অবশেষে ঘোষিত তারিখের তিন দিন এগিয়ে এনে আনুষ্ঠানিকভাবে ঐতিহ্যবাহী জিআই পণ্য স্বাদে ও গন্ধে অতুলনীয় রংপুরের মিঠাপুকুরের হাঁড়িভাঙ্গা আমের বাজার জাত শুরু হচ্ছে আজ মঙ্গলবার থেকে।
এর আগে ২০ জুন বাজারজাতের তারিখ নির্ধারণ করেছিল কৃষি বিভাগ।
জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে আজকের দিন ধার্য করা হয়। এবার তারিখ নিয়ে কৃষি বিভাগের সাথে চাষি ও ব্যবসায়ীদের সমন্বয়হীনতায় নির্ধারিত তারিখের ১৫ দিন আগেই বাজার সয়লাব হয় হাড়িভাঙ্গায়। কারণ প্রচণ্ড তাপদাহে আম পাকা শুরু হয়েছে আগেই। বাগানে রাখতে পারছেন না চাষীরা। তারিখ জটিলতায় বাজারে এনেও মিলছে না গ্রাহক। আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হলে এই বেচাবিক্রি ও দাম স্বাভাবিক হবে বলে ধারণা দিয়েছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। এবার হাঁড়িভাঙ্গাকে ঘিরে ৫০০ কোটি টাকার বাণিজ্যের আশা কৃষি বিভাগের।
রংপুর আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ প্রকৌশলী মোস্তাফিজার রহমান জানিয়েছেন, গেল দুই সপ্তাহ থেকে রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার উঠানামা করছে ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে আবহাওয়ার পরিবর্তনে প্রচণ্ড তাপদাহে নাকাল জনজীবন। প্রাণ প্রকৃতিতে উত্তাপ। যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ঐতিহ্যবাহী স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয় জিআই পণ্য হাড়িভাঙ্গা আমে। তীব্র তাপদাহে আগেই পাকা শুরু হয়েছে আম। গাছ থেকে ঝরে পড়ছে হাঁড়িভাঙ্গা। কিন্তু কৃষি বিভাগ হাঁড়িভাঙ্গার আনুষ্ঠানিক বাজারজাতের তারিখ নির্ধারণ করেছে ২০ জুন। কৃষকদের সাথে সমন্বয় না করে কৃষি বিভাগ বাজারজাতের তারিখ নির্ধারণ করায় বিড়ম্বনায় কৃষক ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা। তবে বাজারে এনেও দাম পাচ্ছেন না চাষিরা।
সোমবার (১৬ জুন) হাঁড়িভাঙ্গার রাজধানী মিঠাপুকুরের পদাগঞ্জে গিয়ে দেখা গেছে, গাছ ভরা আম পেকে যাচ্ছে। কৃষি বিভাগের দেয়া তারিখের অপেক্ষায় নেই কৃষকরা। কৃষক, ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা ও দোকানিরা জানিয়েছেন, গেল বৈরী আবহাওয়ার কারণে ঈদের দুদিন পর থেকে পদাগঞ্জ, আখিরাহাট, কদমতলি, মাঠেরহাটসহ ওই এলাকার হাঁড়িভাঙ্গার বাজারগুলোতে আমে সয়লাব।
প্রতিদিন ভোর থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত হাঁড়িভাঙ্গা নিয়ে বাজারে আসছেন চাষিরা। কিন্তু বাজারজাতের তারিখ জটিলতায় সেভাবে বাজার পাচ্ছেন না তারা। বাজারজাতের তারিখ এগিয়ে না আনায় পরিস্থিতি ঘোলাটে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকার এবং অনলাইন ব্যবসায়ীরা আম কিনছেন না। ভরসা স্থানীয় গ্রাহক। যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে দামে। এতে ক্ষুব্ধ চাষি ও ব্যবসায়ীরা।
পদাগঞ্জ বাজারে তিনটি ভ্যানে করে ৩৬ ক্যারেট আম এনেছেন বাগানি আশরাফুল ইসলাম। তিনি জানান, সকাল থেকে বসে আছি। একভ্যান আমও বিক্রি করতে পরিনি দুপুর পর্যন্ত। হাঁড়িভাঙ্গা আম বাজারজাতে এবার মাঠ পর্যায় থেকে তারিখের সিদ্ধান্তটা নেয়া হয় নি। এই আমের অনেক বাগানের বয়স ৩০ বছরেও বেশি। এই বাগানগুলোর আম আগে পাকে। তার ওপর এবার গরম। বাজারে আমে সয়লাব হয়ে গেছে। কিন্তু বাইরের গ্রাহক নেই। কারণ মানুষ জানে ২০ জুন থেকে আম ছেড়া শুরু হবে। ফলে বাইরের পার্টি নেই, বেচাবিক্রি তুলনামূলকভাবে কম। এজন্য বাজারে আমের দামও পাচ্ছেন না বিক্রেতারা।
