রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বঙ্গবন্ধু পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ তথ্য গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক মাহমুদুল হককে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় আরও একটি হত্যা মামলায় শ্যোন এরেস্ট দেখানোর আবেদন করেছে পুলিশ। এদিকে তাঁকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছে শিক্ষার্থী ও তার বিভাগের শিক্ষকরা।

শুক্রবার (২০ জুন) সকালে ওই মামলায় তাকে পুনঃ গ্রেফতারের জন্য মেট্রোপলিটন তাজহাট আমলি আদালতে আবেদন করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা ও তাজহাট থানার ওসি শাহ আলম। আদালত বিকেল পর্যন্ত শুনানীর দিনের আদেশ দেননি।

রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোঃ মজিদ আলী জানান, গ্রেফতার হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাহমুদুল হক বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় গত বছর ১৮ জুলাই নগরীর মর্ডান মোড়ের গুলিতে নিহত অটোচালক মানিক হত্যা মামলার ১৯ নম্বর এজাহারভূক্ত আসামি। তদন্তের স্বার্থে তাকে ওই মামলায় শ্যোন এরেস্ট দেখানোর জন্য আদালতে আবেদন করা হয়েছে। আদালতের আদেশ অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

পুলিশ কমিশনার বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় আন্দোলন প্রতিহত করতে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে এবং বাইরে অভ্যন্তরে ‍পুলিশ পাহারায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, তাতীলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ অঙ্গ ও সহেযাগী সংগঠনের সশস্ত্র ক্যাডার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষার্থী অস্ত্র নিয়ে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছেন। যেসবের ভিডিও ফুটেজ ও ছবি সারা দুনিয়া দেখেছ। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশকিছু শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা, কর্মচারীর নামেও মামলা হয়েছে। সুতরাং এসব বিষয়ে পুংখানুপুংখভাবে তদন্ত হওয়া দরকার। এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনা দরকার। যেহেতু মাহমদুল হক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সম্মানিত শিক্ষক। কিন্তু তিনি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালীন ঘটনার অটোচালক মানিক হত্যা মামলার ১৯ এবং মুদি দোকানী সমেশ উদ্দিন হত্যা মামলার ৫৪ নম্বর আসামি। সে কারণে তাঁকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে পুলিশী হেফাজতে নিয়ে এজাহারনামীয় দু’টি হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আমরা আদালতে সোপর্দ করেছি। আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন। আমরা তার ব্যপারে সব গুলো বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করে চার্জশিট দিবো।

এ ঘটনার পুলিশের তদন্ত সূত্রগুলো জানায়, রংপুর মেট্রোপলিটন কোতয়ালি থানায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক মাহমুদুল হকের বিরুদ্ধে তার ফ্লাটের কাজের রাজমিস্ত্রীকের মারধোরের লিখিত অভিযোগ আছে। এছাড়াই একই থানায় তার ফ্লাটের সমস্যা সমাধানের আলোচনা সভায় মাহবুবুর রহমান নামের এক ব্যাক্তি মাহমুদুল হক ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে গালিগালাজ, হুমকি ধামকি ও মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ এনে সাধারণ ডায়েরী আছে বলেও জানায় পুলিশ।

এর আগে বৃহস্পতিবার (১৯ জুন) বিকেলে তাকে নগরীর ধাপ নিউ ইঞ্জিনিয়ার পাড়া থেকে গ্রেফতার করে মেট্রোপলিটন হাজিরহাট থানা পুলিশ। পরে সন্ধায় তাকে কঠোর নিরাপত্তায় বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ২ আগস্ট নিহত মুদি দোকানী সমেশ উদ্দিন হত্যা মামলায় ৫৪ নম্বর এজাহারভূক্ত আসামী হিসেবে গ্রেফতার দেখিয়ে মেটোপলিটন হাজিরহাট আমলী আদালতে তোলা হয়। বিচারক সোয়েবুর রহমান তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

গত ৩ জুন হাজির হাট থানায় এই হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহতের স্ত্রী আমেনা বেগম। তাতে অভিযোগ করা হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ২০২৪ সালের ২ আগস্ট হাজিরহাট থানার রাধাকৃষ্ণপুর এলাকায় নিজের মুদির দোকানে থাকাকালীন সমেস উদ্দিনকে আসামিরা দোকান থেকে বের করে দেশীয় অস্ত্র, রড ও লোহা দিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় পুলিশের কাছে দেয়। পরে পুলিশ চলে গেলে তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। এই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সহ ৫৪ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করা হয়।

তবে সমেস উদ্দিনেরর কবরের পাশে একটি সাইনবোর্ড দেখা যায়। যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। তাতে লেখা আছে , ‘জাতীয় বীর ছমেছ উদ্দিন। গত ২ আগস্ট ২০২৪ পুলিশ বিভাগের একটি দল তার বাড়িতে প্রবেশ করলে তিনি পুলিশ দেখে দৌড় দিতে গিয়ে পড়ে যায় এবং তিনি সেখানেই স্টক করে মারা যায়। তা নিশ্চিত করে প্রাইম মেডিকেল কলেজের ডাক্টার।’

তবে শুক্রবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে ওই সাইনবোর্ডটি সেখানে আর পাওয়া যায়নি।

এদিকে গতবছর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ১৮ জুলাই গুলিবিদ্ধ হয়ে অটোচালক মানিক মিয়া নিহত হন। ওই ঘটনায় একটি হত্যা মামলা করেন তার মা নুরজাহান বেগম (তারিখ ০৬-০৬-২৫। মামলা নং-৩)। ওই মামলায় ১৯ নম্বর এজাহারভূক্ত আসামি রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাহমুদুল হক। এই মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের,সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সি, সাবেক সংসদ সদস্য জাকির হোসেন সরকার, সাবেক এমপি নাসিমা জামান ববি, আওয়ামী লীগেরকেন্দ্রীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষের পুত্র রাশেক রহমান, রংপুর মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার উত্তম কুমার পাল, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার উৎপল রায়, সহকারী পুলিশ কমিশনার ইমরান হোসেন, সহকারী পুলিশ কমিশনার মোঃ আরিফুজ্জামান, তাজহাট থানার ওসি রবিউল ইসলাম, মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তুষার কান্তি মণ্ডল, মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহবায়ক আবুল কাশেম, তাজহাট থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ইমাদ মিয়া, সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া আলম শিপলুসহ ১১৯ জনের নাম আছে।

মানববন্ধন

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাহমুদুল হককে গ্রেফতারের প্রতিবাদে শুক্রবার সকালে কাম্পাসের মিডিয়া চত্বরে মানববন্ধন করেছে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষকরা।

অন্যদিকে দুপুর আড়াইটায় ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকের সামনে প্রতিবাদ মানববন্ধন ও সমাবেশ হয়েছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে কিছু শিক্ষার্থী। সেখানেও কয়েকজন শিক্ষকও অংশ নেন। এসময় তারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে মুক্তির আল্টিমেটাম দেন। তা নাহলে ক্লাস বর্জনসহ কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলার হুমকি দেন তারা। এসময় মানববন্ধনের সামনে সেনাবাহিনী সারিবদ্ধভাবে অবস্থান নিতে দেখা যায়।

এ ব্য্যপারে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার ডক্টর হারুনুর রশিদ জানান, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক মাহমুদুল হককে হাজিরহাট থানা পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে একটি হত্যা মামলায়। তবে সেটি আমাদের ক্যাম্পাসের নয়। বাইরের ঘটনা। আমরা বিষয়টি নিয়ে খোঁজখবর রাখছি।