১০৪ ডিগ্রি জ্বর ছিল। অথচ ডা. মনিরুজ্জামান ওই নারী রোগী ও ৭ নম্বর মেমোরিয়াল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের রিসেপশনিস্টের ওপর এতটাই ক্ষিপ্ত ছিলেন যে মূল চিকিৎসার দিকে নজরই দেননি। এবং প্রেসক্রিপশনে একটি প্যারাসিটামল বা জ্বর কমানোর কোনো ওষুধ পর্যন্ত লিখেননি। বরং গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ ইসোটিড ২০ দু’বার লিখে দিয়েছেন, যা আমাদের রোগীর উপসর্গ অনুযায়ী একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক।’
অভিযোগ সম্পর্কে জানতে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো: মনিরুজ্জামানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিফাত আরা মৌরী বলেন, ‘এই বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ দেখে অবগত হয়েছি। যেহেতু ডা. মনিরুজ্জামান স্বাস্থ্যখাতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, তাই সরাসরি স্বাস্থ্যখাতে আইনগত ব্যবস্থাগ্রহণের আমার সুযোগ নেই। তবে লিখিত অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিশ্চিত করব।’
বরিশাল সিভিল সার্জন ডা. এস এম মনজুর-এ-এলাহী বলেন, ‘এই বিষয়ে আমি অবগত আছি। শিগগিরই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে, যাতে অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগ্রহণ করা যায়।’