সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে কোনো ষড়যন্ত্র বরদাশ্ত করা হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সিলেটের বিশিষ্টজনেরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রগতিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানানো হয় এক মতবিনিময় সভায়।

বুধবার (২৩ এপ্রিল) সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজে ‘সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক এই সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় বক্তারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী কার্যালয়ে ভাঙচুরকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

এর আগে মঙ্গলবার (২২ এপ্রিল) দৈনিক নয়া দিগন্তে প্রকাশিত ‘সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্যাসিবাদের দোসরদের ভয়ঙ্কর ফাঁদ’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি নিয়েও আলোচনা হয়।

মতবিনিময় সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ডা. মো: ইসমাইল পাটওয়ারী বলেন, প্রতিষ্ঠার আট বছর হতে চললেও বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো অগ্রগতি নেই। এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয়। সাবেক ভিসি মোর্শেদ আহমদ চৌধুরীর সময়ে গণহারে নিয়োগ বাণিজ্যের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রগতি হয়নি।

তিনি বলেন, সাবেক ভিসি মোর্শেদ চৌধুরীর সময় অনিয়ম ও অনৈতিক উপায়ে গণহারে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। যেখানে নিয়োগে সিন্ডিকেটের পূর্বানুমোদন ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো সংবিধি ছিল না। ফলে পরবর্তীতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) নিয়োগে নিষেধাজ্ঞা দেয়। মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির নির্দেশে পূর্ববর্তী ভিসির সময় থেকেই বেতন ভাতা বন্ধ রয়েছে। এখানে বিধির বাইরে গিয়ে কোনোভাবেই আমি বেতনভাতা চালু করতে পারবো না।

ভিসি বলেন, ‘আমি যোগদানের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে যাচ্ছি। সংবিধি চ্যান্সেলরের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে, সেটা পাশ হলে সিন্ডিকেটে অনুরোধ করবো, আগে যারা অস্থায়ীভাবে কর্মরত ছিলেন, তাদের বয়সের বিষয়টি শিথিল করার, সিন্ডিকেট অনুমতি দিলে সকলে আবেদন করতে পারবে। তখন যারা যোগ্য, চাকরির ধারাবাহিকতা আছে, তাদের বিষয়টি বোর্ড বিবেচনা করবে।’

তিনি বলেন, ‘আমি যোগদান করে ইনভেনটরি করেছি। অনেক নথিপত্র গায়েব করে দেয়া হয়েছে, আপনারা জানেন, কারা এই লুটপাট, হামলা ও ভাঙচুর করেছে, ইতোমধ্যে পত্র-পত্রিকায় তাদের নাম এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রায় কেউ বাধা সৃষ্টি করলে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। এজন্য সিলেটবাসীর সহযোগিতা প্রয়োজন। আপনারা জানেন, কারা এসব করছে, এরা ৫ আগস্টের আগে ফ্যাসিবাদের সমর্থক ছিল, অনৈতিক উপায়ে চাকরি নিয়েছে, এখন আবার বৈষম্যবিরোধী সেজে আন্দোলন করছে। এরাই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, অতএব, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে এখন আর কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।’

ভিসি অধ্যাপক ডা. মো: ইসমাইল পাটওয়ারী আরো বলেন, ‘মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শুধু আন্ডার গ্র্যাজুয়েটের পরীক্ষা নেয়া নয়, এটি একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিধি বিশাল। বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ফ্যাকাল্টি ডেভেলপ করার বিকল্প নেই। আপনারা সহযোগিতা করলে আমি রিসার্চ বেইজড একটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলবো। ফ্যাকাল্টি ডেভেলপ করবো। স্বপ্নের এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সিলেটবাসীর সহযোগিতা প্রয়োজন।’

সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ও সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. মো: জিয়াউর রহমান চৌধুরীর উপস্থাপনায় স্বাগত বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন কোষাধ্যক্ষ মো: শাহ আলম।

সিলেট জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে সিন্ডিকেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তাই নিয়োগ-সংক্রান্ত যাবতীয় জটিলতা সিন্ডিকেটে আলোচনা করে দ্রুত নিরসন করা হোক। যারা ক্যাম্পাসে ভাঙচুরের সাথে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে তিনি সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী বলেন, ১১তম সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত বহাল আছে কি না, আমি জানতে চাই। যদি সেটা বহাল থাকে, তাহলে যে ৫০ জনকে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে, তাদের নিয়োগ দেবেন কি না। আর নিয়োগ বাতিল হলে কোনো সমস্যা তৈরি হবে কি না। এগুলো নিয়ে ভাবতে হবে।

তবে বিশ্ববিদ্যালয় বাঁচাতে যেকোনো অপচেষ্টা রুখে দেয়া হবে বলেও জানান তিনি।

সিলেট মহানগর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, লোকবলই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় সঙ্কট। এখানে নিয়োগে অনেক অনিয়ম দুর্নীতি হয়েছে, নতুন করে যাতে আর কোনো অনিয়ম দুর্নীতি না হয়।

তিনি বলেন, ২০২২ সালে আগে নিয়োগকৃতদের অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। আগের ভিসির সময় থেকে তাদের বেতনভাতা বন্ধ করা হয়েছে। তাই তাদেরকে নিয়োগ দিলে আইনের ব্যত্যয় ঘটবে। তবে যাদের চাকরির ধারাবাহিকতা আছে, তাদের বিষয়টি মানবিক।

তিনি বলেন, আগে যারা জয় বাংলা স্লোগান দিত, এখন তারাই আবার বৈষম্যবিরোধী। এদের বিরুদ্ধে মামলা করা হোক। ফ্যাসিবাদের দোসরদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া না হলে বিশ্ববিদ্যালয় মুখ থুবড়ে পড়বে।

সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরী বলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ বাণিজ্য হয়েছে, এটা সবাই অবগত। অনেক নিরীহ মানুষ ঘরবাড়ি বিক্রি করে এখানে চাকরি নিয়েছে, আপনারা জানেন, আমাদের দেশে কর্মসংস্থান কম, তাই অনেকে টাকা পয়সা দিয়ে চাকরি নেয়। যারা নিয়োগ পায় তারা নিরীহ, তাই যাতে কোনো নিরীহ মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ না হয়, আমরা ভিসি মহোদয়কে অনুরোধ করবো, সেটা বিচেনায় রাখতে।

তবে যারা ভাঙচুরের সাথে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান তিনি।

মতবিনিময় সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন ডা. ওয়েছ আহমদ চৌধুরী, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল উমর রাশেদ মুনির, সিলেট উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. শাহানা ফেরদৌস চৌধুরী।

এছাড়া মতবিনিময় সভায় বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রতিনিধি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধি, পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি, গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বক্তব্য রাখেন।