বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির শীর্ষ দু’নেতার দলীয় পদ থেকে পদত্যাগ নিয়ে নানামুখী রাজনৈতিক আলোচনা চলছে বিভিন্ন মহলে। মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে এই দু’নেতার পদত্যাগ ঘিরে ওঠে আসছে সেখানকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি।

দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি চেয়ে মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও চলমান আহ্বায়ক কমিটির ১ নম্বর সদস্য রফিকুল ইসলাম লাবু ও উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো: গোলাম ওয়াহীদ হারুন আবেদন করেন।

জানা গেছে, রফিকুল ইসলাম লাবু পদত্যাগপত্র জমা দেন ২২ এপ্রিল এবং গোলাম ওয়াহীদ হারুন পদত্যাগ করেন গত ৮ মার্চ।

বিএনপি নেতা লাবু তার পদত্যাগপত্রে কমিটির নেতাদের শৃঙ্খলাবর্জিত কর্মকাণ্ড, সমন্বয়হীনতা, অবাঞ্ছিত কার্যক্রম ও ব্যাপক অনিয়মের কথা বলেছেন। পাশাপাশি তিনি এক খোলা চিঠিতে উপজেলা নেতাদের বিরুদ্ধে চর দখল, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির অভিযোগ এনেছেন তিনি।

লাবু পদত্যাগপত্রে বলেন, বর্তমান কমিটির নেতারা মেহেন্দিগঞ্জে বিএনপির কর্মকাণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করায় তিনি পদত্যাগ করেছেন। এছাড়া খোলা চিঠিতে উল্লেখ করেন, কমিটির নেতারা অসাংগঠনিক আচরণ ও দলের ভাবমর্যাদা নষ্ট করছেন। তারা অনবরত চর দখল ও সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি চালিয়ে মেহেন্দিগঞ্জকে লুটপাটের আখড়ায় পরিণত করেছেন। এসব জেলা ও কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে জানানো হলেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি। এমন ঘৃণিত কাজের দায়ভার নিতে তিনি ব্যক্তিগতভাবে অপারগ। তাই বর্তমান কমিটির ১ নম্বর সদস্যপদ থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এর আগে একই অভিযোগ তুলে কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক মো: গোলাম ওয়াহীদ হারুন পদত্যাগ করেন। তিনি পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেছেন, মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির বিতর্কিত কর্মতৎপরতা, অসাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, নেতাকর্মীদের সাথে সমন্বয়হীনতা ও ইতোমধ্যে কুড়ানো দুর্নামের ভাগীদার না হবার দৃঢ় প্রত্যয়ে ৮ মার্চ থেকে কমিটির যুগ্ম আহ্বায়কের পদ থেকে পদত্যাগ করলাম।

সার্বিক বিষয়ে মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক গিয়াসউদ্দিন দিপেন নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘যে দু’জন পদত্যাগ করেছেন তারা দীর্ঘদিন যাবত দলীয় কোনো কর্মসূচিতে আসেন না, নিষ্ক্রিয় এই দু’নেতার পদত্যাগে মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা বিএনপিতে কোনো প্রভাব পড়বে না। তাদের অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।’

এ বিষয়ে বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জ) আসনের সাবেক এমপি ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য মেজবাউদ্দিন ফরহাদ বলেন, ‘এ কমিটি থেকে এর আগে ওয়াহীদ হারুন আর এবার রফিকুল ইসলাম লাবু পদত্যাগ করেছেন। অন্য নেতাদের চাঁদাবাজির কারণে তারা পদত্যাগ করেছেন। বিএনপির প্রকৃত রাজনীতি মেহেন্দিগঞ্জে নেই। সেখানে কেবল চাঁদাবাজি চলে।’

বরিশাল উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক দেওয়ান মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ বলেন, ‘লাবু পদত্যাগের বিষয়ে আমার সাথে আলাপ করছিলেন। সেখানকার কমিটিটাই বিতর্কিত। এর আগে যুগ্ম আহ্বায়ক ওয়াহীদ হারুন পদত্যাগ করেন। এ নিয়ে পাঁচ সদস্যের দু’জন পদত্যাগ করায় কমিটি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আমরা দ্রুততম সময়ে মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির কমিটি পুনর্গঠন করব।’

মেহেন্দিগঞ্জে বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও দখলবাজি প্রসঙ্গে দেওয়ান শহিদুল্লাহ বলেন, ‘এর আগে এসব নিয়ে তদন্ত হয়েছে। কিন্তু যারা ভিকটিম, তারা সামনে এসে বলতে সাহস পান না।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা বিএনপি দু’টি ভাগে বিভক্ত। একটি অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক এমপি মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদ এবং অপর অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহসান। ৫ আগস্টের পর স্থানীয় রাজনীতিতে কোণঠাসা হয়ে আছেন ফরহাদের অনুসারীরা।

এদিকে গত ৫ আগস্টের পর থেকেই উপজেলা বিএনপির একাংশের বিরুদ্ধে চরের জমি দখল, গরু লুট, নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে বিক্রি, মাটি লুটসহ চরের জমির ফসল লুটের অভিযোগ ওঠে। কিন্তু কোনো অভিযোগেরই তদন্ত করেনি বরিশাল উত্তর জেলা বিএনপি।

ইতঃপূর্বে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের দায়ে উপজেলা, পৌর এবং ইউনিয়ন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের কয়েকজন নেতাকে সাময়িক শাস্তির আওতায় আনে কেন্দ্রীয় বিএনপি। তবে উপজেলা বিএনপির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত হয়নি কখনো।

মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা বিএনপি নেতাদের বিতর্কিত অপতৎপরতার কথা স্বীকার করেছেন উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক দেওয়ান শহিদুল্লাহ। তিনি বলেন, ইতঃপূর্বে উপজেলা কমিটির নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে ছোটখাটো কিছু অভিযোগ পেয়েছি। যেটা সংগঠন কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে হয়েছে। তবে এ নিয়ে কেউ কোনো অভিযোগ করেনি।

রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ অস্বীকার করে পদত্যাগকারী নেতারা মোবাইল ফোনে নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে বিএনপির অধিকাংশ কর্মসূচিতে আমরা ছিলাম। এখন যারা নেতা দাবি করছেন তারা কোথায় ছিলেন প্রশ্ন তুলে তারা বলেন, ‘গত ছয় মাস ধরে রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকার দাবি কিছুটা সত্যি। যখন দেখলাম দলের সাংগঠনিক যে উদ্দেশ্য তা থেকে আমাদের অনেক লোক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছে তখন তাদের থেকে বেরিয়ে আসি। আমাদেরকে রাজনৈতিক কোনো কর্মসূচিতে ডাকা হয় না বা জানানো হয় না। এ কারণে দল থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিই। যেই কমিটির নেতারা মানুষের কল্যাণে না থেকে দলের বদনাম করে নিজেদের আখের গোছায় তাদের সাথে না থাকাটাই উত্তম বলে মন্তব্য করেন তিনি।’