বয়োবৃদ্ধ হাঁড়িভাঙ্গা চাষি পদাগঞ্জ বাজারের ঠিক মোড়েই ভ্যানের ওপরে বসে আছেন কড়া রোদে। কপাল ছুঁয়ে ঘাম পড়ছে। কী অবস্থা বেচাবিক্রির জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ন্যাওছে না বা। হাজার বারো শ’ টাকা কয়। না নিলে কাক দেমো। বাজার খারাপ যে।’ কেন বাজার খারাপ এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, ‘আমদানি বেশি। এ্যালাও পার্টিরা আইসে নাই। ওমরা আইসলে বাজার পামো বা।’
চাষি আব্দুল মালেক জানান, ‘হামরা চিপাত পড়ি গেছি বা। গরমের কারণে আমটা গাছোত থাইকতেছে না। পাইকতেছে। এতি আম পাড়ার ডেট দিচে দেরি করি। তিন ক্যারেট আম আনছি। তার এক ক্যারেট আমই পাকা। হাটোত পার্টিও নাই। গাছোত আমও থাইকতেছে না।’
আদম শফিউল্লাহ নামের এক চাষী জানান, আমার প্রায় ৩০০ গাছ আছে চারবিঘা জমিতে। আম চাষে প্রচুর খরচ। কিন্তু এবার বাজার শুরুতে একেবারেই কম। হাড়িভাঙ্গা ম্যাচুইড হয়ে আসছে। ওয়েদারের কারণে ঝড়ে পড়ছে। দ্রুত পেকে যাচ্ছে। আম বাজারে নিয়ে আসতেছি। কিন্তু দাম পাচ্ছি না।’
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি অফিসের অতিরিক্ত পরিচালক শফিকুল ইসলাম জানান, ‘হাঁড়িভাঙ্গার এবার বাম্পার ফলন হয়েছে। আমও বড় হয়েছে। সাধারণত ১৫ থেকে ২০ জুনের মধ্যে আমরা বাজারজাতের তারিখ দেই। সেকারণে এবার ২০ জুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। যেহেতু এবার গরমটা খুবই বেশি। আম পরিপক্ব হয়েছে। সেকারণে জেলা প্রশাসক মহোদয়ের সাথে সমন্বয় করে ১৭ জুন বাজারজাতের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।’
এই কৃষি কর্মকর্তা জানান, এবার রংপুর জেলার শুধু মিঠাপুকুরে এক হাজার ৫০০ হেক্টরসহ সারাদেশে প্রায় ৫ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে হাঁড়িভাঙ্গার বাগানে আম উৎপাদন হয়েছে। প্রতি মেট্রিক টনে প্রায় ১৫ হেক্টরেরও বেশি ফলন হবে বলে আমরা আশা করছি। সে হিসেবে এবার ৮২ হাজার মেট্রিক টন বা ২০ লাখ মন হাঁড়িভাংগার উৎপাদন হবে। আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হওয়া মাত্রই দামও ভালো পেতে শুরু করবেন সংশ্লিষ্টরা। এবার ৫০০ কোটি টাকার হাঁড়িভাঙ্গা বেচাবিক্রি হবে বলেও আশা করেছেন তিনি।
এদিকে আজ (মঙ্গলবার) সকাল ১০টার দিকে রংপুরের পদাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয় মাঠে চাষি ও ব্যবসায়ীদের সাথে মতবিনিময় সভার মাধ্যমে হাঁড়িভাঙ্গার আনুষ্ঠানিক বাজারজাতের উদ্বোধন করবেন ডিসি মোহাম্মদ রবিউল ফয়সাল।
রংপুরের ডিসি মোহাম্মদ রবিউল ফয়সাল জানান, গরম আবহাওয়ার কারণে এবার রংপুরের ঐতিহ্য জিআই পন্য আগে থেকেই পরিপক্ব এবং পাকা শুরু হয়েছে। সেকারণে আমরা কৃষি বিভাগের সাথে কথা বলে বাজারজাতের দিনক্ষণ তিন দিন এগিয়ে নিয়ে এসেছি। আরো এগিয়ে আনতে পারলে ভালো হতো।
তিনি বলেন, আশা করি, কৃষকরা ভালো দাম পাবেন। আম বেচাবিক্রি নির্বিঘ্ন করতে আমরা সকল উদ্যোগ নিয়েছি। জিআই পণ্যেও পান অক্ষুণ্ন রাখতে এবং ঐতিহ্য ধরে রাখতে গাছে হরমোন প্রয়োগ এবং আমে কেমিক্যাল প্রয়োগ থেকে বিরত রাখতে হবে। যদি কেউ সেটা করেন তাহলে আইনিব্যবস্থা নেয়া হবে।
উল্লেখ্য, ৭০ বছর আগে ডিমলার রাজা তাজবাহাদুর সিংয়ের বাগানবাড়ি থেকে একটি কলম চারা নিয়ে এসে লাগিয়েছিলেন মিঠাপুকুরের খোড়াগাছ ইউনিয়নের তেকানি গ্রামের নফল উদ্দিন পাইকার। সেই গাছ থেকেই আজকের হাঁড়িভাঙ্গা আম। যা এই অঞ্চলের প্রান্তিক অর্থনীতিকে করেছে চাঙ্গা।
ঐতিহ্যবাহী স্বাদে ও গন্ধে অতুলনীয় রংপুরের এই হাঁড়িভাঙ্গা আমকে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদফতর (ডিপিডিটি)।