সিলেট নগরীর কাজির বাজারে রেস্টুরেন্টে চা দিতে দেরি করায় প্রকাশ্য দিবালোকে কর্মচারী রুমন হত্যা মামলার প্রধান আসামি আব্বাসের (৫৫) তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

সোমবার (২১ জুলাই) সিলেট মেট্রোপলিটন আদালতের অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ১ নম্বর আমলী আদালতের বিচারক মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ রিমান্ড আবেদনের শুনানি শেষে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

সূত্রে জানা গেছে, সিলেট নগরীর কাজির বাজারে চা দিতে দেরি করায় কর্মচারী রুমন (২২) খুনের হুকুম দাতা, মামলার প্রধান আসামি কারাগারে থাকা আব্বাসের রিমান্ড আবেদনের শুনানি হয় ২১ জুলাই সোমবার। পুলিশের পক্ষ থেকে সাত দিনের রিমান্ডে আবেদন করা হয়। আব্বাস পুলিশের কাছে রুমন খুনের ঘটনা স্বীকার করলেও আদালতে স্বীকার না করায় রিমান্ডের আবেদন করে কোতোয়ালি থানা পুলিশ।

কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াউল হক গতকাল সোমবার রাতে নয়া দিগন্তকে জানান, এ মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা লামাবাজার পুলিশ ফাঁড়ির আইসি উপ পুলিশ পরিদর্শক আলী খানকে বাদ দিয়ে এসআই শিপলু চৌধুরীকে নতুন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়েছে মামলার অগ্রগতির জন্য। আদালত রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। আশা করি, জিজ্ঞাসাবাদে মূল ঘটনা বেরিয়ে আসবে।

এর আগে, গত ১৪ জুলাই আটকের পর আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয় এ মামলার প্রধান আসামি আব্বাসকে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানা পুলিশের এসআই শিপলু চৌধুরী সোমবার রাতে নয়া দিগন্তকে জানান, জড়িতদের গ্রেফতার করতে দিনরাত চেষ্টা করা হচ্ছে। আশা করি, মূলহোতা প্রধান আসামিকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে মূল ঘটনা বেরিয়ে আসবে। তখন আদালতে মূল ঘটনা উপস্থাপন করা যাবে।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, আসামি আব্বাস মিয়া ১৩ জুলাই সকাল ৭টায় কাজির বাজার ‘শাপলা হোটেল’ নামক চায়ের দোকানে চা খাওয়ার জন্য যান। তিনি দোকানের কর্মচারী রুমনকে চা দিতে বলেন। কিন্ত চা দিতে দেরি হবে বলায় রোমানকে গালিগালাজ ও মারধর শুরু করেন। বিষয়টি স্থানীয়ভাবে দোকানের মালিক ও উপস্থিত লোকজন মিমাংসা করে দেন। কিন্তু সকাল ৯টায় আব্বাস মিয়া তার ছেলে খোকন ( ৩৫), মোহন (৩৭), রোকন (৩০), রুহানসহ (২৫) অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের নিয়ে এই চায়ের দোকানের ভেতরে ঢুকে শাটার বন্ধ করে কর্মচারী রুমনের ঊপর চালান অমানবিক নির্যাতন। দেশীয় অস্ত্র দিয়ে একের পর এক বেধড়ক মারতে থাকেন রুমনকে। বুক আর শরীরজুড়ে মারাত্মক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে চা দোকানের কর্মচারী খুন হওয়া দিদার আহমদ রুমনের শরীরে। মৃত্যু নিশ্চিত করার পর কিলিং মিশন শেষ করে আব্বাস বাহিনীর প্রধান আব্বাস তার বাহিনী নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত থাকায় কেউ তাদের আটকাতে সাহস করেনি।

ঘটনার মূলহোতা আব্বাস (৫৫) তোপখানায় একটি কলোনিতে ভাড়া থাকেন দীর্ঘদিন থেকে। তার মূল বাড়ি সুনামগঞ্জে। দীর্ঘদিন থেকে সিলেটে থাকার সুবাদে একটি বিশেষ মহলের শেল্টারে আব্বাস গড়ে তুলেছেন একটি অপরাধী সিন্ডিকেট। কেউ কেউ মৎস্যজীবী হিসেবে আব্বাসকে চিনলেও অন্যরা চিনেন রেলওয়ে স্টেশনের টিকেট কালোবাজারি হিসেবে। দীর্ঘদিন আগ থেকে আব্বাস সিলেট শহরে এসে আওয়ামী লীগের নেতাদের শেল্টারে অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করলেও ৫ আগস্টের পর অন্য একটি প্রভাবশালী দলের নেতার ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছেন। আব্বাসের বিরুদ্ধে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলার সাহস করে না।

গভীর রাত থেকে ভোর রাত পর্যন্ত আব্বাসের ছেলেরা সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে কাজির বাজার রোডের বিভিন্ন পয়েন্টে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ওঁৎ পেতে থাকে। ঘটায় বিভিন্ন অপকর্ম চুরি, ছিনতাই। কিন্তু মানুষজন ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে নালিশ পর্যন্ত করে না। আব্বাসের সকল ছেলে অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বের হয় ঘর থেকে। ঘটনার দিন আব্বাসের ছেলেরা বাইরে ছিল। খবর পেয়ে আসতে দেরি হয়। ৭টার সময় আব্বাসের সাথে রুমনের কথা কাটাকাটি হলেও ৯টায় ছেলেদের নিয়ে এসে হত্যাকান্ড ঘটান আব্বাস। মামলার আসামিদের গ্রেফতার ও ফাঁসির দাবিতে নিহত রুমনের এলাকা দক্ষিণ সুরমার মোগলা বাজার জালালপুর ছাড়াও সিলেট নগরীতে চলছে একের পর এক বিক্ষোভ।

জালালপুর এলাকার বাসিন্দা আজাদ মিয়া জানান, ন্যায়বিচার বঞ্চিত হলে রুমন হত্যা মামলা নিয়ে রাজপথে সোচ্চার হবে এলাকাবাসী।

মোগলাবাজার এলাকার বাসিন্দা সৈয়দ হাসিনা খাতুন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভূমিদাতা সাংবাদিক এমদাদুর রহমান চৌধুরী জিয়া জানান, ঘটনাটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে অসহায় পরিবারকে ন্যায়বিচার বঞ্চিত করতে একটি প্রভাবশালী মহল তৎপর হয়ে উঠেছে।

রুমন খুনের ঘটনায় তার ভাই মো: রেজু মিয়া কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।

নিহত রুমন মোগলা বাজার থানার জালালপুর এলাকার সবদলপুর গ্রামের মরহুম তখলিছ মিয়ার ছেলে।

সিলেট মহানগর পুলিশের এডিসি (মিডিয়া) মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম সোমবার রাত ১১ টায় নয়া দিগন্তকে জানান, রুমন হত্যা মামলাটি পুলিশের পক্ষ থেকে আন্তরিকভাবে দেখা হচ্ছে। চৌকষ কর্মকর্তারা এটা নিয়ে কাজ করছেন। আদালত প্রধান আসামির তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। আমরা মনে করছি, জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।