মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে দীর্ঘদিনের অনাবৃষ্টিতে পুড়ে যাচ্ছে বিস্তীর্ণ চা বাগান। খরায় ঝলসে যাচ্ছে বাগানের এ পাশ থেকে ও পাশ। একইসাথে ক্ষতি হচ্ছে প্লান্টেশনের। ফলে দেখা মিলছে না নতুন কুঁড়ির। নদ-নদী, ছড়া, জলাশয় ও খাল-বিল শুকিয়ে যাওয়ায় চাহিদামতো বাগানগুলোতে সেচ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে এ বছরের চা উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাগান ব্যবস্থাপকরা বলেছেন, মৌসুমের শুরুতেই বৃষ্টি না হওয়ায় চা শিল্প প্রতিকূলতার মুখে পড়ে কমে যাচ্ছে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সম্ভাবনা। এদিকে খরায় নতুন সৃজিত চায়ের ৩০ শতাংশ চারাগাছ ও ১০ শতাংশ পুরনো গাছ পুড়ে গেছে। তবে বাগানের কিছু কিছু টিলায় নিয়মিত সেচ দিয়ে বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করছেন চাষীরা।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, কমলগঞ্জ উপজেলায় ২২টি চা-বাগান রয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ চায়ের টিলা শুকিয়ে গেছে। তাপদাহ আর অনাবৃষ্টির ফলে গাছের কুঁড়ি বাড়ছে না। দেখা মিলছে না নতুন পাতারও। গত তিন-চার মাসে কমলগঞ্জে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় চা বাগানের নতুন সৃজিত গাছগুলো রোদে পুড়ে মারা যাচ্ছে। একইসাথে বৃষ্টির অভাবে নার্সারিগুলোতেও ফড়িংয়ের আক্রমণ বাড়ছে।

এদিকে শীত মৌসুমে চা বাগানে পুরনো চা গাছ উপড়ে ফেলে সেখানে নতুন চারাগাছ লাগানো হয়। বাগানের প্লান্টেশন এলাকার চা গাছ কাটিং করা (আগাছা ছেঁটে দেয়া) হয়। এসবের পর নিয়মিত সেচ দেয়ার প্রয়োজন পড়ে। কিন্ত পানির অভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী চাষীরা।

চা বাগানের একটি সূত্র জানায়, এ সময়ে সাধারণত চা বাগান অঞ্চলে ১৫ সেন্টিমিটার বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। তবে এ বছর এ সময়ে শুরু হয়েছে খরা। মাঘ মাসের বৃষ্টি চা বাগানের জন্য খুবই উপকারী। মাঘে বৃষ্টি না হওয়ায় চা বাগান প্লান্টেশন এলাকাধীন পানির উৎস খুঁজে তা আটকিয়ে কিছু অংশে সেচ দেয়ার চেষ্টা চলছে। এছাড়া যেসব প্লান্টেশন এলাকায় সেচ দেয়া যাচ্ছে না, সেখানকার নতুন সৃজিত চারাগাছ একাধারে মরে যাচ্ছে।

ন্যাশনাল টি কোম্পানির (এনটিসি) মাধবপুর চা বাগানের ব্যবস্থাপক দীপন কুমার সিংহ জানান, ‘গত বছরও অনাবৃষ্টি ও শ্রমিক ধর্মঘটের কারণে চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। এবছরও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে এখন পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার ২০ শতাংশ পাতা উৎপাদন সম্ভব হয়নি। তীব্র খরায় চারাগুলো মরে যাচ্ছে।’

এনটিসির ধলাই ভ্যালির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার শফিকুর রহমান মুন্ন বলেন, ‘চলতি বছর ন্যাশনাল টি কোম্পানি ৭০ লাখ কেজি চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তবে বৃষ্টি না হওয়ায় ও তীব্র খরায় মৌসুমের শুরুতেই চা উৎপাদনে বড় ধাক্কা খেয়েছে এনটিসির প্রায় সকল চা বাগান। অনেক বাগানে চা গাছ পুড়ে লাল হয়ে গেছে। সেচ দেয়া কিছু বাগানে চা গাছে কুঁড়ি দেখা গেলেও তা তুলনামূলক খুবই কম। চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে আমরা শঙ্কিত।’

চা সংসদ বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের চেয়ারম্যান ও জেমস ফিনলে চা কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার গোলাম মোহাম্মদ শিবলী সংবাদ মাধ্যমকে জানান, ‘২০২৪ সালের গ্রীষ্মকালে চা বাগানে তীব্র খরা বয়ে গেছে। তাপমাত্রা ৩০ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পর্যন্ত ছিল। এ তাপমাত্রা গাছের জন্য অনুকূল নয়। এছাড়া সার, সেচ, কীটনাশকের মূল্য বৃদ্ধি, উৎপাদন খরচের কম মূল্যে চা বিক্রির প্রভাবে উৎপাদন কম হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘জাতীয় উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ১০ ভাগ অবদান রাখা এনটিসি চা-বাগানগুলোতে বকেয়া বেতন আদায়ের দাবিতে গত চা মৌসুমে দীর্ঘ সময় জুড়ে শ্রমিকরা ধর্মঘট চালিয়ে বাগানের কার্যক্রম বন্ধ রাখে। সব মিলিয়ে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রায় ব্যাঘাত ঘটে।’