চট্টগ্রামে খাল, নর্দমা, নালায় পড়ে মৃত্যুর মিছিল থামছে না। শিশু থেকে বৃদ্ধ, গত চার বছরে অন্তত ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে এসব উন্মুক্ত নালা ও খালে পড়ে। সবশেষ গত শুক্রবার রাতে খালে পড়ে মৃত্যু হয় ছয় মাসের শিশু সেহরিশের। এ নিয়ে গত চার বছরে খালে পড়ে মৃত্যুর সংখ্যা ছাড়াল সাতজনে।

গত ১৯ এপ্রিল শনিবার ১৪ ঘণ্টা পর সেই শিশুর লাশ ভেসে উঠে ঘটনাস্থল থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে চাক্তাই খালে। যেখানে লাশ ভেসে উঠেছে তার কাছেই সেহরিশের বাড়ি।

খালে পড়ে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় নগরবাসী ক্ষোভে ফেটে পড়েছে। মৃত্যুর দায় নিয়ে আবার উঠেছে নানা প্রশ্ন-সমালোচনা। মৃত্যু ঠেকাতে দু’বছর আগে খাল পাড়ে রেলিং দেয়া হলেও শতভাগ করা হয়নি।

হিজরা খালের পাড়েও ছিল না রেলিং। তাই ব্যাটারিচালিত রিকশা উল্টে ফের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) বলছে, নগরীর ১৯ খালে রেলিং দেয়া হয়েছে। অর্থ বরাদ্দ না থাকায় হিজরা খালসহ কয়েকটি খালে রেলিং দেয়া হয়নি। রেলিং থাকলে রিকশা উল্টে দুর্ঘটনা ঘটত না।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০৭ সালের ১১ জুন ভারী বর্ষণে চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে এক দিনে ১২৫ জনের মৃত্যু হয়। এটি ছিল চট্টগ্রামের ইতিহাসে প্রাকৃতিক দুর্যোগে এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা। পাহাড়ের পাদদেশে বেশিরভাগের মৃত্যু হলেও ওই দিন খালে তলিয়ে যায় অন্তত চারজন। গত চার বছরে কোনো ধরনের বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়া শুধু অনিরাপদ খালে পড়ে মারা যায় সাতজন।

এর মধ্যে ২০২১ সালের ২৫ আগস্ট ভারী বর্ষণে সময় মুরাদপুর মোড়ে টইটম্বুর খালপাড়ে সবজি বিক্রেতা সালেহ আহমেদ খালে পড়ে নিখোঁজ হন। তাকে উদ্ধারে দীর্ঘ সময় ধরে চলে অভিযান। শেষ পর্যন্ত তার লাশের খোঁজ মেলেনি। এখনো পথ চেয়ে আছে সালেহ আহমেদের পরিবার।

নিখোঁজ সালেহ আহমদ চট্টগ্রামের পটিয়া উপহেলার কুসুমপুরা ইউনিয়নের মনসা এলাকার বাসিন্দা। তিনি নগরীর চকবাজারে সবজি বিক্রি করতেন। তার ছেলে সাদেকুল্লাহ মহিম নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘আমি এক দুর্ভাগা সন্তান, আমার বাবাকে কবর পর্যন্ত দিতে পারিনি। বন্ধু-বান্ধব বাবার কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়ায় কিন্তু আমার সেই সৌভাগ্যও হয়নি।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমার বাবা পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। বাবাকে হারালেও কারো থেকে কোনো ক্ষতিপূরণ পাইনি। সে সময় সিটি করপোরেশন থেকে একটা পেট্রোল পাম্পে শ্রমিকের কাজ দেয়া হয়েছিল। আমি তাদের বলেছিলাম পড়ালেখা চালিয়ে নিতে অন্তত পিয়ন পদে হলেও নিয়োগ দিতে কিন্তু তারা দেয়নি। পরে পড়ালেখা চালিয়ে নিতে চাকরি ছেড়ে দেই। টিউশনি করে কোনোরকমে সংসার চালাচ্ছি।’

একই বছর ২৭ সেপ্টেম্বর আগ্রাবাদ এলাকায় হাঁটার সময় নালায় পড়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী সেহেরীন মাহবুব সাদিয়া মারা যান। সে সময় প্রচণ্ড ক্ষোভে ফেটে পড়ে নগরবাসী। ক্ষোভ প্রশমনে তড়িঘড়ি করে সেই খাল পাড়ে দেয়ালের পাশাপাশি ঘেরা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু খালে পড়ে থামেনি মৃত্যুর মিছিল।

২০২২ সালে ষোলশহর এলাকায় শিশু কামাল নালায় পড়ে নিখোঁজ হয়। তিন দিন পর মুরাদপুরে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। ২০২৩ সালের ২৭ আগস্ট আগ্রাবাদ রঙ্গীপাড়া এলাকায় ১৮ মাসের শিশু ইয়াছিন আরাফাত নালায় পড়ে নিখোঁজ হয়। ১৭ ঘণ্টা পর পরদিন ২৮ আগস্ট তার লাশ উদ্ধার হয়।

২০২৪ সালের ২৭ মে নগরের আসাদগঞ্জের কলাবাগিচা খালে পড়ে ২৫ বছর বয়সি এক যুবকের মৃত্যু হয়। ওই দিন বিকেল ৪টার দিকে অজ্ঞাত পরিচয়ের ওই যুবক খালে পড়ে যান। সাড়ে ৪টার দিকে তাকে উদ্ধার করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পরে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। গত বছরের জুনে গোসাইলডাঙ্গা এলাকায় সাত বছরের শিশু সাইদুল ইসলাম নালায় পড়ে নিখোঁজ হয়। এক দিন পর সেই এলাকার নাসির খাল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। সবশেষ শুক্রবার রাতে চকবাজারের হিজরা খালে রিকশা উল্টে পড়ে যায় শিশু সেহরিস। ১৪ ঘণ্টা পর শনিবার সকাল ১০টার দিকে তার লাশ উদ্ধার করে স্থানীয় জনতা।

চট্টগ্রাম শহরে খোলা নালা ও ড্রেনের কারণে একের পর এক প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প কাজ চলাকালে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খাল-নালা সংস্কারের সময় নিরাপত্তার প্রচলিত নিয়মগুলো উপক্ষো করা হয়। এতে একের পর মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। সবশেষ শুক্রবার রাতে শিশু সেহেরিস পড়ে যায় হিজরা খালে। সেই খাল পাড়ে দেয়াল না থাকায় রিকশাটি উল্টে গেলে পড়ে যায় খালে। যদি নগরীর অন্য বড় খালের মতো রেলিং থাকত তবে রিকশা উল্টে খালে পড়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটত না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন চট্টগ্রাম মহানগরী সভাপতি এস এম লুৎফর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘আমাদের চট্টগ্রামে খাল খননের মতো মহাকর্মযজ্ঞে সেফটি বলতে কিছুই নেই। তারা শুরু থেকেই সেফটি নিদের্শনা ফলো করছে না। হিজরা খালে কেন একটা রিকশা পড়ে যাবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণে খালে পড়ে মৃত্যুর ঘটনা আগেও ঘটেছে। এখনও ঘটছে।’

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস বলেন, ‘বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার অনুদান হিসেবে আমাদের ৬৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের দিকে আমরা হিজরা খাল সম্প্রসারণ খনন ও রেলিং দেয়ার কাজ শুরু করতে চাই।’