দক্ষিণাঞ্চলের জেলা ঝালকাঠিতে চলমান তীব্র তাপদাহে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে রয়েছেন দিনমজুর শ্রেণির মানুষ। প্রখর রোদ ও গরম বাতাস উপেক্ষা করে প্রতিদিন জীবিকার তাগিদে কাজ করতে গিয়ে তারা পড়ছেন মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। সকাল থেকেই সূর্যের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়তে থাকে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে তা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছালে সাধারণ মানুষ ঘরের ভেতর অবস্থান করলেও দিন মজুরদের থেমে থাকার সুযোগ নেই।
শহরের সড়ক, নির্মাণস্থল, বাজার ও গ্রামীণ কৃষিক্ষেত্রে দেখা গেছে, শ্রমিকরা মাথায় গামছা বেঁধে কিংবা ছাতা ব্যবহার করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
ঝালকাঠি পৌর শহরের কেফাইনগর এলাকার নির্মাণশ্রমিক মো: সোহেল গোমস্তা বলেন, ‘রোদে দাঁড়ানোই যায় না, শরীর পুড়ে যায়। কাজ করতে করতে মাথা ঘোরে, চোখে ঝাপসা দেখা যায়। তবুও কাজ বন্ধ করি না, তাহলে সংসার চলবে না।’
রিকশাচালক মো: মজিবর হাওলাদার জানান, গরমে মানুষ কম বের হয়, তাই যাত্রী টানতে পাড়ি কম। এজন্য উপার্জনও কম। আবার এই গরমে রিকশা চালানো খুব কষ্ট। মাঝে মাঝে মনে হয় আর পারবো না, কিন্তু না চালালে আয় নেই। পরিবার নিয়ে দু’বেলা দু‘মুঠো খেতে হলে কষ্টের সীমা দেখা আমাদের মতো লোকের কাজ না।
পৌর শহরের একটি লবনের কারখানায় কাজ করেন নারী শ্রমিক মালা রানী। তিনি বলেন, ‘এই তীব্র গরমে কাজ করা আমাদের জন্য খুবই কষ্টকর হয়ে পড়েছে। এই তীব্র গরমে কাজ করতে করতে শরীর একেবারে ক্লান্ত হয়ে যায়। মাথা ঘোরায়, মাঝে মাঝে অসুস্থও লাগে। কিন্তু কাজ করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।’
কৃষক আক্তার হাওলাদার জানান, এই গরমে মাঠে কাজ করা খুব কঠিন। আমরা খোলা মাঠে রোদে কাজ করি, মাথার ওপর কোনো ছাউনিও থাকে না। অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ে, কিন্তু কাজ থামানো যায় না। এ উপার্জনের টাকা দিয়ে সংসার চালাই।
পরিবেশবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপদাহের প্রকোপ দিন দিন বাড়ছে। ঝালকাঠির মতো উপকূলীয় অঞ্চলে এর প্রভাব আরো বেশি অনুভূত হচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ন, গাছপালা কমে যাওয়া এবং পরিবেশ দূষণ এই পরিস্থিতিকে আরো তীব্র করে তুলছে।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) সদস্য ইসমাঈল মুসাফির বলেন, দিনমজুরদের এই দুর্ভোগ লাঘবে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। রাস্তার পাশে অস্থায়ী বিশ্রামকেন্দ্র স্থাপন, বিনামূল্যে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, তীব্র গরমের সময় কাজের সময়সূচিতে পরিবর্তন এবং শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। এছাড়া সমাজের বিত্তবান ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে পানি ও স্যালাইন বিতরণ কার্যক্রম আরো জোরদার করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ঝালকাঠি সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. মেহেদী হাসান সানী জানান, প্রতিদিন গরমজনিত অসুস্থতার রোগী বাড়ছে। সেইসাথে ডায়েরিয়া আক্রান্ত হচ্ছেন। অনেকেই হিট এক্সহস্টশন বা হিটস্ট্রোকের উপসর্গ নিয়ে আসছেন। তাই সবাইকে বেশি করে পানি পান, স্যালাইন গ্রহণ এবং রোদ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
আন্তর্জাতিক আবহাওয়াবিদ মোস্তফা কামাল পলাশের তথ্যমতে, বরিশাল বিভাগে রোববার রাত পর্যন্ত কোনো বৃষ্টি বা ঝড়ো হাওয়ার সম্ভাবনা নেই।